স্মৃতিরেখা বললেন, প্রথম দিন এলে। একটু কিছু মুখে না দিলে আমাদের ভীষণ খারাপ লাগবে।
ঝুমা আর রামকেশবের স্ত্রীও খাওয়ার জন্য প্রায় জোরজারই করতে লাগলেন।
আপত্তি করে রেহাই পাওয়া যাবে না। নীরবে চামচে করে একটা মিষ্টি তুলতে যাচ্ছিল বিনয়, রামকেশব হঠাৎ বললেন, কলকাতায় এসে একটা খবর পেলাম। বউমা আর শিশির বলছিল, ঝিনুক নাকি নিখোঁজ হয়ে গেছে। কত কষ্ট করে তাকে ইন্ডিয়ায় নিয়ে এসেছিলে। তার
ঝুমা এবং স্মৃতিরেখা হতচকিত। বিব্রত মুখে তারা বাধা দিতে লাগলেন, ও-সব কথা থাক–
কিন্তু কিছুই শুনতে পাচ্ছিলেন না রামকেশব। নিজের ঝোঁকে বলে যাছিলেন, এ একরকম ভালই হয়েছে বিনু। ওই মেয়েকে নিয়ে কী করতে তুমি! সারা জীবন গলায় কাঁটার মধ্যে বিধে থাকত। না পারতে তাকে ফেলতে, না পারতে তাকে–
সব বুড়োবুড়িই এক ছাঁচে ঢালাই। একই সংস্কারের বেড়াজালে বন্দি। হেমনলিনী। অবনীমোহন। রামকেশব। বিনয়ের মনে হল, একটা তপ্ত লোহার ফলা তার মস্তিষ্কে আমূল বিধে যাচ্ছে। কদিনে ঝিনুকের জন্য যাতনার তীব্রতা খানিকটা কমে এসেছিল। রামকেশব পুরোনো ক্ষতটাকে খোঁচা দিয়ে ফের রক্তাক্ত করে তুলেছেন।
বিনয় লক্ষ করেছে, রাজদিয়ার যার সঙ্গেই দেখা হোক, যত কথাই হোক, সব আলোচনার শেষে অনিবার্যভাবে ঝিনুক আসবেই। ঝিনুক ছাড়া পৃথিবীতে যেন অন্য কোনও বিষয় নেই।
হাতের চামচটা প্লেটে নামিয়ে রেখে তড়িৎস্পৃষ্টের মতো খাট থেকে নেমে পড়ে বিনয়। সোজা দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
ঘরের অন্য সবাই চমকে ওঠে। রামকেশব বললেন, কী হল বিনু, কোথায় যাচ্ছ?
স্মৃতিরেখা বললেন, যেও না, যেও না
বিনয়ের বুকে কোথায় কোন অদৃশ্য স্তরে রক্তপাত হচ্ছে, তার কারণটা কী, কুমার চেয়ে কে আর তা ভাল জানে। ব্যাকুল স্বরে সে ডাকতে লাগল, বিনুদা–বিনুদা ।
কিছুই শুনতে পাচ্ছে না বিনয়, কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। একেবারে অন্ধ আর বধির। উদ্ভ্রান্তের মতো সামনের বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে নিচে নেমে একেবারে রাস্তায়।
পেছন পেছন চলে এসেছিল ঝুমা। কিন্তু বিনয়কে ধরা গেল না। সে ততক্ষণে রমাকান্ত চ্যাটার্জি লেনের শেষ মাথায় চলে গেছে। আর এগোয় না ঝুমা। গেটের কাছে পাংশু মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।
এই কিছুক্ষণ আগে অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ঝুমার সঙ্গে তাদের বাড়ি চলে এসেছিল বিনয়। সেই কুহক উধাও। কৈশোর থেকে তাকে ঘিরে দুই নারীর কী যে তীব্র টানাপোড়েন! ঝুমাকে দেখলে তার শরীরে শিহরন জাগে, তপ্ত হয়ে ওঠে শ্বাসবায়ু। সবই ঠিক। ঝিনুক নিখোঁজ হয়ে গেছে, সেটাও ঠিক। আর কখনও তার সঙ্গে দেখা হবে কি না, কে জানে। তবু বিনয় এই মুহূর্তে ফের অনুভব করে মেয়েটা সহস্র পাকে এখনও জড়িয়ে আছে। সেই পাকগুলি এত তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে ফেলা অসম্ভব।
কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে এসে এসপ্ল্যানেডের ট্রামে উঠে পড়ল বিনয়। এতক্ষণে এই রুটে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
.
১২.
ঝুমাদের বাড়ি থেকে ফেরার পর তিনটে দিন কেটে গেল। এর মধ্যে রোজ সকালের দিকে একবারই মোটে হিরণের সঙ্গে বাজারে গেছে বিনয়। বাকি দিনটা বাড়ি থেকে আর বেরোয়নি। সেদিন রামকেশব ঝিনুক সম্পর্কে নিষ্ঠুর একটা মন্তব্য করে যে কষ্ট দিয়েছেন, তার রেশ এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে।
দোতলার কোণের দিকের একটা ঘর বিনয়ের জন্য চমৎকার সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়েছে সুধা। এই কদিন সারাক্ষণ সেখানে শুয়ে শুয়ে কাটিয়েছে সে। অফিসে জয়েন করতে এখনও কিছু দিন বাকি। অলস মন্থর ভারাক্রান্ত সময় আর কাটতে চায় না। তার ওপর ঝিনুকের জন্য ক্লেশ তো রয়েছেই।
ঘরের জানালা দিয়ে সোজাসুজি ট্রাম রাস্তা চোখে পড়ে। সেখানে রকমারি দৃশ্য। ধাবমান যানবাহন। মানুষজনের যাতায়াত। কতরকম আওয়াজ ভেসে আসে ওখান থেকে। ট্রামের ঘটাং ঘটাং, রিকশার ঠুন ঠুন, বাস কন্ডাক্টরদের একনাগাড়ে চিৎকার, কালীঘাট, ভবানীপুর, ধরমতল্লা। খালি গাড়ি, খালি গাড়ি
সুধাদের এই জাফর শা রোডে দুচারটে ফেরিওয়ালা, ফেরিওয়ালিও ঢুকে পড়ে। কেউ টেনে টেনে হাঁকে, খাগড়াই বাসন– কেউ হাঁকে, চিনা সিঁদুর, তরল আলতা– কেউ হাঁকে পাউরুটি, বিস্কুট চড়া রঙের জমকালো শাড়ি-পরা, কপালে উল্কি-আঁকা, পশ্চিমা মধ্য তিরিশের যুবতী ফেরিওয়ালিরা কোমরে ঢেউ তুলে মরাল-গমনে চলতে চলতে মিষ্টি সুরেলা গলায় হেঁকে যায়, বেলোয়ারি চুড়ি লিবে গ– কেউ হাঁক পাড়ে, ঘুট্টি লিবে। গুল লিবে–
অন্যমনস্কর মতো রাস্তার নানারকম আওয়াজ শুনতে শুনতে আর দৃশ্যাবলি দেখতে দেখতে দিনগুলো কাটিয়ে দিয়েছে বিনয়। সুধা মাঝে মাঝে এসে তাড়া দিয়েছে, সারাদিন ঘরে আটকে আছিস। যা না, একটু ঘুরে টুরে আয়। ভাল লাগবে। .
ঝুমাদের বাড়ি গিয়ে সেদিন যা যা ঘটেছিল, রামকেশব ঝিনুক সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছেন, সুধা আর হিরণকে সবই জানিয়েছে বিনয়। রামকেশবের ওপর ক্ষোভে রাগে ফেটে পড়েছিল দুজনে। সুধা জানে, ঝিনুকের জন্য নতুন করে মন খারাপ হয়ে আছে বিনয়ের। হৃদয়হীন বৃদ্ধটি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তার বুকের ভেতরকার ক্ষতস্থানটি রক্তাক্ত করে দিয়েছেন।
ছোটদি যে তাকে হাসিখুশি দেখতে চায়, বিনয় তা জানে। কিন্তু বাড়ির বাইরে কোথায় যাবে সে? এই সুবিশাল শহরে তার চেনাজানা মানুষ আর কটা? খুবই সামান্য। আত্মীয়-পরিজন অবশ্য আছে। সুনীতিদের বাড়িতে যাবার প্রশ্নই নেই। সেখানে হেমনলিনী রয়েছেন। ঝুমাদের বাড়ি যাবার কথা ভাবাই যায় না। সেখানে রামকেশব আছেন। বিমল গাঙ্গুলিদের বাড়ি গিয়ে প্রথম দিনই যা দেখে এসেছে, তাতে দ্বিতীয়বার সেখানে যেতে মন সায় দেয় না। মন-খারাপটা আরও বহু গুণ বেড়ে যাবে। ছায়া-মায়ার কথা খেয়াল আছে তার। হিরণ আর আনন্দকে বলতে হবে, যদি মেয়ে দুটোর জন্য কিছু করে দিতে পারে।
