প্রথম প্রথম ছেলেদের সঙ্গে করে একতলায় বসত ইসমাইল। বলত, পাকিস্থান হইয়া গ্যাছে। অহন আমরা সোমান সোমান (সমান সমান)। আপনেগো নিচে আর নাই। আপনেগো রান্ধনীরে (রাঁধুনি) আমাগো লেইগা চা বানাইতে কন। হের (তার) লগে লাড়ু মোয়া উপরাও (মুড়কি) দিতে কইয়েন।
রামকেশব বলতে লাগলেন, এইভাবেই চলছিল। হঠাৎ দিনকয়েক আগে ইসমাইলরা সোজা দোতলায় একেবারে শোবার ঘরে এসে খাটের ওপর বসল। বাধা দেবার সাহস হল না। ইসমাইলরা চা, চিড়েভাজা, তিলা-কদমা খেয়ে বলল, মজার মশয় (মজুমদার মশায়) একখান কথা মন দিয়া হুনেন। মেলা (অনেক) বচ্ছর আপনেগো জমিন চছি। ধানপাট বেইচা আপনেরা লাল হইয়া গ্যাছেন। আমাগো কপালে হুদা (শুধু ঠনঠনঠন। এইবার জমিনের আধাআধি রেজিস্টারি কইরা আমাগো নামে লেইখা দ্যান। যারা শোওয়ার ঘরে উঠে এসেছে তাদের লম্বা ঠ্যাং ভবিষ্যতে আরও কতদুর পর্যন্ত যাবে, কে জানে। সেদিন বুঝলাম, দেশে আর থাকা যাবে না। ভাগ্যই বলব, এর দুদিন পর নিত্য দাসের লোক গিয়ে হাজির। তারপর কীভাবে কলকাতায় এসেছি তা তো আগেই শুনেছ।
বিনয় জানে, পাকিস্তানে এখন তিনটে টার্গেট। যুবতী নারী। জমিজমা। আর সমাজের উঁচুস্তরের মানুষের আত্মসম্মান বোধ। এই তিন জায়গায় আক্রমণ হানতে পারলে পাকিস্তান ফাঁকা হয়ে যাবে। সে জিজ্ঞেস করে, রাজদিয়ার বাড়ি আর জমির কী ব্যবস্থা করে এসেছেন?
রামকেশব বললেন, বাড়িতে তালা লাগিয়ে এসেছি। জমি যেমন ছিল তেমনিই পড়ে আছে। তোফায়েলকে সব জানিয়েছি। সে থাকে ঢাকায়। ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। প্রচুর দায়িত্ব। অতদূর থেকে রাজদিয়ায় আমার প্রপার্টির খবর রাখা কি তার পক্ষে সম্ভব? অবশ্য বলেছে চেষ্টা করবে। তবে
তবে কী?
একটাই আশার আলো, নিত্য দাস তার লোক মারফত খবর পাঠিয়েছে, ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে যে মুসলমানেরা পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে তাদের কারও জমি-জায়গার সঙ্গে আমাদের প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ করিয়ে দেবে। দুএকদিনের মধ্যে সে এ-বাড়িতে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। তখন তার সঙ্গে এ নিয়ে কথা হবে। তারপর দেখা যাক
চকিতে বিনয়ের মনে পড়ল, নিত্য দাস হেমনাথের জমি-বাড়ির এক্সচেঞ্জের ব্যাপারে কোনও এক শাজাহান সাহেবের সঙ্গে কথা পাকা করে রেখেছে। প্রথম চিঠিতে হেমনাথ জানিয়েছেন, দেশ। ছেড়ে আসবেন না কিন্তু রামকেশব যা জানালেন, তাতে হাড়ের ভেতর পর্যন্ত হিম হয়ে যাবার জোগাড়। দিনকে দিন রাজদিয়ায় আতঙ্ক মাত্রাছাড়া হয়ে উঠেছে। এক দণ্ডও হেমনাথের আর সেখানে থাকা উচিত নয়।
বিনয় ব্যাকুল স্বরে বলল, আসার সময় আমার দাদুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
রামকেশব বললেন, চিরদিনের মতো রাজদিয়া ছেড়ে চলে আসব আর হেমদাদার সঙ্গে দেখা করব না, তাই কখনও হয়? তাকে কত বোঝালাম, পাকিস্তানে থাকতে পারবেন না। তোফায়েল আমাদের ঢাকায় নিয়ে কলকাতার প্লেনে তুলে দেবে। বউ-ঠাকরুন আর শিবানী দিদিকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে চলুন। এই সুযোগ আর জীবনে আসবে না। কিন্তু কে কার কথা শোনে! ঘাড় একেবারে শক্ত করে রইল হেমদাদা।
বিমর্ষ মুখে বসে থাকে বিনয়। পাকিস্তানে হেমনাথদের যে কী ভবিষ্যৎ, ভাবতেও সাহস হয় না।
রামকেশব থামেননি, কলকাতার খবরের কাগজে কি এই খবরটা বেরিয়েছে?
বিনয় জিজ্ঞেস করল, কোন খবর?
উর্দুকে পাকিস্তানের স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ করা হচ্ছে। এই নিয়ে ইস্ট বেঙ্গলে কিছু কিছু গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। বাঙালিরা ওয়েস্ট পাকিস্তানের সিন্ধি আর পাঞ্জাবি মুসলমানদের চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি। তাদের একটা সেকশন চায়, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।
বিনয় মাথা নাড়ে, হ্যাঁ, বেরিয়েছে। রামকেশব বললেন, যারা ভাষা ভাষা করে হই চই বাধিয়েছে তারা আর কজন? ইস্ট পাকিস্তানের টোটাল পপুলেশনের এক পারসেন্টও নয়। কিন্তু এতেই হেমদাদার কী উৎসাহ! একেবারে নেচে উঠেছে। স্বপ্ন দেখছে, ইস্ট পাকিস্তানে খুব শিগগিরই নতুন করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম হবে। এখন যে তাণ্ডব চলছে, কিছুদিনের মধ্যে তার লেশমাত্র থাকবে না।
বিনয়কে কিছুদিন আগে হেমনাথ যে চিঠি লিখেছিলেন তাতেও এই কথাগুলো ছিল। সে উন্মুখ হয়ে রামকেশবের দিকে তাকিয়ে থাকে। রামকেশব থামেননি, টু-নেশন থিওরির ওপর যে-দেশের সৃষ্টি, সেখানে জন্মাবে বেঙ্গলি ন্যাশনালিজম! সোনার পাথর বাটি! হেমদাদার কোনও কালেই বাস্তব বোধ নেই।
স্মৃতিরেখা ঘরে ঢুকলেন। এর ভেতর তার স্নান হয়ে গেছে। পরনে নকশা-পাড় ধবধবে টাঙ্গাইল শাড়ি। ভেজা চুল আঁচড়াবার পর পিঠময় ছড়ানো। কপালে সিঁদুরের বড় টিপ। সিঁথির মাঝামাঝি পর্যন্ত ঘোমটা। যেন অলৌকিক এক দেবীপ্রতিমা। তার এক হাতে চিনামাটির বড় প্লেটে নলেন গুড়ের প্রচুর তালশাঁস সন্দেশ আর কাঁচাগোল্লা। অন্য হাতে জলভর্তি কাঁচের গেলাস। ঝুমাকে বললেন, একটা সাইড টেবল এনে বিনুর কাছে রাখ।
ঝুমা ব্যস্ত পায়ে উঠে গিয়ে ঘরের কোণ থেকে টেবল নিয়ে এল। স্মৃতিরেখা প্লেট আর গেলাস তার ওপর রাখলেন। বিনয়কে বললেন, খাও–
পাকিস্তান সম্পর্কে রামকেশবের কাছে যা শোনা গেল তাতে অসীম উৎকণ্ঠায় বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। অন্যমনস্কর মতো বিনয় বলল, এখন কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।
