রামকেশব সবিস্তার আরও জানালেন। রাজাকারদের ঝাট থাকলেও বাঙালি মুসলমানরা তাদের খুব একটা পাত্তা দিত না। পার্টিশানের পর ইন্ডিয়া থেকে পশ্চিমা মুসলমানরা ঢাকা চট্টগ্রাম খুলনা রাজশাহী, এইসব বড় বড় শহরে চলে আসছিল। বছরখানেক হল, তাদের অনেকেই পূর্ব পাকিস্তানের ছোটখাটো, নগণ্য টাউন, এমনকি গ্রামের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। কিছু কিছু পশ্চিমা রাজদিয়ায় আগেই এসেছিল। ক্রমশ তাদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে চলেছে। এরা বাঙালি মুসলমানদের সমানে খুঁচিয়ে যাচ্ছে। মুসলমানরা পাকিস্তানের মালিক। ওখানকার জমিজিরাত, বাগ-বাগিচা, দালানকোঠা-সমস্ত কিছু মুসলমানের। অন্য কারও নতুন এই রাষ্ট্রে থাকার অধিকার নেই। তারা তাদের ইন্ডিয়ায় চলে যাক। ক্রমাগত উসকানিতে বেশ কিছু বাঙালি মুসলমান আর আগের মতো শান্ত, নম্র নেই। ভীষণ বদলে যাচ্ছে। লোকগুলো এখন রূঢ়। উদ্ধত। তাদের কর্কশ ব্যবহার। চোখের দৃষ্টিতে উগ্রতা। পুরুষানুক্রমে তারা যে পাশাপাশি বাস করে এসেছে, সুখে-দুঃখে শোকে-আনন্দে উৎসবে-পরবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছে তা যেন ভাবাই যায় না। নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন, অপরিচিত এক হিংস্র বাহিনী চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিনয়ের মনে পড়ে, এই পশ্চিমা মুসলমানদের কথাও হেমনাথের চিঠিতে ছিল। তারা রাজদিয়ায় বিষ ছড়াচ্ছে।
রামকেশব বলতে লাগলেন, রোজ পাঁচ দশটা করে হুমকি দিয়ে বেনামা চিঠি আসে। এক কাপড়ে ইন্ডিয়ায় চলে যাও। রাত্তিরে বাড়িতে বৃষ্টির মতো ঢিল পড়ে। রাস্তা দিয়ে ওরা শাসিয়ে যায়। সাতদিন সময় দিলাম। তার ভেতর দেশ না ছাড়লে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে। এরপর আর রাজদিয়ায় থাকতে সাহস হল না।
বিনয় কিছু বলে না, রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে থাকে। রামকেশব জিজ্ঞেস করলেন, রাজদিয়ার নিত্য দাসের কথা মনে আছে?
বিনয় বলল, থাকবে না কেন? কলকাতায় দুতিনবার তার সঙ্গে দেখাও হয়েছে।
খুব ধূর্ত, করিৎকর্মা। পোস্ট অফিসের ওপর ভরসা নেই। ওই ডিপার্টমেন্টটা প্রায় নিষ্কর্মা হয়ে গেছে। কিন্তু নিত্য দাসের লোক পাকিস্তানের চিঠি ইন্ডিয়ায় নিয়ে যায়, ইন্ডিয়ার চিঠি পাকিস্তানে পৌঁছে দেয়।
জানি। নিত্য দাসের হাত খুব লম্বা।
আমার কপাল ভাল। শাসানি যখন চলছে, নিত্যর লোকটা হঠাৎ রাজদিয়ায় গিয়ে হাজির। তার হাতে শিশিরকে চিঠি পাঠালাম। আমাকে যেন ইন্ডিয়ায় নিয়ে যাবার বন্দোবস্ত করে।
রামকেশব জানালেন, কলকাতায় শিশির যখন হিন্দু হোস্টেলে থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন তখন তাঁর সহপাঠী ছিলেন তোফায়েল আমেদ। অসাধারণ ছাত্র। দুজনের ছিল গভীর বন্ধুত্ব। গ্র্যাজুয়েশনের পর পুলিশ ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষা দিয়ে অফিসার হয়ে যান তোফায়েল। আর ইংরেজিতে এম এ করে খাস ব্রিটিশ কোম্পানি ম্যাকিনন অ্যান্ড ম্যাকেঞ্জিতে বড় চাকরি পান শিশির। দুজনের কাজের জায়গা আলাদা। কিন্তু সম্পর্কটা আগের মতোই নিবিড় থেকে গেছে।
তোফায়েলরা খাস পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। বর্ধমান ডিস্ট্রিক্টে ওঁদের আদি বাড়ি। কিন্তু দেশভাগের পর এখানকার জমিজমা বাড়িঘর বেচে অপশন নিয়ে সপরিবারে ঢাকায় চলে যান। ওয়েস্ট বেঙ্গলে কম্পিটিশন অনেক বেশি। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তুলনায় নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে সুযোগসুবিধা প্রচুর। সেখানে খোলা মাঠ। পোমোশন পেয়ে খুব তাড়াতাড়ি তরতর করে অনেক ওপরে ওঠা যায়।
ঢাকায় চলে যাবার পরও দুই বন্ধুর মধ্যে যোগাযোগটা রয়েছে। চিঠিপত্রে নয়, টেলিফোনে। দুই দেশের ভেতর ওই যন্ত্রটা এখনও চালু আছে। রামকেশবের চিঠি পেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত শিশির তোফায়েলকে ফোন করেন। তোফায়েল এখন ঢাকার পুলিশ কমিশনার। তিনি নিরাপত্তার সবরকম বন্দোবস্ত করে রামকেশব এবং তার স্ত্রীকে ঢাকায় নিয়ে যান। সেখান থেকে পাকিস্তান এয়ারলাইনসের প্লেনে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। রাজদিয়ার বাড়িতে তালা লাগিয়ে পার্থিব যাবতীয় সম্পত্তি ফেলে শুধু দেবদেবীর মূর্তি আর তাদের সিংহাসনটা নিয়ে সীমান্তের এপারে চলে আসতে পেরেছেন রামকেশবরা।
এক নাগাড়ে বলতে বলতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন রামকেশব। একটু থামলেন। জোরে জোরে বারকয়েক শাস টেনে ফের শুরু করলেন, ইসমাইল দফাদারকে মনে পড়ে?
বিনয় বলল, পড়বে না কেন? রাজদিয়ায় থাকতে বছর বছর আপনাদের চকের জমি ওকে ভাগচাষ করতে দিতেন।
তিন পুরুষ ধরে চাষ করে আসছিল। দেশভাগের আগে মাথা তুলে কথা বলত না। দেখা হলেই কথায় কথায় সেলাম আর আদাব। চোখ সবসময় মাটিতে। অনেকবার বললে তবে বারান্দায় উঠে জড়সড় হয়ে বসত। পাকিস্তান হবার পরও কিছুদিন আগের মতোই ছিল। কিন্তু ইদানীং রাজাকার আর পশ্চিমা মুসলমানরা তার মাথায় হাজারটা কুবুদ্ধি ঢুকিয়ে দিয়েছে। রাতারাতি ভোল পালটে গেছে ইসমাইলের
তীব্র কৌতূহল আর উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে ছিল বিনয়। জিজ্ঞেস করল, কীরকম?
রামকেশব বললেন, কিছুদিন হল, বাড়িতে এসে সে আর উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকত না। সোজা বসার ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে পড়ত। আগের মতো নরম তরম নেই। এখন মেজাজ অনেক চড়া। কথাবার্তা রোখাচোখা। আমি যদি কিছু বলি আর সেটা যদি তার পছন্দ না হয়, মুখের ওপর তার কী চোটপাট!
রামকেশব আরও জানালেন, মাঝে মাঝেই দুই জোয়ান ছেলেকে নিয়ে হাজির হচ্ছিল ইসমাইল। আগে পরত সস্তা লুঙ্গি আর নিমা, খালি পা। পাকিস্তান হবার কিছুদিন পর থেকে পরছে ধবধবে পাজামা আর ফুলশার্ট, পায়ে পাম্প শু। চুল থাকত রুখাশুখা, সাতজন্মে তেলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না। মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি। এখন তার মুখ পরিষ্কার কামানো। মাথা থেকে ভুরভুর করে ফুলেল তেলের সুবাস বেরোয়।
