কথা বলতে বলতে উৎকণ্ঠা কেটে যাচ্ছিল বিনয়ের। স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল সে।
একসময় স্মৃতিরেখা বললেন, অনেক বেলা হয়ে গেছে। এখানেই চান টান করে দুটি শাকভাত খেয়ে নাও
ব্যস্তভাবে বিনয় বলল, না না, আজ আর খেতে বলবেন না দিদি।
এই দুপুরবেলায় কেউ না খাইয়ে ছাড়ে?
কেন তার টালিগঞ্জে এখনই ফিরে যাওয়া দরকার, বুঝিয়ে বলল বিনয়। ঝুমাকেও তা-ই বলেছিল।
একটু চুপ করে থেকে স্মৃতিরেখা বললেন, হ্যাঁ, তোমার ফিরে যাওয়াই দরকার। তবে তুমি প্রথম দিন এলে, একটু কিছু মুখে দিয়ে না গেলে আমাদের খুব খারাপ লাগবে। আমি তাড়াতাড়ি চান করে আসছি। হঠাৎ কী মনে পড়ে যাওয়ায় ঝুমাকে বললেন, ওই দেখ, একদম খেয়াল ছিল না। তুই বিনুকে তোর দাদু আর ঠামুর ঘরে নিয়ে যা। ওকে দেখলে ওঁরা খুশি হবেন।
ঝুমারও মনে পড়ে গেল। বিনয়কে বলল, তোমাকে তখন দুজন দেশের মানুষের কথা বলছিলাম না? দেখবে চলণ
কুমার দাদু আর ঠাকুমা। তার মানে রামকেশব এবং তার স্ত্রী। ওঁরাও তাহলে রাজদিয়া ছেড়ে চলে এসেছেন! রামকেশব মানুষটা ছিলেন ভীষণ একরোখা, প্রচণ্ড সাহসী। অবিকল হেমনাথের মতো। তিনিও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যাই ঘটুক, জন্মভূমি ফেলে কখনও সীমান্তের এপারে আসবেন না। এই তো সেদিন বিনয় কলকাতায় এসেছে। রাজদিয়ায় থাকতে প্রায়ই রামকেশবদের বাড়ি গিয়ে ওঁদের খোঁজখবর নিত। নিশ্চয়ই এর ভেতর এমন কিছু ঘটেছে–ভয়াবহ এবং বিপজ্জনক–যাতে পাকিস্তানে থাকা সম্ভব হয়নি। তার সংকল্পের ভিতটা টলে গেছে। রামকেশব যখন দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, হেমনাথ কি আর ভাল আছেন? উৎকণ্ঠায় বুকের গভীর তলদেশ পর্যন্ত কেঁপে যায় বিনয়ের।
নিত্য দাসের হাত দিয়ে হেমনাথকে দ্বিতীয় যে চিঠিখানা বিনয় পাঠিয়েছিল, এখনও তার জবাব আসেনি। হঠাৎ মনে পড়ল, চিঠিটা নিয়ে যাবার পর লোকটাকে আর দেখা যায়নি। হেমনাথের জন্য অসীম শঙ্কায় শ্বাস আটকে আসতে থাকে। তারই ভেতর বিনয়ের মনে হয়, কবে পাকিস্তান থেকে হেমনাথের উত্তর আসবে তার ঠিকঠিকানা নেই। ঝুমাদের বাড়ি এসে একরকম ভালই হয়েছে। রামকেশবের মুখ থেকে হেমনাথদের এখনকার খবরটা জানা যাবে।
বারান্দার আর-এক মাথায় শেষ ঘরখানায় বিনয়কে নিয়ে এল ঝুমা। স্মৃতিরেখা শিশিরের শোবার ঘরের মতো এটাও সেকেলে আসবাবে বোঝাই।
ঘরের মাঝখানে খাটের ওপর শুয়ে ছিলেন রামকেশব। অন্যদিকে দেওয়ালের ধার ঘেঁষে কাঠের সিংহাসনে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর মূর্তি। কোনওটা তামার, কোনওটা পাথরের, কোনওটা রুপোর। রামকেশবের স্ত্রী পশমের আসনে বসে পুজোর আয়োজন করছিলেন।
ওই সিংহাসন আর দেবদেবীদের রাজদিয়ায় রামকেশবের বাড়িতে বহুবার দেখেছে বিনয়। দেশ থেকে আর কিছু আনতে পেরেছেন কি না, কে জানে। কিন্তু ঠাকুরদেবতাকে ফেলে আসেননি।
ঝুমা হইহই করতে করতে ঘরে ঢুকেছে, দাদু, ঠামু, দেখ তোমাদের দেশের লোককে ধরে আনলাম।
খাটের ওপর ধড়মড় করে উঠে বসলেন রামকেশব। পরনে ধুতি এবং ফতুয়ার ওপর মোটা উলের ফুলহাতা সোয়েটার।
হেমনাথের কাছাকাছি বয়স। হয়তো দুচার বছরের ছোটই হবেন রামকেশব। কিন্তু এর মধ্যেই ভীষণ বুড়িয়ে গেছেন। মুখ শীর্ণ। ঘোলাটে চোখ। চুল উঠে উঠে মাথা প্রায় কঁকা। যা কয়েক গাছা আছে সেগুলোর রং পাঁশুটে।
মাথার বালিশের পাশে বিঘত খানেক লম্বা চশমার খাপ ছিল। সেটা খুলে নিকেলের গোলাকার বাইফোকাল চশমা বার করে পরে নিলেন রামকেশব। বিনয়কে দেখে বৃদ্ধ খুবই খুশি। বেশ অবাকও। বললেন, আরে বিনু না? কলকাতায় পা দিতে না-দিতেই তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। বোসো-বোসো-।
বিনয় এগিয়ে গিয়ে রামকেশবকে প্রণাম করল। এদিকে দেবদেবীর আরাধনা স্থগিত রেখে ঘুরে বসেছেন রামকেশবের স্ত্রী। তারও পা ছুঁতে যাচ্ছিল বিনয়, কিন্তু বাধা পড়ল। রামকেশবের স্ত্রী হাত নেড়ে বললেন, পুজোয় বসেছি। এখন প্রণাম নিতে নেই।
অগত্যা খাটের কোণে বসে পড়ল বিনয়। ঘরের অন্য এক ধারের দেওয়াল ঘেঁষে খানকয়েক গদিওলা মোড়া দাঁড় করানো রয়েছে। তার একটা টেনে এনে কাছাকাছি বসল ঝুমা। হাসি হাসি মুখে বলল, কী দাদু, কালই বিনুদার কথা বলছিলে। আজই তাকে তোমার সামনে হাজির করে দিলাম। ভাবতে পেরেছিলে?
রামকেশব হাসলেন, না রে দিদি, ভাবিনি।
কাল তার সম্বন্ধে আলোচনা হয়েছিল এ-বাড়িতে। কী বলেছিলেন রামকেশব? আন্দাজ করতে চেষ্টা করল বিনয়। কিন্তু আকাশপাতাল হাতড়ে কিছুই আঁচ করা যাচ্ছে না। এই নিয়ে সে কোনও প্রশ্ন করল না। এখানে যখন এসেই পড়েছে, কী কথাবার্তা হয়েছে, অবশ্যই জানা যাবে। সে উৎসুক হয়ে রইল।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, দেশ থেকে কবে এলেন?
রামকেশব বললেন, পরশু
আপনি না বলেছিলেন, কোনওদিন রাজদিয়া ছেড়ে আসবেন না?
হ্যাঁ, বলেছিলাম। কিন্তু প্রতিজ্ঞা পালন করা গেল না। হঠাৎ কী হল?
তুমি থাকতে থাকতে রাজাকারদের কিছু কিছু উৎপাত হচ্ছিল। গত দশ দিনে তাদের অত্যাচার যে কতগুণ বেড়েছে, ভাবতে পারবে না।
রাজাকারদের দৌরাত্মের কথা হেমনাথও তার চিঠিতে লিখেছিলেন। হয়তো খানিকটা রেখে ঢেকে, বিনয়রা যাতে দুশ্চিন্তায় না থাকে। কিংবা চিঠি লেখার সময় তা অতখানি মারাত্মক হয়ে ওঠেনি। নির্যাতন কতটা লাগামছাড়া হয়ে উঠলে রামকেশবের মতো মানুষও দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তা অনুমান করতে পারছে বিনয়।
