দরজা খোলা ছিল। ভেতরে ঢুকে শ্বেত পাথরে বাঁধানো বড় হল-ঘর। ভারী ভারী সোফা, আলমারি, চার ব্লেডওলা বিরাট বিরাট ফ্যান দিয়ে সাজানো সেটার একধারে কটা বেডরুম, কিচেন, খাবার জায়গা। দুজন কাজের লোককে সেখানে দেখা গেল। ব্যস্তভাবে তারা কী সব করছে।
হল-ঘরের আর-এক ধারে দোতলায় যাবার সিঁড়ি। ওপরে উঠতে উঠতে গলার স্বর উঁচুতে তুলে ঝুমা ডাকতে লাগল, মা মা, দেখ কাকে নিয়ে এসেছি।
দোতলার চওড়া বারান্দার একদিকে ঢালাই-করা লোহার নকশাদার রেলিং। অন্যদিকে সারি সারি ঘর। দক্ষিণ প্রান্ত থেকে একটা নরম কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, কে রে ঝুমা, কাকে এনেছিস? পরক্ষণে দেখা যায় ওধারের শেষ ঘরখানা থেকে স্মৃতিরেখা রেরিয়ে এসেছেন। ঝুমার মা।
সেই যুদ্ধের সময় স্মৃতিরেখাকে শেষ দেখেছিল বিনয়। জাপানি বোমার ভয়ে হাজার হাজার মানুষ কলকাতা ফাঁকা করে পূর্ব বাংলায় উধাও হয়েছিল। সেই আতঙ্কগ্রস্ত পলাতকদের মধ্যে রুমা ঝুমা আনন্দ স্মৃতিরেখা শিশিররাও ছিলেন।
প্রতিমার মতো নিখুঁত মুখ, টানা চোখ, ফুরফুরে লম্বাটে নাক। তখনই কত বয়স স্মৃতিরেখার। কিন্তু ত্বকে ছিল মসৃণ সোনালি আভা। কোমর অবধি চুল। হালকা, মেদহীন শরীর। মাঝখানে কটা বছর কেটে গেছে। কত কিছুই না ঘটে গেল! দুর্ভিক্ষ। মহাযুদ্ধের অবসান। দাঙ্গা। দেশভাগ। কিন্তু কিছু চুল পেকে যাওয়া আর শরীর ভারী হওয়া ছাড়া চেহারা তেমন বদলায়নি।
মাথায় তেল মেখেছেন স্মৃতিরেখা। দূর থেকৈও মৃদু সুঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। কাঁধে ধবধবে সাদা তোয়ালে। খুব সম্ভব স্নান করতে যাচ্ছিলেন। বিনয়কে দেখামাত্র চিনতে পারলেন। দুচোখে অনন্ত বিস্ময় নিয়ে কয়েক পলক তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, বিনু না?
বারান্দায় উঠে এসেছিল ঝুমারা। হ্যাঁ দিদি এগিয়ে গিয়ে স্মৃতিরেখাকে প্রণাম করল বিনয়। ভগ্নীপতির দিদি। সেই সম্পর্ক ধরে স্মৃতিরেখা তারও দিদি। একটা কথা মনে পড়তে ভারী মজা লাগল তার। সে স্মৃতিরেখাকে দিদি বলে। কিন্তু তাঁর মেয়ে তাকে বলে দাদা। মামা বলা উচিত।
স্মৃতিরেখা বললেন, এস, এস। কত বড় হয়ে গেছ!
একথার জবাব হয় না। সময় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে না। নিঃশব্দে তার কাজ করে যায়। বিনয় মুখে কিছু বলল না। একটু হাসল শুধু।
যে-ঘর থেকে স্মৃতিরেখা বেরিয়ে এসেছিলেন, বিনয়দের সেখানেই নিয়ে গেলেন। ঘরটা প্রকাণ্ড। বিশাল ছত্রিওলা মেহগনি কাঠের খাট, পুরো পাল্লা জোড়া কাঁচ-বসানো আলমারি, গদিওলা সোফা, ডিভান, ড্রেসিং টেবল, কুশন–এত সব আসবাব থাকা সত্ত্বেও এধারে ওধারে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। বিনয় আঁচ করে নিল এটা শিশির আর স্মৃতিরেখার বেডরুম।
একটা সোফায় বিনয়কে বসিয়ে স্মৃতিরেখা মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, বিনুকে কোথায় পেলি?
খাটের এক কোণে বসতে বসতে ঝুমা বলল, হেদোর সামনে বিনুদার সঙ্গে দেখা। আসতে চায় না। জোর করে ধরে নিয়ে এলাম।
ভাল করেছিস। বলতে বলতে কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ে স্মৃতিরেখার, কিন্তু
কী?
কলেজ ফাঁকি দিয়ে হেদোর সামনে ঘুরছিলি নাকি?
কী যে বল না- ঝুমা ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে। তারপর প্রাক্তন অধ্যাপকের মৃত্যু, শোকসভা, প্রয়াত শিক্ষকের সম্মানে ছুটি হয়ে যাওয়া এবং বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎই বিনয়ের সঙ্গে দেখা, ইত্যাদি জানিয়ে দেয় সে।
স্মৃতিরেখা খাটের আর-এক কোনায় বসে পড়েছিলেন। কেন উত্তর কলকাতার এই এলাকায় হেদুয়ার সামনে বিনয় এসেছিল তা নিয়ে কোনও কৌতূহল প্রকাশ করলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো এখন সুধা আর হিরণের কাছে আছ?
ভেতরে ভেতরে সতর্ক হয়ে গেল বিনয়। এই প্রশ্নের খেই ধরে কোন দিকে, কতদূর স্মৃতিরেখা এগুবেন, বোঝা যাচ্ছে না। সংক্ষেপে বিনয় বলল, হ্যাঁ।
মেসোমশাই, মানে তোমার বাবা বাড়িটাড়ি বেচে হরিদ্বার চলে গেলেন। সবে তুমি পাকিস্তান থেকে এসেছ। আর কিছুদিন থেকে, তোমাকে একটু দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেলে বোধ হয় ভাল হতো।
কেন, আমি তো একটা চাকরি পেয়েছি।
বিনয়ের কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যাতে মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলেন স্মৃতিরেখা। মনে হল, অবনীমোহনের কার্যধারা সম্পর্কে মন্তব্য করা বোধহয় ঠিক হয়নি। বিশেষ করে বিনয়ের কাছে। ব্যাপারটা চাপা দেবার জন্য ব্যস্তভাবে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার খেয়াল ছিল না। শুনেছি, খবরের কাগজে কাজ পেয়েছ।
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়।
স্মৃতিরেখা বললেন, গভর্নমেন্ট কি বড় সাহেব কোম্পানিতে চাকরি পেলে ভাল হতো। ওই সব জায়গায় অনেক সুযোগ সুবিধা। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
বিনয় বলল, সেটা ঠিক। আপাতত যা পেয়েছি তাই করি। পরে দেখা যাবে।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলল। তেমন কিছু জরুরি নয়। খুব সাধারণ। এমন দিনে বিনয় এল যখন শিশির বাড়িতে নেই। অফিসে গেছে। যে-বছর আনন্দর বিয়ে হয় সে-বছরই ঝুমার দিদি রুমারও বিয়ে হয়েছিল। সে থাকে টাটানগরে। তার স্বামী ইঞ্জিনিয়ার। ওরা থাকলে বিনয়কে পেয়ে হইচই বাধিয়ে দিত। ইত্যাদি ইত্যাদি।
বেশ খানিকটা সময় স্মৃতিরেখার সঙ্গে কাটালো বিনয়। অনেক কথাও হল। ভেতরে ভেতরে চাপা উদ্বেগ চলছিল তার। এই বুঝি ঝিনুকের প্রসঙ্গ ওঠে। কিন্তু সেদিক দিয়েই গেলেন না স্মৃতিরেখা। মাত্র কদিন আগে মেয়েটা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। বিশ্বসুদ্ধ কারও সেটা জানতে বাকি নেই। স্মৃতিরেখা শোনেননি, তা তো আর হয় না। কিন্তু মহিলা বুদ্ধিমতী। অত্যন্ত বিচক্ষণ। সহৃদয়ও। ঝিনুকের জন্য কার বুকের ভেতর কতখানি ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে আছে, তার অজানা নেই। অহেতুক ঝিনুকের প্রসঙ্গ তুলে ছেলেটাকে কষ্ট দিয়ে কী লাভ?
