অবনীমোহন বাড়িটাড়ি বেচে হরিদ্বার চলে যাবার পর সে যে সুধাদের কাছে গিয়ে উঠেছে, এই খবরটা নিশ্চয়ই সুনীতিদের কাছে জেনেছে ঝুমা। আনন্দদের বাড়ির কথা বলতেই চোখের দৃষ্টি কঠোর হয়ে উঠে বিনয়ের। রূঢ় গলায় বলে, না।
বিনয়ের মনোভাব আঁচ করে নেয় ঝুমা। তার মুখ ম্লান হয়ে যায়, হা, দিদা ঝিনুকের সঙ্গে যা ব্যবহার করেছে, তাতে তুমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছ। বুঝতে পারি ও-বাড়িতে তুমি আর কখনও যাবে না।
বিনয় উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর ঝুমা জিজ্ঞেস করে, মামাদের বাড়ি যাওনি। তাহলে?
বিনয় বলল, রামরতন গাঙ্গুলির স্ত্রী আর মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।
এরা কারা?
বিনয়ের মনে পড়ল, রামরতনদের সম্বন্ধে কখনও ঝুমার সঙ্গে তার কথা হয়নি। জামতলির প্রাক্তন হেড মাস্টারটির সঙ্গে কীভাবে আলাপ, গোয়ালন্দ থেকে কলকাতায় আসার পথে রিফিউজি বোঝাই স্পেশাল ট্রেনে কীভাবে তার শোচনীয় মৃত্যু, তার স্ত্রী এবং মেয়েরা নিজেদের ঘনিষ্ঠ পরিজন বিমল গাঙ্গুলির ভাড়াটে বাসায় কী দুঃসহ, গ্লানিকর জীবনযাপন করছে, ধীরে ধীরে সব শোনালো সে।
বিষণ্ণ সুরে ঝুমা বলল, পাকিস্তান অনেক লোকের অনেক ক্ষতি করে দিয়েছে। শুনতে পাই ওপার থেকে যারা আসছে তারা কেউ সুখে নেই। মহা বিপদে তাদের দিন কাটছে।
বিনয় কিছু বলে না।
ঝুমা বলল, তুমি হেঁটে হেঁটে কোথায় যাচ্ছিলে?
টালিগঞ্জ ফিরতে হবে না?
ঝুমা বেশ অবাক হল, চিত্রা সিনেমার কাছ থেকেই তো এসপ্ল্যানেডের গাড়ি ধরতে পারতে। এসপ্ল্যানেড থেকে টালিগঞ্জের রুটের প্রচুর ট্রাম বাস পাওয়া যায়
এতটা রাস্তা হেঁটে আসার কারণ জানিয়ে দিল বিনয়।
হঠাৎ ঝুমার চোখমুখ খুশির ছটায় ভরে যায়। রামরতনের স্ত্রী ও মেয়েদের জন্য খানিক আগের সেই বিষাদের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। ভাবনাহীন, চঞ্চল বালিকার মতো সে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, ভাগ্যিস তার ছিঁড়ে ট্রাম ডিরেলড হয়েছিল, তাই তোমার সঙ্গে দেখা হল।
সেই কবে থেকে মেয়েটাকে দেখে আসছে বিনয়। সারাক্ষণ যেন লঘু মেজাজে হাওয়ায় ভাসছে। এই পৃথিবীর শোক, দুঃখ আর যাতনা, তাকে ছুঁয়ে যায় ঠিকই। বিচলিতও করে। কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী। দীর্ঘকাল সে-সব নিয়ে মগ্ন থাকা তার স্বভাবে নেই।
ঝুমা বলল, রাজদিয়ায় তুমি আমাকে একটা প্রমিস করেছিলে বিনুদা—
বিনয় মনে করতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, কীসের প্রমিস বল তো?
কলকাতায় এলে আমাদের বাড়ি আসবে। সুধা মাসিদের ওখানে গিয়ে সেদিনও তোমাকে বলে এসেছি। বুঝি, ঝিনুকের জন্যে আসতে পারনি। এখন তো সে ভয় নেই। এস
বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে ওঠে বিনয়ের। ঝুমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঝিনুকের চিন্তা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। জাদুকরীর মতো অসীম শক্তি এই মেয়েটার। সৌরলোকের সব কিছু
সে লহমায় ভুলিয়ে দিতে পারে।
ঝুমার কাছে এলে কেন যে অন্য কিছু মনে থাকে না? কিন্তু একমাত্র ঝিনুককেই ভোলা যায় না। তার জন্য হঠাৎই অনুশোচনায় বুকের ভেতরটা মুচড়ে যেতে থাকে। চকিতে একবার আকাশের দিকে তাকায় বিনয়। সূর্য প্রায় মাথার ওপর উঠে এসেছে। বিমলদের বাড়িতে যা বলেছিল, ঝুমাকেও তাই বলল, সকালে বেরিয়ে পড়েছিলাম। কোথায় যাচ্ছি, ছোটদিকে বলে আসা হয়নি। অনেক বেলা হয়ে গেল। নিশ্চয়ই ওরা খুব চিন্তা করছে। আজ তোমাদের বাড়ি যাওয়া হবে না। আর-একদিন ঠিক যাব।
আদুরে গলায় ঝুমা বলল, এখন তোমাকে কিছুতেই ছাড়ছি না। আমাদের বাড়ি এখান থেকে মিনিট তিনেকের রাস্তা। বেশিক্ষণ আটকাব না। তোমাকে দেখলে সবাই ভীষণ খুশি হবে।
বেলার দোহাই দিয়ে ফের আপত্তি করতে যাচ্ছিল বিনয় কিন্তু কিছুতেই ঠেকানো গেল না ঝুমাকে, কোনও বাহানা শুনতে চাই না। ফের যদি না না কর, হাত ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাব। সেটা কি ভাল হবে?
সারা শরীরে চমক খেলে গেল বিনয়ের। ঝুমার অসাধ্য কিছু নেই। একটি চোখধাঁধানো, বেপরোয়া তরুণী প্রকাশ্য দিবালোকে শয়ে শয়ে মানুষের চোখের সামনে তাকে টেনে নিয়ে চলেছে, দৃশ্যটা ভাবার মতো দুঃসাহস তার নেই। এই একটি মেয়ে, যার সামনে কোনও সংকল্পই বেশিক্ষণ অটুট। রাখা যায় না। মিনমিনে গলায় বিনয় বলল, ঠিক আছে, চল
ঝুমার ঠোঁটের ফাঁকে নীরব হাসির আভা ফুঠে ওঠে। কী মিশে আছে সেই হাসিতে? সীমাহীন অহমিকা? দম্ভ? সে কি বোঝাতে চায়, একটি পুরুষকে তুড়ি মেরে নিজের ইচ্ছায় চালানোর ক্ষমতা তার আছে?
দুই চোখ সামান্য ছোট করে ঝুমা বলে, দ্যাটস লাইক আ গুড বয়। এস একটু থেমে বলল, আমাদের বাড়ি গেলে রাজদিয়ার দুজনের সঙ্গে দেখা হবে। তোমার খুবই চেনাজানা।
বিনয় উৎসুক হল, কারা তারা?
চলই না। এত অধৈর্য কেন?
হেদুয়ার দক্ষিণ পাশের রাস্তা থেকে ডান দিকে সেকেন্ড যে গলিটা বেরিয়েছে সেটাই রমাকান্ত চ্যাটার্জি লেন। মাঝারি রাস্তাটা দিয়ে কপা এগুলেই ঝুমাদের দোতলা বাড়ি। আনন্দদের মতো বিশাল না হলেও বাড়িটা বেশ বড়ই। সামনের দিকে ফুলের বাগান। তারপর গাড়ি-বারান্দা। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলে চওড়া চাতাল। তারপর কারুকাজ করা বিশাল দরজা।
বিনয় শুনেছে হেমনলিনীরা এই বাড়িটি তার মেয়ে-জামাই অর্থাৎ স্মৃতিরেখা ও শিশিরকে যৌতুক দিয়েছেন। বিয়ের পর থেকে ওঁরা ওখানে আছেন। এ-বাড়িতেই রুমা ঝুমা, দুই বোনের জন্ম।
