কখন হাতিবাগান, স্টার থিয়েটার, রূপবাণী সিনেমা পেরিয়ে বিডন স্ট্রিটের মুখে এসে পড়েছিল, খেয়াল নেই বিনয়ের। এখান থেকে ডান পাশে ঘুরে মিনিট চার পাঁচেক হাঁটলেই সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ। সেদিকে পা বাড়াতে গিয়ে থমকে গেল সে। বিডন স্ট্রিটে সুনীতির শ্বশুরবাড়ি। কেউ দেখে ফেললে তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইবে। হেমনলিনী যতদিন বেঁচে আছেন, ও-বাড়ির ছায়া মাড়াবে না বিনয়। বিডন স্ট্রিট থেকে আরও খানিকটা এগিয়ে বেথুন কলেজের দক্ষিণ দিকের বাউন্ডারি ওয়ালের গা, ঘেঁষে যে সরু রাস্তাটা সোজা পশ্চিমে চলে গেছে সেটা ধরলেও সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে যাওয়া যায়।
ফুটপাথ দিয়ে কয়েক পা যেতে না যেতেই খুব পরিচিত গলার ডাক ভেসে এল, বিনুদা বিনুদা।
সারা শরীরে তড়িৎপ্রবাহ খেলে গেল বিনয়ের। এধারে ওধারে তাকিয়ে দেখতে পেল, উলটো দিকে হেদুয়ার সুইমিং পুলের পাশের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে ঝুমা।
১১-১৫. চোখাচোখি হতে হাতছানি
১১.
চোখাচোখি হতে হাতছানি দিল ঝুমা, এখানে এস– সেই কবে, যুদ্ধের আমলে রাজদিয়ায় থাকার সময় বিনয়ের নাকে একটা অদৃশ্য বঁড়শি আটকে দিয়েছিল মেয়েটা। তারপর কত কী-ই তো ঘটে গেল! দুর্ভিক্ষ। দাঙ্গা। দেশভাগ। লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর সঙ্গে ধর্ষিত ঝিনুককে নিয়ে পাকিস্তান থেকে সীমান্তের এপারে চলে আসা। কবছরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড উথালপাতাল। কিন্তু সেই বঁড়শিটা যেমন ছিল তেমনই নাকে গেঁথে আছে।
ট্রাম রাস্তা পেরিয়ে পায়ে পায়ে ঝুমার কাছে চলে গেল বিনয়। ঝিনুক নিখোঁজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সারাক্ষণ জড়িয়ে আছে শ্বাসবায়ুতে। রয়েছে সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে। কিন্তু কুমার সঙ্গে দেখা হলেই নিশ্বাস তপ্ত হয়ে ওঠে। পা থেকে মাথা অবধি কেমন যেন আনচান আনচান করতে থাকে। একদিন দুপুরে ওদের রাজদিয়ার ছাদের ঘরে তাকে দুহাতে জাপটে ধরে চুমু খেয়েছিল মেয়েটা। তার নতুন, নরম স্তন লেপটে গিয়েছিল বুকের ভেতর। তার ভোলা চুল আর সারা শরীর থেকে আশ্চর্য এক সুগন্ধ উঠে এসে নাকের ভেতর দিয়ে শিরায় শিরায় ছড়িয়ে গিয়ে সব কিছু অবশ করে দিয়েছিল। সেদিন আচ্ছন্নের মতো বাড়ি ফিরে গিয়েছিল বিনয়। সেই একটি তপ্ত চুম্বন, কিশোরীর সুগোল স্তনের প্রথম স্পর্শ, তার দেহের অলৌকিক সুঘ্রাণ–সব একাকার হয়ে যৌবনের অপার, অজানা রহস্যের দরজা খুলে গিয়েছিল বিনয়ের সামনে।
এতকাল বাদেও সেই আচ্ছন্নতা কাটেনি। কলকাতায় আসার পর বার দুই ঝুমার সঙ্গে দেখা হয়েছে। একবার সুনীতির শ্বশুরবাড়িতে। আর-একবার টালিগঞ্জে সুধাদের বাড়িতে। ওকে দেখলেই নেশার মতো ঝিন ঝিন করে মাথার ভেতর কী যেন বাজতে থাকে। আজও তার হেরফের নেই। নেশার ঘোরটা নতুন করে বিনয়কে আবার পেয়ে বসে।
এই কবছরে কত সুন্দর হয়ে উঠেছে ঝুমা। এখন সে পূর্ণ যুবতী। পুষ্ট স্তন, রাজহাঁসের মতো মসৃণ গলা, লম্বাটে ভরাট মুখ, সরু কোমর, ঘন পালকে-ঘেরা চোখের গভীর দৃষ্টি, সুঠাম চিবুক, কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা মিহি সিল্কের মতো চুল। পেছন দিকটা ভারী। কলকাতার বড় ঘরের মেয়েদের চেহারায় আলাদা একটা পালিশ থাকে। ঝুমারও আছে।
এই মুহূর্তে কুমার পরনে মেরুন রঙের দামি রেশমি শাড়ি, একই রঙের ব্লাউজ, পায়ে ধবধবে সাদা ফিতেওলা স্লিপার। কাঁধ থেকে একটা সুদৃশ্য চামড়ার ব্যাগ নেমে এসেছে। গলায় সোনার সরু চেন, বুকের কাছে মীনে-করা মাছের আকারে লকেট ঝুলছে। বাঁ হাতে সোনালি ব্যাণ্ডে বাঁধা ফেবার লিউবা কোম্পানির ওভাল শেপের ঘড়ি। কানে রক্তবিন্দুর মতো চুনি-বসানো কানফুল, নাকের পাটায় হীরের নাকছাবি। যখনই ঝুমার সঙ্গে দেখা হয়, মনে হয়, এক অপার্থিব পরী সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
পৌষ মাস প্রায় এসে গেল। এগারোটা বাজতে চলেছে। শহরের তাপাঙ্ক সামান্য বেড়েছে, কিন্তু উত্তুরে হাওয়া কদিন আগের তুলনায় অনেক বেশি শীতল, অদৃশ্য হিম ছড়িয়ে ছড়িয়ে উলটোপালটা বয়ে চলেছে।
বাতাসে ঝুমার চুল উড়ছিল। রাজদিয়ায় যেমনটা হতো, অবিকল তেমনি ঝুমার গা থেকে, তার শাড়ি টাড়ি থেকে মিষ্টি গন্ধ উঠে এসে নাকে ঢুকছে। তবে এই গন্ধটা রাজদিয়ার তুলনায় অনেক বেশি উগ্র।
ঝুমা বলল, তোমার সঙ্গে এখানে দেখা হয়ে যাবে, ভাবতে পারিনি। হোয়াট আ প্লেজান্ট সারপ্রাইজ!
ঝুমা ম্যাট্রিক আর আই এতে ভাল রেজাল্ট করেছিল। নামকরা কলেজে অনার্স নিয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে তার কথাবার্তায় দুচারটে ইংরেজি শব্দ ঢুকে যায়। বিনয় বলল, তোমাকে দেখব, আমিও ভাবিনি।
বা রে, এটা আমাদের পাড়া। হেদুয়ার বাঁধানো সুইমিং পুলের ওধারে আঙুল বাড়িয়ে ঝুমা বলল, ওই যে আমাদের কলেজ
হেদুয়ার সামনের দিকে বেথুন কলেজ। উলটো দিকে স্কটিশ চার্চ। ঝুমা আগেই জানিয়ে দিয়েছিল সে স্কটিশে পড়ে।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, কলেজে যাচ্ছিলে?
না। ঝুমা জানায়, কলেজে গিয়েছিল, কিন্তু একজন প্রাক্তন অধ্যাপকের মৃত্যু-সংবাদ আসায় ছোটখাটো একটা শোকসভার আয়োজন করা হয়। তারপর পরলোকগত শিক্ষকের সম্মানে প্রিন্সিপ্যাল ছুটি দিয়ে দেন। এখন সে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।
বিনয় বলল, ও–।
তুমি তো সেই টালিগঞ্জে সুধা মাসিদের কাছে থাক। এদিকে কোথায় এসেছিলে? আনন্দমামাদের বাড়ি?
