বিমল কৃতজ্ঞ সুরে বলতে লাগল, আপনি ওই অফিসারের সঙ্গে আলাপ না করিয়ে দিলে মহা বিপদে পড়তাম–
একটু চুপচাপ।
তারপর বিমল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিনয়কে হাজারটা প্রশ্ন করে। এই সহৃদয়, পরোপকারী যুবকটি সম্পর্কে তার অপার কৌতূহল। কলকাতায় সে কোথায় থাকে, কী করছে, ঝিনুকের খবর কী, ইত্যাদি ইত্যাদি। রামরতনের স্ত্রীকে যা যা বলেছিল, বিমলকেও তাই বলল বিনয়। ঝিনুকের নিখোঁজ হওয়া আর অবনীমোহনের গুরুর আশ্রমে চলে যাওয়া-যথারীতি এই দুটো বাদ দিয়ে।
চা এসে গিয়েছিল। খাওয়া শেষ হলে বিনয় উঠে পড়ল, অনেকক্ষণ এসেছি। এবার চলি—
বিমল বলল, কষ্ট করে যখন এসেছেন, দুপুরে দুটি ডাল ভাত খেয়ে গেলে খুশি হব।
বাড়িতে না জানিয়ে চলে এসেছি। আরও দেরি হলে ছোটদিরা খুব ভাববে।
বিমল আর রামরতনের স্ত্রীও উঠে দাঁড়িয়েছেন। বাসন্তীরা তো দাঁড়িয়েই আছে।
রামরতনের স্ত্রী বললেন, তরাতরি আইসো কিন্তুক এই কথাটা তিনি আগে আরও একবার বলেছেন।
দ্রুত মা এবং তিন মেয়েকে দেখে নিল বিনয়। সবার চোখেমুখে অনন্ত আগ্রহ। এর হেতুও তার জানা। বলল, নিশ্চয়ই আসব
বিমল বলল, চলুন, আপনাকে ট্রাম রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।
না না, আপনি ক্লান্ত হয়ে আছেন। আর কষ্ট করতে হবে না।
কষ্ট আবার কী–
বাড়ি থেকে বেরিয়ে নীরবে কয়েক পা হাঁটার পর বিমল কিছুটা ইতস্তত করে বলল, আপনি এসেছেন, খুব ভাল হয়েছে। আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে।
একটু সতর্ক হল বিনয়, কী অনুরোধ বলুন তো?
কাচুমাচু মুখে বিমল বলল, আমি স্টেট গভর্নমেন্টের এমপ্লয়ি। আপার ডিভিশন ক্লার্ক। কটা টাকা আর মাইনে পাই? বাড়ি ভাড়া, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, অসুখবিসুখ, খাওয়ার খরচ–একেবারে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিলাম। তার ওপর জেঠিমারা পাকিস্তান থেকে চলে এলেন। বুকে করে যাঁরা মানুষ করেছেন তাদের তো ফেলে দিতে পারি না। এদিকে আসছে মাস থেকে রেশনের চাল চিনি গমের দাম বাড়ছে। সাড়ে ছআনা সেরের মোটা চাল সাড়ে সাত আনা হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে বাড়বে আটা চিনি আর অন্য সব জিনিসের দাম। কীভাবে যে চলবে ভেবে পাচ্ছি না বিনয়বাবু–
এত লম্বা ভণিতা করে কী জানাতে চায় বিমল? তার কাছে লোকটার কি কোনও প্রত্যাশা আছে? একটা ব্যাপার অবশ্য বিনয়ের ভাল লাগল। বিমল অমানুষ নয়। জেঠা-জেঠি তার জন্য কী করেছেন তা ভুলে যায়নি। পুরানো দিনের স্মৃতি সে হাত ঝেড়ে ফেলে দিতে চায় না। কিন্তু রাজ্য সরকারের কেরানি। পয়সার জোর নেই। তাছাড়া একদিকে কর্তব্যবোধ, কৃতজ্ঞতা, অন্য দিকে স্ত্রী। মহিলার আদৌ ইচ্ছা নয়, ঘাড়ে চারটে বাড়তি মানুষ আজীবন চেপে থাকুক। স্ত্রী এবং জেঠিমাদের মাঝখানে পিষে যাচ্ছে বিমল। লোকটার জন্য করুণাই হয় বিনয়ের।
বিমল এবার বলল, শুনেছি আপনার বাবা আর ভগ্নীপতিরা খুবই ইনফ্লুয়েন্সিয়াল। সন্ধের দিকে যদি দুতিন ঘণ্টার জন্য একটা পার্ট-টাইম কাজের ব্যবস্থা করে দেন–
রামরতনের স্ত্রী চান ছায়া-মায়ার জন্য চাকরি জুটিয়ে দিতে।বিমল চায় পার্ট-টাইম কাজ। বিনয়ের হাসি পেল। সে নিজেই রয়েছে ভাসমান অবস্থায়। দুদিন পর কোথায় থাকবে, ঠিক নেই। এই সুবিশাল শহরে পরিচিতজনের সংখ্যা আর কজন? শুধু হিরণ আর আনন্দকেই সে বলতে পারে। কিন্তু ওরা ছায়া-মায়া আর বিমলের জন্য কতদূর কী করতে পারবে, কে জানে।
গলির একটা বাঁকের মুখে এসে পড়েছিল তারা। বিমলকে নিরাশ করতে ইচ্ছা হল না বিনয়ের। বলল, নিশ্চয়ই আপনার কথা সবাইকে বলব। অনেকদূর এসেছেন। এবার বাড়ি যান।
সঙ্গ দেবার জন্য জোর করল না বিমল। দাঁড়িয়ে পড়ল সে। হাতজোড় করে বলল, নমস্কার। আমার কথাটা কিন্তু মনে রাখবেন।
রাখব। নমস্কার
গলির আর-একটা পাক ঘুরে ট্রাম রাস্তায় এসে বিনয়ের চক্ষুস্থির। ডাইনে বাঁয়ে কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটটার যতদূর অবধি দেখা যায়, সারি সারি ট্রাম দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলোর দুপাশে বাস লরি রিকশা ঘোড়ার গাড়ি-যাবতীয় যানবাহন। কোনওটারই নড়াচড়া নেই। সব যেন একটা বিশাল ফাঁদের ভেতর আটকে গেছে। বাসের কন্ডাক্টর, ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ান, রিকশাওলা, রাস্তার লোজন গলার স্বর সবচেয়ে উঁচু পর্দায় তুলে সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। কে কী বলছে, বোঝার উপায় নেই। সব মিলিয়ে যে প্রচণ্ড শব্দের সৃষ্টি হচ্ছে তা যেন আকাশ ফেড়ে ফেলবে। সমস্ত এলাকা জুড়ে তুমুল বিশৃঙ্খলা।
হতবুদ্ধি বিনয় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। ট্রাম বাস না চললে টালিগঞ্জে ফিরবে কী করে? গাড়িঘোড়া যেভাবে জট পাকিয়ে আছে, ফের কখন চালু হবে, কে বলবে। একটা লোককে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, গ্রে স্ট্রিটের কাছে ট্রাম তার ছিঁড়ে লাইন থেকে ছিটকে গিয়ে, আড়াআড়ি রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার ফলে এই জট-পাকানো হাল।
এখন অফিস টাইম। বিনয় লক্ষ করল, ফুটপাথ ধরে মানুষের স্রোত। কারও দাঁড়াবার সময় নেই। সবাই সামনের দিকে হাঁটছে। সেও স্রোতে গা ছেড়ে দিল। হঠাৎ মনে পড়ল, সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে যেতে পারলে এসপ্ল্যানেডের বাস পাওয়া যাবে। তারপর টালিগঞ্জ যাওয়া এমন কি কঠিন?
হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার জ্যামের দুর্ভাবনাটা মাথা থেকে বেরিয়ে যায় বিনয়ের। চেখের সামনে বিমলদের বাড়ির ছবিটা ফুটে ওঠে। যদি ছায়া কি মায়ার চাকরি না জোটে, বিমলের স্ত্রী যদি ওদের তাড়িয়ে দেয়, এই বিশাল মহানগরে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তারা? কে তাদের আশ্রয় দেবে? চিন্তাটা তাকে আকুল করে তোলে।
