বিনয় জানে, কলকাতার গার্লস স্কুল আর কলেজগুলোতে মেয়েরা পড়ায়। কিন্তু বাঙালি মেয়েরা পুরুষদের পাশাপাশি বসে অফিসে কাজ করে কি না, সে সম্বন্ধে তার ধারণা নেই। অবশ্য আনন্দদের অফিসে একটি তরুণী রিসেপশনিস্ট চোখে পড়েছে তার। উগ্র সাজপোশাক। চোখধাঁধানো যৌবন। তবে সে বাঙালি নয়, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। আদৌ বাঙালি মেয়েরা যদি অফিসে কাজ করেও, ম্যাট্রিক পরীক্ষা যারা দিতে পারেনি অর্থাৎ ছায়া-মায়াদের পক্ষে কি চাকরি পাওয়া সম্ভব? শিক্ষাগত এই যোগ্যতায় খুব সম্ভব কাজ জুটবে না। হঠাৎ বিনয়ের মনে পড়ল, রিফিউজিদের ব্যাপারে গভর্নমেন্ট অনেক সহানুভূতিশীল। ম্যাট্রিক, আই এ, বি এ পাস করতেই হবে, এমন কোনও কড়াকড়ি নেই। ক্লাস নাইন টেনের বিদ্যাতেও ছোটখাটো কাজ জুটে যায়। নইলে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়া মুকুন্দপুরের নিশিকান্ত আচার্য সরকারি রেশনের দোকানে চাকরি পেত না।
বিনয় বলল, নিশ্চয়ই আমি জামাইবাবুদের বলব। আমি নিজেও আপনার মেয়েদের চাকরির জন্যে খোঁজখবর নেব।
বিনয়ের একটা হাত আঁকড়ে ধরে আকুল সুরে রামরতনের স্ত্রী বললেন, এই কামটা তুমারে কইরা দিতেই হইব। যত তরাতরি পার–
আমি চেষ্টা করব মাসিমা
তাকে না বলে ছায়া-মায়ার চাকরির কথা বিমলকে কেন বললেন না বৃদ্ধা? প্রশ্নটা করতে গিয়ে থমকে গেল বিনয়। একে তিন মেয়েকে নিয়ে গলগ্রহ হয়ে আছেন, তার ওপর চাকরি জুটিয়ে দেবার জন্যে ছোটাছুটি করতে বললে নিশ্চয়ই বিমল খুশি হতো না। তাই সেটা উত্থাপন করতে সাহস হয়নি বৃদ্ধার।
বাইরে থেকে কার গলা ভেসে এল, ছায়া-মায়া, এদিকে আয় তো~
সচকিত রামরতনের স্ত্রী গলা নামিয়ে বললেন, বিমল আইছে। তুমার লগে এতক্ষণ যে কথা হইল, অরে কিন্তু এই সগল কিচ্ছু কইবা না। বোঝোই তো বাবা
বুঝতে ঠিকই পেরেছে বিনয়। বাড়িতে এনে তোলার পর সারাক্ষণ মানসিক পীড়ন চালাচ্ছে বিমলরা, কিন্তু রামরতনের স্ত্রী যে বাইরের কারও সাহায্য চাইবে, সেটাও হয়তো ওদের সম্মানে বাধবে। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি।
বিনয় বলল, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মাসিমা। আমি বিমলবাবুকে কিছুই বলব না।
বসার এই ঘর থেকে কোনাকুনি খোলা সদর রজা দিয়ে বাইরের রাস্তায় একটা রিকশা চোখে পড়ে। সেটায় বসে আছে বিমল। তার পাশে এবং পাদানিতে অনেকগুলো বড় বড় চটের থলে। জিনিসপত্রে বোঝাই।
ছায়া-মায়া দৌড়ে গিয়েছিল। একটু পর তিনজনে থলেগুলো রিকশা থেকে নামিয়ে নিয়ে ফিরে এল।
সামনের চাতালে জলের কল আর পায়খানাগুলোতে এখনও যথেষ্ট ভিড়। তবে খানিক আগে বাড়িটার তিনটে তলা জুড়ে গল গল করে যে কয়লার ধোঁয়া বেরুচ্ছিল, এখন আর তা নেই। পনেরো ঘর ভাড়াটের উনুনগুলো নিশ্চয়ই ধরে গেছে।
আগে লক্ষ করেনি। ঘরের লাগোয়া বারান্দায় উঠতেই বিমলের চোখে পড়ল বাইরের ঘরে বসে আছে বিনয়। দেখামাত্র চিনতে পারল। ব্যস্তভাবে বলল, বসুন। আসছি
পাশের ঘরে হাতের থলে রেখে তৎক্ষণাৎ চলে এল বিমল। ঝপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। তাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। রেশন তুলে, বাজার করে, মালপত্র নিয়ে আসার ধকল তো কম নয়।
বিমল জিজ্ঞেস করল, কতক্ষণ এসেছেন?
বিনয় বলল, মিনিট চল্লিশেক হবে। শুনলাম আজ আর অফিসে যাবেন না। তাই অপেক্ষা করছিলাম। কথাটা ঠিক বলা হল না। বিমলের জন্য মোটেও সে বসে নেই। রামরতনের স্ত্রীর সঙ্গে কথাবার্তা বলতে বলতে অনেকটা সময় কেটে গেছে। দরকার হলে অন্যের অহংকে তুষ্ট করতে। কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। বিনয় যেন রামরতনের স্ত্রী বা মেয়েদের জন্য নয়, বিমলের সঙ্গে দেখা করতেই এ-বাড়িতে এসেছে।
বিমল বলল, রেশনের দোকানে লম্বা লাইন ছিল। তাই ফিরতে দেরি হয়ে গেল। জেঠিমা, বাসন্তীদিদি, বিনয়বাবুকে চা দিয়েছ?
বিনয়ই উত্তরটা দিল, হ্যাঁ, আতিথ্যে কোনও ত্রুটি হয়নি।
বিমল বলল, খুব টায়ার্ড লাগছে। চা না হলে এনার্জি পাচ্ছি না। আশা করি, আর-এক কাপ খেতে নিশ্চয়ই আপনার আপত্তি হবে না বিনয়বাবু–
বিনয় হাসল। তার আপত্তি নেই।
বিমল ছায়া-মায়াকে বলল, চট করে একটু চা করে নিয়ে আয়।
বিনয় যেটুকু দেখেছে, তাতে মনে হয়েছে, এই দুই বোন যেন জোড়ের পাখি। সারাক্ষণ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। বিমলের মুখ থেকে কথা খসার সঙ্গে সঙ্গে তারা ডান পাশে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল।
বিমল এবার বিনয়ের দিকে তাকায়, শিয়ালদা স্টেশনে সেই প্রথম আর শেষ দেখা। প্রায়ই ভাবি, আপনি আসবেন। ঠিকানাও জানি না যে নিজেই গিয়ে দেখা করব। এদিকে জেঠিমারা সর্বক্ষণ আপনার কথা বলে
শিয়ালদার প্রসঙ্গ ওঠায় ভীষণ অস্বস্তি বোধ করে বিনয়। চারটি শোকগ্রস্ত নারী এবং রামরতনের মৃতদেহ বিমলের হাতে তুলে দিয়ে সে ঝিনুককে নিয়ে বাবা আর দিদিদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিল। শরীর তখন এতটাই ভেঙে পড়েছে যে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। তারপর সেদিন রাতে কী হয়েছে, কীভাবে বিমল সবদিক সামাল দিয়েছে, কিছুই জানা নেই।
বিনয় বলল, ওই দিনটায় আপনার ভীষণ কষ্ট হয়েছিল? পাশে থেকে যে একটু সাহায্য করব, তার উপায় ছিল না।
বিমল জানায়, রামরতনের মৃত্যুশোক ছাড়া অন্য কষ্ট তেমন হয়নি। বিনয় রিফিউজি অ্যান্ড রিলিফ ডিপার্টমেন্টের যে অফিসারটির সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তার মতো মহানুভব মানুষ এই স্বার্থপর পৃথিবীতে একান্তই বিরল। তিনিই খাট ফুল মালা নতুন কাপড়চোপড়, এমনকি নিমতলায় নিয়ে যাবার জন্য চারজন শববাহকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। দাহের খরচও দিয়েছেন। সবই অবশ্য উদ্বাস্তু ত্রাণ বিভাগের টাকা। টাকা যেখান থেকেই আসুক, নিজে দায়িত্ব নিয়ে এতটাই বা কে করে?
