বিনয় জানায়, রিফিউজি ক্যাম্প সম্বন্ধে সে বিশেষ কিছুই জানে না। যে-সব খবর কানে এসেছে তার আধাআধিও যদি ঠিক হয়, তাহলে সম্ভ্রান্ত ভদ্র পরিবারের মানুষজনের শাগ্য বাসস্থান সেগুলো নয়। বিশদভাবে তা বুঝিয়ে দিয়ে সে বলল, ক্যাম্পে না যাওয়াই ভাল ।সমা। আপনার কম বয়সের মেয়েরা আছে– পরিষ্কার একটা ইঙ্গিত দিয়ে থেমে গেল সে। আসলে বিনয়ের মাথায় চকিতের জন্য শিয়ালদা স্টেশনের সেই দৃশ্যটি ঝিলিক দিয়ে গেল। একটা আড়কাঠি পতিতপাবনের সদ্য যুবতী মেয়েকে ফুসলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল, আর পতিতপাবন প্রচণ্ড আক্রোশে লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গলা টিপে স্টেশনের পাথুরে চত্বরে তাকে আছড়ে ফেলেছিল। অনেকে মিলে টানাটানি করে ছাড়িয়ে না দিলে লোক্টা খুনই হয়ে যেত। এইরকম মেয়ে-শিকারি কি আর ক্যাম্পগুলোর চারপাশে হানা দিচ্ছে না? নিশ্চয়ই দিচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা অসহায় হিন্দু মেয়েদের নিয়ে। লুটের বাজার এখন রমরমিয়ে চলছে। সুযোগ পেলেই তারা ছোঁ মেরে রামরতনের মেয়েদের তুলে নিয়ে যাবে। যে ঘাতক আর লুটেরা বাহিনীর ভয়ে রামরতনরা পাকিস্তান থেকে চলে এসেছিলেন, সীমান্তের এপারেও তেমন হাঙররা থিক থিক করছে। অশক্ত, দুর্বল বৃদ্ধার সাধ্য কী, তাদের হাত থেকে যুবতী দুই মেয়েকে রক্ষা করেন।
বিনয়ের ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিলেন রামরতনের স্ত্রী। একেবারে মুষড়ে পড়েন তিনি। বিনয় লক্ষ করে, ছায়া, মায়া এবং বাসন্তীও ভেতরে ভেতরে ধসে পড়েছে।
সারি সারি হতাশ, করুণ, কাতর মুখচ্ছবি। মা আর তিন মেয়ে হয়তো ভেবেছিল, হয়তো নিজেদের মধ্যে গোপনে পরামর্শও করেছিল, ক্যাম্পে গেলে সরকারি দাক্ষিণ্যে থাকতে পারবে। বিমলদের বাড়ির অসহনীয় পরিবেশ থেকে সেটাই খুব সম্ভব ছিল তাদের পরিত্রাণের একমাত্র উপায়। অন্তত সেই রকমই মনে হয়েছিল চার মা-মেয়ের।
শুকনো গলায় রামরতনের স্ত্রী বললেন, তুমি তাইলে কেম্পে যাইতে না কর?
ঘুরিয়ে উত্তরটা দিল বিনয়, না যাওয়াই ভাল—
কিন্তুক
উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বিনয়।
একটু চিন্তা করে বৃদ্ধা এবার বললেন, আমাগো জামতলিতে মাইয়াগো ইস্কুল নাই। কিন্তুক তুমার মাউসামশয় ছায়া আর মায়ারে বাড়িতে অনেক দূর পড়াইছে। পেরাইভেটে (প্রাইভেটে) ছায়া-মায়া দুইজনেরই মেট্রিক দেওনের কথা আছিল। বিয়াও ঠিক হইয়া গেছিল ছায়ার। মেট্রিক পরীক্ষার পরই বিয়াটা হইত। পাত্র ঢাকা শহরে থাকত। ভাল পোলা। এম. এ পাস। বড় চাকরি করত। মাইষে ভাবে এক, হয় আর-এক। হেই বচ্ছরই বাধল দাঙ্গা। মুসলমানেরা কয় পাকিস্থান চাই। চাইর দিকে আগুন আর রক্তগঙ্গা। হেই দাঙ্গায় পাত্র তার মা বাপ ভাই বইন সুদ্ধা ঢাকায় খুন হইয়া গেল। ছায়া-মায়ার পরীক্ষাও দেওয়া হইল না। সগলই অদ্দিষ্ট বাবা। বুকের অতল স্তর ভেদ করে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রামরতনের স্ত্রীর। দুচোখ জলে ভরে যেতে থাকে।
ক্যাম্পে যাবার প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে বৃদ্ধা কেন যে ছায়া-মায়ার ম্যাট্রিক পরীক্ষা আর ছায়ার বিয়ের কথায় চলে এলেন, বোঝা যাচ্ছে না। নিজের অজান্তেই বিনয়ের চোখ ছায়ার দিকে ঘুরে। যায়। নতমুখে সে দাঁড়িয়ে আছে। পরীক্ষা যে দেওয়া হয়নি, স্থির হয়ে-যাওয়া বিয়ের পাত্র যে খুন হয়ে গেছে–এ-সব যেন তারই অপরাধ। মেয়েটার জন্য বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে বিনয়ের।
বেশ কিছুক্ষণ পর ধরা গলায় রামরতনের স্ত্রী বললেন, হুনছি গরমেন্ট রিফুজিগো ম্যালা (অনেক) সুযুগ সুবিদা চাকরি বাকরি দিতে আছে। ছায়া-মায়ার হাতে মেট্রিকের ছাপ নাই, কিন্তুক হেই তরি (সেই পর্যন্ত) তো পড়ছে। অরা যদিন কাজকম্ম পাইত, রোজগারপাতি করতে পারত, আমরা ভিন্ন বাসা ভাড়া কইরা উইঠা যাইতাম। ছায়া-মায়া সম্বন্ধে এত কথা কেন বৃদ্ধা বলছেন, এতক্ষণে তার কাটা ধরা গেল।
রামরতনের স্ত্রী বলতে লাগলেন, কইলকাতায় তো শুনি মাইয়ারা আফিসে গিয়া কাম করে। তুমার বাবার, দুই ভগ্নীপতির তো কত বড় বড় মাইষের লগে জানাশুনা। তেনাগো কইয়া ছায়া মায়ার এট্টা গতি কইরা দিতে পার?
এতদিন তার জন্য কেন যে ব্যাকুলভাবে রামরতনের স্ত্রী এবং তার মেয়েরা অপেক্ষা করছিল, তাও স্পষ্ট হয়ে যায়। পথের আলাপ। তারপাশা থেকে গোয়ালন্দ, গোয়ালন্দ থেকে শিয়ালদা স্টেশন। মাত্র দুটো দিন তারা একসঙ্গে কাটিয়েছে। এটা ঠিক, বিনয় ওদের জন্য অনেক করেছে। তারপাশায় নাসের আলি তার ওপর রামরতনদের কলকাতায় পৌঁছে দেবার যে বিরাট দায়িত্ব দিয়েছিলেন তা সাধ্যমতো পালন করে গেছে বিনয়। সঙ্গে সদাত্রস্ত ঝিনুক, সে আবার পুরোপুরি স্বাভাবিকও নয়। তাকে সামলে স্টিমার এবং ট্রেনের দমবন্ধ-করা ছিন্নমূল মানুষের ভিড়ে যতটা সম্ভব রামরতনদের দুর্ভোগ আর কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করেছে। রামরতন যখন পাকিস্তানের ট্রেনে মারা গেলেন তখন চারটি শোকার্ত, বিপন্ন নারীকে সে দুহাতে ঘিরে রেখেছিল। তার আন্তরিকতায়, তার সমবেদনায় নিশ্চয়ই প্রাক্তন হেডমাস্টার মশায়ের স্ত্রী এবং মেয়েরা অভিভূত। হয়তো তারা ভেবেছে, পথের দেখা, অনাত্মীয় এই যুবকটির ওপর নির্ভর করা যায়। বিমলদের বাড়িতে এসে যখন অনাদরে, অসম্মানে তারা জর্জরিত, তখন এই অচেনা শহরে বিনয়ের কথাই বার বার তাদের মনে পড়েছে। বুঝি বা সে-ই তাদের শেষ অবলম্বন। তাকে আঁকড়ে ধরে তারা নতুন করে বাঁচতে চায়। সসম্মানে। নিজেদের মর্যাদা বজায় রেখে।
