নিরঞ্জন বলল,রেডি হইয়া থাইকেন। আমাগো লগে গাড়ি থাকব। কাইল সকালে এইহানে আইয়া আপনেরে তুইলা নিয়া যামু।
আচ্ছা—
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর নিরঞ্জন বলে, প্রসাদদা, আগের দুই খ্যাপে (খেপে) যে রিফিউজি লইয়া গ্যাছিলাম, কুননা হুজ্জত হয় নাই। এইবার মনে লয় (হয়) গণ্ডগোল অইব। তাকে রীতিমতো চিন্তিত দেখায়।
প্রসাদ বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করেন, কেন?
লেফট পার্টিগুলান বাধা দিতে আছে। রোজই মিটিং মিছিল করে। হেরা চায় না, উদ্বাস্তুরা আন্দামানে যাউক। হগল দেইখা শুইনা রিফিউজিরা ডরাইয়া গ্যাছে। এদিকে আমাগো ডিপার্টমেন্ট জানাইছে একশ ডিপি (ডিসপ্লেসড) ফেমিলি লইয়া যাইতে হইব। পুরাটা পারুম কিনা বুঝতে পারতে আছি না।
প্রসাদ বললেন, রিফিউজিদের জন্যে একটা বড় সুযোগ এসেছে। এটা হাতছাড়া করা একেবারেই ঠিক না।
গলার স্বর উঁচুতে তুলে নিরঞ্জন বলে, কী কইতে আছেন–ঠিক না? আন্দামানে না গ্যালে মহা বিপদ অইব। একটু থেমে বলল, ওয়েস্ট ব্যাঙ্গল তো এত্তটুক একটা স্টেট। লাখ লাখ বাড়তি মাইষের জায়গা অইব কুনখানে? থাকব কই? আন্দামান সেকেণ্ড ব্যাঙ্গল অইতে পারে। এই সুযুগটা লওন (নেওয়া উচিত।
হ্যাঁ।
নাইলে কপাল থাপড়াইতে হইব। জঙ্গল রিক্লেম করা হইছে। শুনতে আছি, ইস্ট পাকিস্তানের রিফিউজিরা না গ্যালে জমিন ফাঁকা রাখা হইব না। গভর্নমেন্ট মালাবারী মোপলাগো আইনা বহাইব।
বিনয় পলকহীন নিরঞ্জনকে লক্ষ করছিল। মনে পড়ল, মোপলাদের সম্পর্কে যে শঙ্কার কথা
সে বলছে, সেবার এসেও ঠিক তা-ই বলে গিয়েছিল। গভীর উৎকণ্ঠায় মন ভরে যেতে থাকে বিনয়ের।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে, বিনয়কে কাল সকালে রিফিউজি ক্যাম্পে যাবার ব্যাপারটা মনে করিয়ে দিয়ে উঠে পড়ল নিরঞ্জন আর বিভাস।
.
৭৪.
পরদিন সকালে চানটান সেরে, চা খেয়ে, বেরুবার জন্য তৈরি হয়েই ছিল বিনয়। হই হই করতে করতে নিরঞ্জন এসে হাজির। বলল, ওঠেন–ওঠেন। অহনই যাইতে অইব।
পাশের ঘরে গিয়ে প্রসাদের সঙ্গে দেখা করে বিনয়রা বেরিয়ে পড়ে। মেসের সামনে একটা স্টেশন-ওয়াগন টাইপের বড় গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। সেটার সামনের দিকে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বসে আছে ড্রাইভার। পেছনে মুখোমুখি দুটো লম্বা সিটে বসেছেন আরও চারজন। তাঁদের একজনকেই বিনয় চিনতে পারলবিভাস মাছা। অমাদের আগে কখমও দেখেনি। গাড়িতে ওঠার পর নিরঞ্জন ওঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। পরিতোষ পালিত, হিরন্ময় চৌধুরি আর প্রিয়নাথ গুপ্তভায়া। তিন জনই রিফিউজি রিলিফ অ্যাণ্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের অফিসার। হিরন্ময় মাঝবয়সী, বাকি দুজনের বয়স চল্লিশের নিচে। হিরন্ময় এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু পদে আছেন।
তিন অফিসারই জানালেন, বিনয়ের নামটা তাদের খুবই পরিচিত। নতুন ভারত কাগজে নিয়মিত তার লেখা ওঁরা পড়েন।
গাড়ি চলতে শুরু করেছিল। নিরঞ্জন হিরন্ময় চৌধুরিকে জিজ্ঞেস করে, আইজ আমরা ফাস্ট কই যামু হিরন্ময়দা?
কথাবার্তার ধরন থেকে বোঝা যায়, পশ্চিম বাংলার উদ্বাস্তু বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে নিরঞ্জনের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। বিনয় জানে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের যৎকিঞ্চিৎ অনুদান নিয়ে এখানকার ত্রাণশিবিরগুলো চালায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারই। আন্দামানে উদ্বাস্তু নিয়ে যেতে হলে এখানকার রিফিউজি রিলিফ ডিপার্টমেন্টের অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা ভীষণ জরুরি। সেই সুতো ধরেই তাদের সঙ্গে নিরঞ্জনের অন্তরঙ্গতা।
হিরন্ময় বললেন, পরশু লেক আর নিউ আলিপুরের ক্যাম্পগুলোতে যাওয়া হয়েছিল। আজ দমদমের দিকটায় যাব। ওখানে চারটে ক্যাম্প আছে। আমরা যে যাচ্ছি, ক্যাম্পগুলোর ইন-চার্জদের আগেই খবর পাঠানো হয়েছে।
নিরঞ্জন বলল, এই চাইর কেম্পে টোটাল কত রিফিউজি আছে?
পকেট থেকে পিন দিয়ে গাঁথা একতাড়া কাগজ বার করে ওলটাতে ওলটাতে হিরণয় বললেন, বাচ্চাকাচ্চা মিলিয়ে চার হাজার আটাত্তর জন।
বিনয় হিরন্ময়ের সামনের সিটে বসে ছিল। সে লক্ষ করল, কাগজগুলোতে অগুনতি নাম টাইপ করা রয়েছে। ওই চার ক্যাম্পের শরণার্থীদের নাম।
এদিকে নিরঞ্জন বলছিল, ফেমিলি কত অইব?
হিরন্ময় বললেন, সাত শ বাষট্টি।
একটু ভেবে নিরঞ্জন বলল, পরশু লেক আর নিউ আলিপুরে গিয়া জুইত হয় নাই। কেও আন্দামানে যাইতে চায় না। দমদমে গিয়া কি কাম অইব? আমার পুরা এক শ ডি পি ফেমিলি চাইই চাই
ডি পি ফ্যামিলি ব্যাপারটা বিনয় ভালই জানে। ডি পি হল ডিসপ্লেসড পার্সনস অর্থাৎ উদ্বাস্তুদের পরিবার।
হিরন্ময় বললেন, দমদমে কতটা কাজ হবে সেটা নির্ভর করছে তোমরা ওখানকার রিফিউজিদের কতটা কনভিন্স করতে পার, তার ওপর। ওখানে যদি পুরো এক শ ফ্যামিলি নাও পাও, ব্যারাকপুর আছে, নৈহাটি আছে, কাঁচড়াপাড়া আছে, সাউথ বেঙ্গলের নানা জায়গা আছে, নর্থ বেঙ্গল আছে। সারা পশ্চিম বাংলাই রিলিফ ক্যাম্পে ভর্তি। দমদমে সবটা না হলে, কোথাও না কোথাও ঠিক পেয়ে যাবে।
নিরঞ্জন বলল, সোময় তো হাতে বেশি নাই। মোটে চাইর দিন। এইবার আন্দামান থিকা আইয়াই জ্বরে পড়লাম। পিল খাইয়া খাইয়া ট্যাম্পারেচার লামইছি (নামিয়েছি)। কিন্তুক শরীল জবর কাহিল। বেশি ঘুরাঘুরির শক্তি নাই।
