কয়েদিদের দিয়েই শুরু হল শহর তৈরির কাজ। রাস্তাঘাট, কাঠের ব্যারাক, ইটের দালান, এমনকি পুরুষ অপরাধীদের জন্য ভয়াবহ সেলুলার জেল এবং মেয়ে-কয়েদিদের জন্য সাউথ পয়েন্ট বা রেণ্ডিবারিক জেলও।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে নির্বাসন দণ্ড দিয়ে পাঠানো হয়েছে নতুন কালের সশস্ত্র বিপ্লবীদের। জাতির ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা কত জ্যোতির্ময় নাম। সাভারকর, উল্লাসকর দত্ত, উপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, অম্বিকা চক্রবর্তী-এমনি অজস্র।
উনিশ শ পঁয়ত্রিশ পর্যন্ত ভারত ও বর্মা থেকে আন্দামানে কয়েদি পাঠানো চলেছে। তারপর নির্বাসন বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপানিরা এই দ্বীপমালায় হানা দেয়। এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্রও।
দেশভাগের পর ভারতবর্ষের নানা প্রান্ত থেকে কিছু কিছু মানুষ জীবিকার সন্ধানে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে এখানে আসতে শুরু করে। কেউ এসেছে চাকরি নিয়ে। কেউ বা এসে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। তবে সংখ্যায় তারা হাতে-গোনা। খুবই কম।
এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার আন্দামানের নানা দ্বীপে জঙ্গল নির্মূল করে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নিয়েছে। ছিন্নমূল মানুষেরা সেখানে আসতেও শুরু করেছে। বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপমালার নতুন ইতিহাস হয়তো তাদের হাতেই সৃষ্টি হবে।
মাসখানেক পর একদিন সকালবেলায় মেসে প্রসাদের ঘরে বসে প্রসাদ আর বিনয় চা খাচ্ছিল। এ-পাড়ার উদ্বাস্তুদের বাচ্চাগুলো তাদের বরাদ্দ মাখন-পাউরুটি নিয়ে চলে গেছে। হঠাৎ সিঁড়ির দিক থেকে হাঁক শোনা গেল।প্রসাদদা আছেন নি, অ প্রসাদদা
গলাটা চেনা চেনা। ঘুরে বসে প্রসাদ বললেন, কে?
আমি- আমি লগে আর এক জন আছে। বলতে বলতে দরজার সামনে যে এসে দাঁড়াল তার কথা এই মুহূর্তে কারও ভাবনাতে ছিল না। না প্রসাদের, না বিনয়ের।
যে এসেছে সে নিরঞ্জন। তার পাশে অচেনা একটি যুবক। প্র
সাদ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, আরে এস—এস–
ঘরে ঢুকে নিরঞ্জন এবং তার সঙ্গীটি প্রসাদদের কাছাকাছি মোড়ায় বসে পড়ে। প্রসাদ জিজ্ঞেস করেন, কলকাতায় কবে এলে?
নিরঞ্জন বলল, গেল হপ্তার বুধবার। আইজ হইল মঙ্গলবার। হে ছয়দিন হইয়া গ্যাল।
এতদিন এসেছ, আর আজ আমার সঙ্গে দেখা করার সময় হল? অন্তত একটা ফোনও তো করতে পারতে?
কী কইরা করুম? কইলকাতায় আইয়াই জ্বরে পড়লাম। ঠাইসা পিল খাইয়া জ্বর তো নামাইলাম। হের পর রিফিউজি কেম্পে কেম্পে ঘুরতে আছি। হেই সকালে বাইর অই, ফেরতে ফেরতে রাইত। উয়াস (নিঃশ্বাস) ফালানের টাইম নাই। হেইর মইদ্যে সোময় কইরা আইজ আপনের মেসে আইছি। নিরঞ্জন কথা বলছিল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ বার বার বিনয়ের দিকে চলে যাচ্ছিল। কয়েক পলক। তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, বিনয়বাবু না?
মাস কয়েক আগে নতুন ভারত-এর অফিসে এক সন্ধ্যায় কিছুক্ষণের জন্য নিরঞ্জনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কিন্তু দুর্দান্ত স্মৃতিশক্তি যুবকটির। সে তাকে ভোলনি। বিনয় বলল, হ্যাঁ–
কিছু একটা আন্দাজ করে নিয়ে নিরঞ্জন জানতে চায়, আপনেও এই ম্যাসে থাকেন নিকি?
বিনয় মাথা হেলিয়ে দেয়, হা- সে আরও কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বলা হল না।
এদিকে প্রসাদ নিরঞ্জনের সঙ্গীটিকে লক্ষ করছিলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, একে তো চিনতে পারলাম না।
নিরঞ্জন জানায়, ছেলেটির নাম বিভাস সাহা। পোর্ট ব্লেয়ারে থাকে। আদি বাড়ি ছিল ফরিদপুরে। দেশভাগের পর ইণ্ডিয়ায় আসে। তারপর চাকরি নিয়ে সোজা আন্দামানে। বিভাস রিফিউজি অ্যাণ্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টে নিরঞ্জনের সহকর্মী। আন্দামানে উদ্বাস্তু নিয়ে যাবার জন্য এবার সেও এসেছে। প্রসাদদের পরিচয়ও বিভাসকে জানিয়ে দেওয়া হল।
পরিচয়পর্বের পর প্রসাদ সুবলকে দিয়ে চা এবং গৌরাঙ্গ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে চারজনের মতো লুচি, ছোলার ডাল এবং ছানার গজা আনালেন। খেতে খেতে কথা হচ্ছিল।
প্রসাদ নিরঞ্জনকে বললেন, তুমি রিফিউজি নিতে আসবে, সেজন্যে আমরা অপেক্ষা করছিলাম।
উৎসুক সুরে নিরঞ্জন জিজ্ঞেস করে, বিশেষ কোনও দরকার আছে কি?
হ্যাঁ। বিনয়কে দেখিয়ে প্রসাদ বলতে লাগলেন, আমাদের কাগজের তরফ থেকে ওকে তোমাদের সঙ্গে আন্দামানে পাঠানো হবে। সেখানে রিহ্যাবিলিটেশন কীরকম হচ্ছে, সমস্ত নিজের চোখে দেখেও রেগুলার রিপোের্ট পাঠিয়ে যাবে। একটু ভেবে বললেন, তোমরা ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে কীভাবে রিফিউজি নিয়ে যাচ্ছ, সে-সবও দেখাবে। তাহলে পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে বিনয়ের কমপ্লিট একটা ধারণা হয়ে যাবে।
উৎসাহে চনমন করতে থাকে নিরঞ্জন, খুব ভাল অইব। আন্দামানে রিফিউজি সেটেলমেন্ট ক্যামন অইতে আছে, দ্যাশের মাইনষের হেইটা জানন দরকার। বিনয়ের দিকে ঘুরে বসে সে, আইজ কইলকাতার রিহ্যাবিলিটেশন অফিসে কিছু কাম আছে। হেইগুলান সারতে অইব। কাইল সকাল থিকা রিলিফ কেম্পগুলানে ঘুরুম। নেক্সট সোমবার আন্দামানের জাহাজ ছাড়ব। হেইর মইদ্যে রিফিউজি ফ্যামিলি জুটাইয়া ফালাইতে হইব। কাইল আমাগো লগে কেম্পে যাইতে পারবেন?
নিরঞ্জনকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ভেতরে ভীষণ উত্তেজনা হচ্ছিল বিনয়ের। আন্দামান সম্পর্কে নানা তথ্য জোগাড় করে সে তৈরি হয়েই আছে। মনে মনে বঙ্গোপসাগরের সেই দ্বীপপুঞ্জের দিকে পা বাড়িয়েই রেখেছে। বলল, নিশ্চয়ই পারব।
