আগে তো দমদম চল
নিরঞ্জন আর কিছু বলল না।
এবার হিরন্ময়দের নজর এসে পড়ল বিনয়ের ওপর। তিন অফিসারই বললেন, আপনার সঙ্গে ভাল করে আলাপ করা যাক।
বিনয়ও সেটাই চাইছিল। উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে প্রচুর তথ্য এর মধ্যে তার জানা হয়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের সে একজন। তবে এটুকুই বাঁচোয়া, অন্যদের মতো তাকে ত্রাণশিবির বা শিয়ালদা স্টেশনের নরককুণ্ডে ঘাড় গুঁজে পড়ে থাকতে হয়নি। তবু সীমান্তের এপারে এসে এই সব মানুষ কীভাবে দিন কাটাচ্ছে সে ব্যাপারে তার বিপুল অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতা নিদারুণ এবং ভয়াবহ। কিন্তু কোন পদ্ধতিতে এই বিশাল মানবগোষ্ঠীর পুনর্বাসন হবে, সরকার এ-বিষয়ে কী কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে সম্বন্ধে তার ধারণা স্পষ্ট নয়।
আসলে ত্রাণশিবির, জবরদখল কলোনি, শিয়ালদা স্টেশন, সীমান্ত এলাকা–এমনি নানা জায়গায় সকাল থেকে সন্ধে অবধি বিনয়কে ছুটে বেড়াতে হয়। অথচ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হল রাইটার্স বিল্ডিং। সেখানে তাকে আসাইনমেন্ট দেওয়া হয়নি। রাইটার্সে না গেলে বিভাগীয় মন্ত্রী, সেক্রেটারি, কমিশনার, বড় বড় আমলাদের সঙ্গে দেখা হয় না। এঁদের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখতে পারলে বা সরাসরি কথা না বললে পুনর্বাসন সম্বন্ধে সমস্ত কিছু জানা সম্ভব নয়। অবশ্য তাদের কাগজ থেকে অন্য রিপোর্টারদের রাইটার্সে ডিউটি দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন পড়ে এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে অনেকটাই জানা যায়।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্বাস্তু ত্রাণ এবং পুনর্বাসন বিভাগের তিনজন অফিসারকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে লাভই হল। তাঁদের সঙ্গে কথায় কথায় বিনয় জানতে পারে, শরণার্থীদের স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য নানা সরকারি পরিকল্পনার কথা ভাবা হচ্ছে। এই ছোট রাজ্যে বাড়তি লক্ষ লক্ষ মানুষের বাসস্থান এবং চাষের জমির ব্যবস্থা করে দেওয়া আদৌ সম্ভব নয়। ওড়িশা মধ্যপ্রদেশ বিহার আর উত্তরপ্রদেশে জনসংখ্যার তুলনায় জমিজমা অনেক বেশি। মানবিক কারণে ওই সব প্রদেশের সরকারগুলো কিছু কিছু উদ্বাস্তুকে তাদের রাজ্যে নিয়ে যেতে চায়। কেন্দ্রীয় সরকার আর্থিক সাহায্য করলে তারা চাষের জমি দিয়ে কৃষিজীবী শরণার্থীদের নতুন করে বাঁচার সুযোগ করে দেবে। এঁদের মতে, উদ্বাস্তু সমস্যা সর্বভারতীয় সমস্যা, শুধু পশ্চিমবঙ্গের একার নয়। সর্বস্বখোয়ানোনা, অগুনতি মানুষের চরম দুর্দশার মূল্যে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। এদের দায়িত্ব প্রতিটি ভারতবাসীর ভাগ করে নেওয়া উচিত। এ-জাতীয় সদিচ্ছা আলোচনার স্তরেই রয়েছে। বাস্তব চেহারা নিতে কতদিন লাগবে, কে জানে। তবে হাতের মধ্যে যা রয়েছে তা হল আন্দামান। পশ্চিম বাংলার বাইরে উদ্বাস্তুদের প্রথম পুনবসতি শুরু হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের সুদূর দ্বীপমালায়।
হিরন্ময়দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার সময় নিরঞ্জন জানিয়ে দিয়েছিল, এই খেপে যে উদ্বাস্তুরা আন্দামানে যাচ্ছে, বিনয়ও তাদের সঙ্গে যাবে। তার খেই ধরে হিরন্ময় বললেন, মেনল্যাণ্ডে থেকে কাগজের লোকেদের ওখানে যাওয়াটা ভীষণ দরকার। আন্দামান সম্পর্কে মানুষের সঠিক ধারণা নেই। বিশেষ করে পলিটিক্যাল পার্টিগুলো উলটো পালটা প্রচার চালিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। রিফিউজিরা বেশির ভাগই অশিক্ষিত, সোজা, সরল মানুষ। তারা এই সব প্রচারে ঘাবড়ে যাচ্ছে।
এই ধরনের কথা কাল নিরঞ্জনের মুখেও শুনেছে বিনয়। শুধু শোনাই নয়, নিজের চোখেও কি সে দেখছে না? আজকাল উদ্বাস্তুদের নিয়ে এখানে মিছিল, ওখানে মিটিং। সেইসঙ্গে আকাশ ফাটানো স্লোগান। সব বামপন্থী দলগুলোর একই দাবি-উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাঠানো চলবে না।
বিনয় বলল, ক্যাম্পে, শিয়ালদা স্টেশনে কি ফুটপাথে কীভাবে রিফিউজিরা দিন কাটাচ্ছে, নিজের চোখে তো রোজ দেখছি। আন্দামানে গিয়ে উদ্বাস্তুরা যদি জমিজমা পায়, ভাল থাকে, তাদের তো যেতে দেওয়াই উচিত।
নিরঞ্জন উত্তেজিত হয়ে ওঠে, এই হগল কথা হু, নে ক্যাঠা? দুই হাত নাড়তে নাড়তে বলতে লাগল, ক্যান যাইতে দ্যায় না জানেন? মিটিং করনের, মিছিল করনের মানুষ চাই। পাট্টির সাপোর্টার চাই।
হিরন্ময় বিনয়কে বললেন, আপনি তো যাচ্ছেন। আন্দামানের সেটেলমেন্ট ঘুরে ঘুরে দেখে, ওখানকার সঠিক ছবিটা মানুষের কাছে তুলে ধরুন। উদ্বাস্তুরা যেন বুঝতে পারে, আন্দামানে গেলে তাদের ভালই হবে।
একসময় গাড়ি দমদমে পৌঁছে গেল।
.
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপানের ঝটিকা বাহিনীকে ঠেকাবার জন্য অ্যালায়েড ফোর্স বা মিত্রশক্তি কলকাতায় প্রচুর সেনা নিয়ে এসেছিল। তারা কবেই দেশে ফিরে গেছে। পরিত্যক্ত সেনা ছাউনিগুলো এখন উদ্বাস্তুদের ত্রাণশিবির। এই ধরনের শিবির আগেও অনেক দেখেছে বিনয়।
একটা বড় মাঠ ঘিরে দমদমের চারটে রিলিফ ক্যাম্প। মাঠের ধারে গাড়ি থামলে বিনয়দের নিয়ে নেমে পড়েন হিরন্ময়।
নানা বয়সের প্রচুর লোকজন বাচ্চাকাচ্চা থেকে যুবকযুবতী বুড়োবুড়ি–সেখানে জড়ো হয়েছে। উদ্বাস্তুদের চেহারায় একটা আলাদা ছাপ থাকে। দেখামাত্র টের পাওয়া গেল এরা এই শিবিরগুলোর বাসিন্দা।
লোকগুলোর চোখেমুখে ভয় এবং উদ্বেগ ফুটে আছে। নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে তারা কীসব। বলাবলি করছিল। ফলে চারপাশ থেকে চাপা গুঞ্জনের মতো শব্দ উঠে আসছে।
