নানা বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে আন্দামান সম্পর্কে সে যা জোগাড় করতে পারল সেটা মোটামুটি এইরকম।
প্রাচীন উপকথায় উল্লেখ আছে, একদল সওদাগর বিশাল ময়ুরপঙ্খী নৌকোর বহর সাজিয়ে আন্ধারমাণিক্যে পৌঁছেছিলেন। এই আন্ধারমাণিক্যই খুব সম্ভব আন্দামান।
কিন্তু উপকথা উপকথাই। তার মধ্যে কতটা সত্যি আর কতখানি কল্পনা তা বোঝার উপায় নেই।
বঙ্গোপসাগর দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে দুঃসাহসী নাবিকরা যাতায়াত করেছে পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা দেশে। শোনা যায়, এক ঝাক সাগরপাখি দিক ভুল করিয়ে দুজন নাবিককে নাকি আন্দামানে নিয়ে এসেছিল। আন্দামানের মাটিতে সেই বোধহয় কোনও ভিনদেশি মানুষের প্রথম পদক্ষেপ। তারপর থেকে এই দীপপুঞ্জে কত মানুষ যে এসেছে! কত জাহাজ যে ভিড়েছে!
আবার এও শোনা যায়, সুপ্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় এবং আরব বণিকেরা, বৌদ্ধ শ্রমণ এবং ভিক্ষুণীরা বার বার পালের জাহাজে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়েছেন। সীমাহীন সমুদ্রের মাঝখানে এই দ্বীপমালার খবর তারা জানতেন। খাদ্য এবং স্বাদু জলের সন্ধানে তাদের জাহাজ এখা, এডত। একঘেয়ে সমুদ্রযাত্রায় কটা দিন ওঁরা বিশ্রামও করে নিতেন।
আরও জানা গেছে, মালয়ি এবং চিনা জলদস্যুরা আন্দামানের উপকুলে উপকূলে শিকারের খোঁজে ঘুরে বেড়াত। মানুষ শিকার। সুযোগ পেলেই এখানকার আদিম অধিবাসীদের ধরে নিয়ে শ্যাম, কম্বোডিয়ায় ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিত। এ-সবও কতটা সত্যি, কে জানে। আন্দামানের সুদূর সেই অতীত কুয়াশায় ঘেরা।
ঐতিহাসিকদের অনুমান, খ্রিস্টজন্মের হাজারখানেক বছর আগে চিনা এবং জাপানিরা আন্দামানের কথা জানত। ছোট বড় প্রায় আড়াই শ দ্বীপ নিয়ে এই আর্কিপেলাগো। সমুদ্রের মাঝখানে সৃষ্টিছাড়া এই ভূখণ্ডগুলির নাম-মাহাত্ম্য বিচিত্র। কীভাবে আন্দামান নামের উৎপত্তি তার সঠিক হদিস পাওয়া মুশকিল।
চিনারা এই দ্বীপকে বলত ইয়েঙ-তে-মাঙ, জাপানিরা বলত আন্দাবান। এ-দুটো ছাড়াও আন্দামানের আরও অজস্র নাম জানা গেছে। প্রায় অষ্টোত্তর শতনাম। মার্কোপোলো বঙ্গোপসাগরে অ্যাঙ্গামানিয়াম নামে দ্বীপমালা দেখেছিলেন। খুব সম্ভব সেটাই আজকের আন্দামান। চৈনিক ভিক্ষু তি-সিঙ এই দ্বীপে এসেছিলেন। সেই সময় একে বলা হতো আগদামান। ক্লডিয়াস টলেমি একদা এই দ্বীপকে ভুল করে বলেছিলেন-আগাথু ডাইসন নেসস (উত্তর আত্মার দ্বীপ)। পরে তিনি জেনেছিলেন এর নাম আগমাটে। আরও পরে পরিব্রাজক নিকোলো কন্টির মতে এই দ্বীপ হল স্বর্ণদ্বীপ। মাস্টার ফ্রেডরিক ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি নিকোবর থেকে পেও অবধি সারি সারি অসংখ্য দ্বীপ দেখেছিলেন। সে-সময় এখানকার জংলী আদিবাসীরা নাকি এই দ্বীপমালাকে বলত আশুেমেওন। মালয়িরা আন্দামানের আদিম, ভূমিপুত্রদের নাম দিয়েছিল হমানী।
এমনি অজস্র। এ-সবের ভেতর থেকে এই দ্বীপপুঞ্জের আন্দামান নামটি কবে, কীভাবে সৃষ্টি হল, এখন আর তা জানার উপায় নেই।
এ-সব কুহেলিবিলীন অতীতের কথা।
আন্দামানের নতুন ইতিহাস শুরু হল সতেরো শ আটাশি সালের সেপ্টেম্বরে। লর্ড কর্ণওয়ালিস লেফটেনান্ট ব্লেয়ার এবং লেফটেনান্ট নর্থব্রুককে আন্দামানে পাঠালেন। নির্দেশ দেওয়া হল, তারা বেশ কিছুদিন এখানে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব সার্ভে করে কলকাতায় ফিরে একটা বিশাদ রিপোর্ট পেশ করবেন। কর্ণওয়ালিসের উদ্দেশ্য, পরিবেশ অনুকূল হলে এখানে নতুন উপনিবেশ গড়ে তোলা হবে।
ব্লেয়ার এবং নর্থব্রুকের রিপোর্টের ভিত্তিতে পরের বছর দক্ষিণ আন্দামানে সহস্র বছরের নিবিড় জঙ্গল সাফ করে চ্যাথাম এবং এখনকার পোর্ট ব্লেয়ার কলোনি বসানো হল। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে উত্তর-পূর্ব দিকে একটা বন্দর বানিয়ে সেটেলমেন্ট সেখানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পোতাশ্রয়ের পক্ষে জায়গাটা সুরক্ষিত। নামও একটা দেওয়া হল–পোর্ট কর্ণওয়ালিস। কিন্তু এলাকাটা ভীষণ অস্বাস্থ্যকর এবং মুত্যুহার প্রচণ্ড বেশি হওয়ায় চার বছরের মধ্যে কলোনি উঠে যায়।
এরপর ষাট বছর ভারতের মেনল্যাণ্ডের সঙ্গে আন্দামানের যোগাযোগ প্রায় ছিল না।
পুরো ছদশক বাদে ফের আন্দামানের কথা ব্রিটিশ সরকারের বিশেষভাবে মনে পড়ল। সেটা ছিল আঠারো শ সাতান্ন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় একটি বছর। সিপাহী বিদ্রোহ নামে দেশের প্রথম স্বাধীনতা-সংগ্রামের শুরু ওই সাতান্নতেই। ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিদ্রোহীদের বহু দূরে নির্বাসনে পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হল।
আঠারো শ আটান্নর মার্চে ডক্টর জে. পি. ওয়াকার দুশ জন বন্দি, দুজন ডাক্তার, ওভারসিয়ার, ওল্ড ন্যাভাল ব্রিগেডের পঞ্চাশজন সশস্ত্র রক্ষী নিয়ে কলকাতা থেকে সেমিরামিস নামে একটি জাহাজে আন্দামান রওনা হলেন। তখন থেকেই পোর্ট ব্লেয়ারে নতুন করে স্থায়ী উপনিবেশ তৈরির সূচনা।
এর কাছাকাছি সময়ে বর্মায় রাজা থিবোর সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ প্রভুরা প্যাগোডার দেশ বর্মাকে হাতের মুঠোয় পুরতে চায়। হতে চায় সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর। থিবো রাজি নন। তাই এই সংঘাত। ইতিহাসে যার নাম তৃতীয় ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধ। থিবো মরণপণ লড়াই চালিয়েও হেরে যান। ভারতের সিপাহি বিদ্রোহের বীর যোদ্ধাদের মতো বর্মার দুঃসাহসী সৈনিকদেরও বন্দি । হিসেবে আন্দামানে চালান দেওয়া হল। শুধু এদেরই নয়, ভারতের মেনল্যাণ্ডে এবং বর্মা থেকে। মারাত্মক সব অপরাধীদের-খুনী, জলদস্যু, ডাকাত–দীপান্তরী সাজা দিয়ে আঁকে ঝাঁকে পাঠানো হতে লাগল। শুধু পুরুষ অপরাধীদেরই নয়, মেয়ে অপরাধীদেরও। এই শাস্তির আর-এক নাম কালাপানি।
