বিনয়ের কাঁধে আলতো চাপড় দিয়ে প্রসাদ মৃদু হাসেন।–ভয় নেই। একটা সুখবর পাবে।
জগদীশ গুহঠাকুরতা তার কামরায় একাই ছিলেন। অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। নানা ধরনের ব্যবসা, কলকারখানা এবং খবরের কাগজ–সব মিলিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য চালাতে হয়। ধানাই পানাই করার সময় নেই। বিনয়দের বসতে বলে সোজাসুজি কাজের কথায় চলে এলেন। বিনয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার লেখাগুলো রেগুলারলি পড়ি। গুড ওয়ার্ক। যাই হোক, তোমাকে একটা নতুন দায়িত্ব দিতে চাই
কাগজের মালিক তার লেখার প্রশংসা করছেন। খুশিতে বুকের ভেতর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। বিনয় কোনও প্রশ্ন না করে অপেক্ষা করতে থাকে।
জগদীশ থামেননি, তুমি নিশ্চয়ই জানো, আন্দামানে রিফিউজিদের রিহ্যাবিলিটেশন শুরু হয়েছে। ইণ্ডিয়ার কোনও কাগজ থেকে এখনও ওখানে লোক পাঠানো হয়নি। তারাপদবাবু, প্রসাদবাবু এবং আমার ইচ্ছে, তুমি আন্দামানে যাও। রিহ্যাবিলিটেশন কীরকম হচ্ছে, সব নিজের চোখে দেখে ওখান থেকেই রিপোর্ট পাঠাবে। তোমার ওপর আমাদের আস্থা আছে। একটু থেমে জানতে চাইলেন, তোমার কোনও অসুবিধা নেই তো?
আন্দামানে যাবার কথা আগেই ভেবে রেখেছিল বিনয়। ব্যগ্রভাবে বলল, না স্যার
বেশ কিছুদিন ওখানে থাকতে হবে।
যতদিন দরকার, থাকব।
জগদীশ বললেন, গুড। খুব শিগগির কিছু রিফিউজি ফ্যামিলিকে আন্দামানে পাঠানো হচ্ছে। আমরা চাই তুমি ওদের সঙ্গেই যাও। কীভাবে যাবে, কবে যাবে, প্রসাদবাবু সব বুঝিয়ে দেবেন।
কথা হয়ে গিয়েছিল। বিনয়রা উঠে পড়ে।
.
৭৩.
বিনয়কে সঙ্গে করে রিপোর্টিং সেকশনে নিজের টেবলে এসে বসলেন প্রসাদ। বললেন, তোমার ওপর অথরিটির কীরকম আস্থা, বুঝতে পারলে তো? খুব মন দিয়ে আন্দামান রিহ্যাবিলিটেশনের রিপোর্টগুলো করবে। কলকাতা থেকে কীভাবে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কোথায় রাখা হচ্ছে, সেখানকার পরিবেশ কেমন, খুঁটিনাটি কিছু বাদ দেবে না।
নতুন ভারত-এর সর্বেসর্বা জগদীশ গুহঠাকুরতা তার মতো একজন আনভিজ্ঞ, নতুন সাংবাদিককে এত বড় একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন। উদ্দীপনায় ভেতরে ভেতরে টগবগ করে ফুটছিল বিনয়। বলল, আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব প্রসাদদা
শুধু রিফিউজিই নয়, ওখানে প্রায় এক শ বছর আগে পেনাল কলোনি গড়ে উঠেছিল। সে-সব সম্বন্ধেও আলাদাভাবে লিখবে
যে খুনী-ডাকাতদের আন্দামানে পাঠানো হয়েছিল আপনি কি তাদের কথা বলছেন?
হ্যাঁ। তাছাড়া রয়েছে বহুকালের পুরোনো জংলী আদিবাসীরা। ওরাই সন্স অফ দা সায়েল। তাদের সম্বন্ধেও খবরাখবর নিয়ে লেখা পাঠাবে। রিফিউজি রিহ্যাবিলিটেশনটা হাইলাইট করবে ঠিকই, তবে অন্য দিকগুলোর ওপরও জোর দেবে। যাতে আন্দামান সম্পর্কে পাঠক একটা টোটাল পিকচার পেয়ে যায় সেটা মাথায় রাখবে।
অন্য সব দিকের কথা এখনও ভাবেনি বিনয়। তার ভাবনাচিন্তা জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের সুদূর এক দ্বীপপুঞ্জে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন। সে বলল, যা বললেন, আমি তাই করব প্রসাদদা।
একটু চুপচাপ।
তারপর প্রসাদ জিজ্ঞেস করেন, আন্দামান জায়গাটা সম্পর্কে তোমার কোনও ধারণা আছে? হঠাৎ কেন এই প্রশ্ন, বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকে বিনয়। আন্দামান সম্বন্ধে যেটুকু সে জানে তা খুবই ভাসা ভাসা, অস্পষ্ট। ভারতের মেনল্যাণ্ড থেকে একসময় মারাত্মক অপরাধীদের সেখানে চালান করা হতো। অবশ্য এই শতকের গোড়ায় দ্বীপান্তরী সাজা দিয়ে অগুনতি স্বাধীনতা সংগ্রামীকে সেখানে পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া ওখানকার লোকাল বন, সেলুলার জেল, রেন্ডিবারিক জেল, নানা আদিবাসী–এদের সম্পর্কে মাসকয়েক আগে নিরঞ্জনের কাছে যা শুনেছিল তার বেশি জানা নেই বিনয়ের। প্রসাদকে সেই কথাই বলল সে।
প্রসাদ বললেন, কোনও একটা নতুন জায়গায় যাবার আগে তার সম্বন্ধে সমস্ত কিছু জেনে নেওয়া উচিত। তার টোপোগ্রাফি, হিস্ট্রি, পিপল, ক্লাইমেট। তুমি এক কাজ কর–
বলুন
আমাদের অফিস লাইব্রেরিতে আন্দামান সম্পর্কে বিশেষ কিছু পাবে না। ন্যাশনাল লাইব্রেরির মেম্বারশিপ কার্ড করে নাও। জগদীশবাবুকে দিয়ে একটা রেকমেন্ডেশন লেটার লিখিয়ে দেব। কার্ডটা চট করে হয়ে যাবে। ওখানে ডিটেলে সব পাবে। .
আচ্ছা
একটু ভেবে বিনয় বলল, জগদীশবাবু বললেন, খুব শিগগিরই আন্দামান থেকে রিফিউজি নেবার জন্যে রিহ্যাবিলিটেশনের লোকেরা আসবে। কবে আসতে পারে?
প্রসাদ বললেন, মনে হচ্ছে মাসখানেকের ভেতর।
আপনি বলেছিলেন, আগে দুবার নিরঞ্জন চক্রবর্তী এসে আন্দামানে রিফিউজি নিয়ে গেছে। এবারও কি সে আসবে? মানে একজন চেনাজানা লোককে পেলে সুবিধে হয়
রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে কাকে পাঠানো হবে, ঠিক জানি না। তবে নিরঞ্জন খুবই এফিসিয়েন্ট। মনে হচ্ছে ওকেই পাঠাবে।
নিরঞ্জনবাবুর সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করব? কলকাতায় এলে কোথায় থাকে, কিছুই জানি না।
সেজন্যে চিন্তা করতে হবে না। ও এলেই হয় মেসে, নইলে অফিসে আমার সঙ্গে দেখা করবে।
.
জগদীশ গুহঠাকুরতা একটি দৈনিক কাগজের সম্পাদক। তাছাড়া এই শহরের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। খুবই প্রভাবশালী। তার সুপারিশের জোরে একদিনেই ন্যাশনাল লাইব্রেরির কার্ড হয়ে গেল।
স্রোতের মতো উদ্বাস্তুরা ওপার থেকে অনবরত আসছিলই। বিনয়কে শিয়ালদায় তো বটেই, সীমান্ত অবধি ওই লাইনের নানা স্টেশনে ছুটতে হচ্ছে। তারই ফাঁকে ফাঁকে সময় করে কোনও কোনও দিন দু-চার ঘণ্টার জন্য ন্যাশনাল লাইব্রেরিতেও যাচ্ছে।
