জওহরলাল আবার কলকাতায় এলেন। ছুটলেন হুগলি, হাওড়ায়। সঙ্গে রায়। কড়া নির্দেশ দেওয়া হল, প্রতিহিংসা বন্ধ করতে হবে। একবিন্দু রক্তপাতও যেন না
পূর্ব পাকিস্তানের মতো অত বিরাট আকারে না হলেও, পশ্চিমবঙ্গের কোনও কোনও এলাকা তখন বধ্যভূমি। এমন অভিশপ্ত, অন্ধকার দিন এপার বাংলা ওপার বাংলার বাঙালির জীবনে খুব সম্ভব আর কখনও আসেনি।
এরই মধ্যে সীমান্তের ওপার থেকে আরও কয়েক লক্ষ শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছে।
একটা জাতির জীবনে এত সব নিদারুণ ঘটনা ঘটে চলেছে, আর তারই ভেতর পুনর্বাসনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার আন্দামানে উদ্বাস্তু পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। তার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল আগেই।
কিছুদিন ধরে নানা ত্রাণশিবিরে গিয়ে সরকারি পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মী এবং অফিসাররা কোন কোন উদ্বাস্তু পরিবারকে আন্দামানে পাঠানো হবে তার তালিকা তৈরি করছিল। এখনও করে চলেছে। বেশ কিছু পরিবারকে এর মধ্যে আন্দামানে পাঠানোও হয়েছে। এই নিয়ে ত্রাণশিবিরগুলোতে চলছে তুমুল আলোড়ন।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে নতুন করে যে মানুষের ঢল নেমেছে তাদের নিয়েই বিনয় এখন সারাক্ষণ ব্যস্ত। ঝিনুককে সঙ্গে করে সে যখন দেশ ছাড়ে তখন দিনে একটাই ট্রেন উদ্বাস্তুদের নিয়ে কলকাতায় আসত। সেটার গায়ে একটা তকমা আঁটা থাকত–রিফিউজি স্পেশাল। এখন সারাদিনে কত রিফিউজি স্পেশাল যে আসছে তার লেখাজোখা নেই। সেগুলোর আসার ঠিকঠিকানা নেই। সকালে আসছে, দুপুরে আসছে, বিকেলে আসছে, সন্ধেয় আসছে, এমনকি মধ্যরাতেও।
আন্দামানে উদ্বাস্তু পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্ত জানাজানি হবার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আরও বেশি করে রাস্তায় নেমে পড়েছে। দেশভাগের পর কত যে সংগঠন তৈরি হয়েছে তার হিসেব নেই। উদ্বাস্তু উন্নয়ন সমিতি, উদ্বাস্তু কল্যাণ পরিষদ,পশ্চিমবঙ্গ বিকাশকেন্দ্র ইত্যাদি ইত্যাদি। তারাও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে না। এখন ট্রামবাস থামিয়ে, যানজট পাকিয়ে কলকাতার নানা প্রান্তে অগুনতি মিছিল থেকে স্লোগানে স্লোগানে মহানগরীর আকাশ চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের আন্দামানে নিয়ে যাওয়া
চলবে না, চলবে না–
একজন উদ্বাস্তুও পশিচমবঙ্গের বাইরে
যাবে না, যাবে না
পশ্চিমবঙ্গেই উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন
দিতে হবে, দিতে হবে।
উদ্বাস্তুদের নিয়ে সর্বনাশা খেলা–।
বন্ধ কর, বন্ধ কর।
ত্রাণশিবির এবং জবরদখল কলোনিগুলোতে আপাতত যাওয়া বন্ধ রেখেছে বিনয়। সকালে ঘুম থেকে উঠেই এখন সে ছোটে শিয়ালদা স্টেশনে। সমস্ত দিন সেখানেই পড়ে থাকে। দুপুরে কাছাকাছি কোনও পাইস হোটেলে গিয়ে খেয়ে আসে। সন্ধের পর নতুন শরণার্থীদের সম্বন্ধে নানা তথ্য জোগাড় করে চলে যায় নতুন ভারত-এর অফিসে। ঝড়ের গতিতে প্রতিবেদন লিখে ফের শিয়ালদা। মেসে ফিরতে ফিরতে মাঝরাত। কখনও কখনও শিয়ালদাতেই পুরো রাত থেকে যেতে হয়।
এরই মধ্যে সীমান্তেও গেছে কয়েকবার। এই তো সেদিন জওহরলাল এবং বিধান রায় যখন বনগাঁ শহরে গেলেন, খবরের সন্ধানে বিনয়কে সেখানেও ছুটতে হয়েছিল। তাছাড়া, সব উদ্বাস্তু কলকাতায় আসে না, বর্ডারের কাছাকাছি রেল স্টেশনগুলোর প্ল্যাটফর্মে, আকাশের নিচে ভোলা মাঠে, গাছতলায় ঝুপড়ি বানিয়ে ঘাড় গুঁজে ছেলেমেয়ে বউ নিয়ে পড়ে আছে। তাদের সঙ্গে দেখা করা, কথা বলা জরুরি।
আন্দামানের ব্যাপারটা পুরোপুরি দেখছেন প্রসাদ নিজে। নিরঞ্জনের সঙ্গে কমাস আগে আলাপ হবার পর বঙ্গোপসাগরের ওই দ্বীপমালা সম্পর্কে বিনয়ের প্রচণ্ড আগ্রহ। উদ্বাস্তুদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিনয়ের ইচ্ছা আন্দামানে যায়। কিন্তু প্রসাদকে তা বলা যায় না। সে আনকোরা রিপোর্টার। তাকে যে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে সেটাই মুখ বুজে করে যেতে হবে।
তবে এত দৌড়ঝাঁপের মধ্যেও বিনয়ের কানে এসেছে, নিরঞ্জন তার পুরানো ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে রিফিউজি অ্যাণ্ড রিহ্যাবিলিটেশন মিনিস্ট্রির নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে। এর ভেতর দু দুবার কলকাতায় এসে জাহাজ বোঝাই করে উদ্বাস্তু নিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারে গেছে।
কলকাতায় এলে নিরঞ্জন প্রসাদের সঙ্গে দেখা করবেই। মাঝখানে দুবার সে উদ্বাস্তু নিতে এসেছিল। তখনও প্রচণ্ড ছোটাছুটির ভেতর সময় করে নতুন ভারত-এ হাজির হয়েছে। কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে দেখা হয়নি। নিরঞ্জন যখন এসেছে, তখন সে হয় শিয়ালদায়, নইলে সীমান্তের কোনও রেল স্টেশনে বা ছোটখাটো কোনও শহরে বা মাঠেঘাটে, উদ্বাস্তুদের মধ্যে।
.
আজ সন্ধেবেলায় শিয়ালদা থেকে নতুন ভারত-এর অফিসে আসতেই প্রসাদ বললেন, তাড়াতাড়ি রিপোর্টটা লিখে ফেল। তারপর তোমার সঙ্গে খুব দরকারি কথা আছে।
উৎসুক সুরে বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী কথা প্রসাদদা?
পরে শুনো। আগে কাগজ কলম নিয়ে তোমার টেবলে গিয়ে বসো।
ঘণ্টাখানেকের ভেতর প্রতিবেদনটা শেষ করে প্রসাদের সামনে এসে দাঁড়ায় বিনয়। লেখাটা তার হাত থেকে নিয়ে টেবলে পেপারওয়েট চাপা দিয়ে রেখে প্রসাদ উঠে পড়েন। –চল।
বিনয় অবাক। বলে, কোথায়?
জগদীশবাবু তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন।
জগদীশবাবু, অর্থাৎ নতুন ভারত-এর মালিক। সর্বেসর্বা। বুকের ভেতর হাতুড়ির ঘা পড়তে থাকে বিনয়ের। হঠাৎ এই তলব কেন? তার কাজে কি কোনও খুঁত বা ভুল ধরা পড়েছে? সে তো কখনও ফাঁকি দেয় না। লেখা যাতে পাঠকের মনে ধরে, তথ্যে যাতে গোলমাল না থাকে, সেদিকে তার নজর। তা হলে? ঢোক গিলতে গিলতে জিজ্ঞেস করে, উনি যেতে বলেছেন কেন?
