কিন্তু পাকিস্তান এক বিচিত্র রাষ্ট্র। ঘৃণা বিদ্বেষ হিংসা এবং অজস্র রক্তপাতের মধ্যে যার জন্ম, সেখানে এক কোটির মতো সংখ্যালঘু এখনও থেকে গেছে। রয়েছে তাদের প্রচুর জমিজমা এবং দালানকোঠা। রয়েছে তাদের ঘরে যুবতী মেয়েরা। ফলে ওখানে শান্তি ব্যাপারটা খুবই ঠুনকো। কাঁচের বাসনের মতো। দেশটার কোণে কোণে জমা হয়ে আছে বিদ্বেষ আর অবিশ্বাসের বারুদ। যে-কোনও ছুতোনাতায় যখন তখন সেগুলোতে এসে পড়তে পারে আগুনের একটা ফুলকি। ঠিক তেমনটাই ফের ঘটল। মাঝখানে কয়েক মাসের ক্ষণস্থায়ী ভঙ্গুর শান্তিটি ভেঙেচুরে খান খান হয়ে গেল।
পূর্ব পাকিস্তানে নতুন করে দাঙ্গার সূচনা কীভাবে হল, তার কারণগুলো পশ্চিম বাংলায় বসে সঠিক জানা সম্ভব হচ্ছিল না। তবে সীমান্তের ওপার থেকে টুকরো টুকরো যে খবর পাওয়া যাচ্ছিল তা মোটামুটি এইরকম। তখনও পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি কর্মীদের সিকিভাগ হিন্দু। ডাক্তার, কবিরাজ, স্কুলের শিক্ষক, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, উকিল ইত্যাদি শতকরা ষাট ভাগেরও বেশি। এরা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের চক্ষুশূল। এরা যদি দেশ ছেড়ে চলে যায়, অনেকেরই সুবিধা হয়। তাছাড়া বাকি হিন্দুরা এক লহমাও ওখানে পড়ে থাকবে না। কার ভরসায় থাকবে? অথচ এই পাকিস্তান যে তাদেরও জন্মভূমি, তাদেরও স্বদেশ, তাদের পিতৃপুরুষ আবহমান কাল এখানকারই বাসিন্দা-এ-সব আর মানছে কে?
আসলে বিদ্বেষ হল অন্ধ, বধির। তার বিবেক নেই, বোধ নেই। যা আছে তা হল হাঙরের মতো হিংস্র দাঁত আর চিতার মতো নখ। পাকিস্তান মাঝে মাঝে দাঁত এবং নখ লুকিয়ে রাখে, তখন ক্ষণিকের শান্তি। তারপর আবার সেগুলো বেরিয়ে আসে।
দেশভাগের ঠিক আগে আগে সেই ছেচল্লিশ সাল থেকে যা ঘটে আসছে ফের তা শুরু হয়ে গেছে। খুন, আগুন। পুর্ব পাকিস্তানে এক জেলা থেকে আর এক জেলায় সে-সব ছড়িয়ে পড়তে লাগল। হননকারীরা, ধর্ষকেরা দেশটাকে সেই আদিম, বর্বর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে লাগল।
তাণ্ডব চরম পর্যায়ে পৌঁছল একটা গুজবের সুতো ধরে। একসময় অখণ্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফজলুল হক। তার কর্মক্ষেত্র তখন কলকাতা। রাজনৈতিক নেতারা ছাড়াও, এই শহরের অনেক বিশিষ্ট মানুষ ছিলেন তারা প্রীতিভাজন বন্ধু। ঝাউতলা অঞ্চলে চমৎকার একখানা বাড়িও করেছিলেন। কলকাতায় তিনি সেখানেই থাকতেন।
দেশভাগের পর হক সাহেব পাকাপাকিভাবে ঢাকায় চলে যান। এই বাংলার সঙ্গে তার সম্পর্কে ছেদ পড়ে।
ফজলুল হক পূর্ববাংলার মানুষ। জীবনের শেষ পর্বটা পাকিস্তানের নাগরিক হয়ে সেখানকার নানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তখন জড়িয়ে পড়েছেন, কলকাতায় আর ফেরার সম্ভাবনাই নেই। কাজেই ঝাউতলার বাড়ি রাখার কোনও মানে হয় না।
হঠাৎই একদিন তিনি কলকাতায় চলে আসেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল : ওখানকার বাড়ি বিক্রি করা; তাছাড়া এপার বাংলার পুরনো সহকর্মী এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছাটাও ছিল।
হক সাহেব আবেগপ্রবণ মানুষ। জীবনের সেরা সময়টা যেখানে কাটিয়ে গেছেন সেখানে এক সময়ের চেনাজানা মানুষজনকে পেয়ে কী খুশিই না হয়েছিলেন।
কিন্তু এই আনন্দ খুবই ক্ষণস্থায়ী। আচমকা পূর্ব পাকিস্তানে কারা যেন চাউর করে দিল হক সাহেবকে। কলকাতায় খুন করা হয়েছে। গুজবের হাজারটা পাখনা থাকে। বেড়া আগুনের মতো সেটা ফুলে ফেঁপে সহস্রগুণ হয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। খুলনায় রাজশাহিতে বরিশালে সিলেটে চট্টগ্রামে, সর্বত্র খুন খারাপি শুরু হয়ে গেল। নিমেষে পূর্ব পাকিস্তান হয়ে উঠল সুবিশাল এক কসাইখানা। হাজার হাজার মানুষ লাশে পরিণত হল। গ্রামে গঞ্জে শহরে রক্তের স্রোত বয়ে যেতে লাগল। পুড়ে ছাই হয়ে গেল কত যে বাড়িঘর। সাতপুরুষের দালান কোঠা পলকে ধ্বংসস্তূপ। ঘাতকবাহিনীর নজর এড়িয়ে যারা কোনওরকমে বেঁচে ছিল, তারা ছুটল সীমান্তের দিকে। পূর্ব পাকিস্তানের হননপুরী ছেড়ে ওরা ভারতে পালাতে চায়। শয়ে শয়ে নয়, হাজারে হাজারে নয়, লাখে লাখে। কলকাতায় নতুন করে ছিন্নমূল মানুষের স্রোত বইল।
সারা ভারতবর্ষ এই নিদারুণ গণহত্যায় স্তম্ভিত। উৎকণ্ঠিত জওহরলাল নেহরু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলি খানকে পর পর চিঠি লিখতে লাগলেন, যেভাবে হোক এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। তিনি ছুটে এলেন পশ্চিম বাংলায়।
ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়কে সঙ্গে নিয়ে গেলেন সীমান্তে! স্বচক্ষে দেখলেন কীভাবে আতঙ্কগ্রস্ত শরণার্থীরা দলে দলে চলে আসছে। তাদের মুখে শুনলেন, কোন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে তার অনুপুঙ্খ বিবরণ।
এদিকে ফজলুল হককে অনুরোধ করা হল, তিনি যেন অবিলম্বে পাকিস্তানে ফিরে যান। তাঁকে স্বচক্ষে দেখলে উন্মত্ত জল্লাদেরা বুঝতে পারবে, কলকাতায় তার গায়ে একটি আঁচড়ও লাগেনি। দেশে ফিরে সমস্ত কিছু দেখে শুনে শিউরে উঠছিলেন হক সাহেব। তারপর হিংস্র উন্মত্ততা বন্ধ করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের নানা প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন।
পূর্ব পাকিস্তানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয়ে গেল দাঙ্গা! দাঙ্গা ঠিক নয়, একতরফা নির্বিচার হনন। হুগলি হাওড়া আর ব্যারাকপুরের চটকলগুলোতে যে বিহারি মুসলমান শ্রমিকরা কাজ করত তাদের ওপর চলল প্রচণ্ড হামলা। খুন হল অজএ নিরীহ নিরপরাধ অসহায় মানুষ।
