প্রসাদ বললেন, পশ্চিমবঙ্গ ছোট স্টেট। মাত্র তেত্রিশ হাজার স্কোয়ার মাইলের মতো এরিয়া। এমনিতেই এখানে পপুলেশনের বিরাট চাপ। তার ওপর এর মধ্যেই কুড়ি লাখের মতো রিফিউজি ইস্ট পাকিস্তান থেকে চলে এসেছে। একটা ছোট রাজ্যের পক্ষে বাড়তি মানুষের প্রেসার নেওয়া সম্ভব নয়। শুনেছি, বিহারে, ওড়িশায়, সেন্ট্রাল প্রভিন্সে কিংবা ইণ্ডিয়ার অন্য বড় স্টেটগুলোয় যেখানে যেখানে ফাঁকা জায়গা পাওয়া যাবে সেইসব এলাকায় বাঙালি উদ্বাস্তুদের সেটেলমেন্টের কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু আন্দামানের কথা তো জানি না। বিনয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাজ তো রিফিউজিদের নিয়ে। এমন কিছু শুনেছ?
এতক্ষণ প্রসাদ যা বলছিলেন, অর্থাৎ শরণার্থীদের ইণ্ডিয়ায় অন্য প্রভিন্সে নিয়ে যাবার কথাই শুনেছে বিনয়। আন্দামানে সেটেলমেন্টের কোনও পরিকল্পনা হয়েছে কি না, তারও জানা নেই। বলল, না–
প্রসাদ নিরঞ্জনের কাছে জানতে চাইলেন, তুমি কার কাছে শুনেছ?
নিরঞ্জন যা উত্তর দিল, সংক্ষেপে তা এইরকম। পোর্ট ব্লেয়ারে আন্দামান নিকোবর আইল্যান্ডের চিফ কমিশনারের অফিস থেকে এইরকম একটা আভাস সে পেয়েছে। তাছাড়া, দক্ষিণ আন্দামান আর মধ্য আন্দামানে জাঙ্গল ফেলিং শুরু হয়েছে। অরণ্য নির্মূল করে মানুষের বসবাসের জন্য প্রচুর জমি বার করা হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, খুব শিগগির উত্তর আন্দামানেও এই প্রক্রিয়ায় কাজ শুরু হবে।
নিরঞ্জন বলতে লাগল, আমি তো পি.ডব্লু.ডিতে কাম করি। আমারে অফার দেওয়া অইছে, রিফিউজি অ্যাণ্ড রিহ্যালিটেশন ডিপার্টমেন্টে কাম করতে রাজি কি না। এই হগল দেইখা শুইনা মনে অইছে, গভর্নমেন্ট রিফিউজিগো উইখানে পাঠাইতে পারে। প্রসাদদা, সত্যই যদি হেইটা হয়, আমি রিহ্যাবিলিটেশনেই যামু।
প্রসাদ শান্ত, গম্ভীর ধরনের মানুষ। গলা উঁচুতে তুলে কখনও কথা বলেন না। উচ্ছ্বাস কম। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁকে রীতিমতো উত্তেজিত দেখাচ্ছে। বললেন, এ তো একটা বিরাট খবর। তাঁর টেবলের সামনে ভিড়ের ভেতর রিপোর্টিং সেকশনের মণিলাল করও রয়েছে। তাকে বললেন, তোমার তো রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডিউটি। বিধানবাবু তোমাকে পছন্দ করেন। আন্দামানের খবরটা তার কাছ থেকে যেভাবেই হোক জেনে নিতে চেষ্টা করবে। বিনয়, তুমিও খবর নিও।
মণিলাল আর বিনয়, দুজনেই বলল, নিশ্চয়ই নেব দাদা
নিরঞ্জন বলে, প্রসাদদা আন্দামানের জমি হাই ক্লাস। ভেরি ফার্টাইল ল্যাণ্ড। ইস্ট পাকিস্তানের। রিফিউজি যারা দ্যাশে চাষবাস লইয়া আছিল, হেগো যদি হেইখানে লইয়া যাওন যায়, সোনা ফলাইয়া দিতে পারব। তার উপুর বে অফ বেঙ্গলে কত যে মাছ তার লিখাজোখা নাই। সাত জন্ম খাইলেও ফুরাইব না। রিহ্যাবিলিটেশন যদি সত্যই হয়, সুযুগটা ছাড়ন ঠিক অইব না। আন্দামান সেকেণ্ড ব্যাঙ্গল অইয়া উঠব। ওয়েস্ট ব্যাঙ্গলের উপুর চাপ অনেক কইমা যাইব। উদ্দীপনায়, তার চোখমুখ ঝকঝক। করতে থাকে।
নিরঞ্জনকে লক্ষ করছিল বিনয়। বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ যুগলের মুখটা মনে পড়ে গেল তার। এর মধ্যে নানা কাজে এমনই জড়িয়ে গিয়েছিল, নানা দুশ্চিন্তায় এতই উতলা থাকতে হয়েছে যে মুকুন্দপুর এবং যুগলের কথা ভাবার ফুরসতই পায়নি।
যুগল অক্ষরপরিচয়হীন, দেশে থাকতে হেমনাথের বাড়িতে কামলা খাটত। কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে। এক বিশাল, স্বপ্নদর্শী মানুষ। দেশভাগ না হলে কোনওদিনই তার হদিস পাওয়া যেত না। সে রাজদিয়া এবং তার চারপাশের গ্রামগঞ্জের সর্বস্বখোয়ানো, আশাহীন, ভবিষ্যহীন, অসংখ্য ছিন্নমূল মানুষকে শিয়ালদা স্টেশন, ত্রাণশিবির এবং কলকাতার ফুটপাথ থেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে এনে মুকুন্দপুরে নতুন এক পূর্ব বাংলা গড়ে তুলছে। অপার মমতায়, অফুরান উদ্যমে। মহান কোনও শিল্পীর মতো। যুগলের মতোই নিরঞ্জনও চায় আন্দামানে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেওয়া হোক, এই দ্বীপমালা যেন নতুন এক বঙ্গভূমি হয়ে ওঠে।
নিরঞ্জন বলছিল, রিফিউজরা যদি শ্যাষ তরি (অবধি) আন্দামানে যায়ই, তাগো লেইগা জান দিয়া দিমু। পাকিস্তান থিকা আইয়া শিয়ালদায়, রিলিফ কেম্পগুলানে কীভাবে যে হেরা নরকবাস করতে আছে, নিজের চোখে তো দেখছি। ভিটামাটি ফালাইয়া অন্য দ্যাশে উদ্বাস্তু অইয়া আহনের কী কষ্ট হে আমি জানি। একটু থেমে বলে, এই মানুষগুলার লেইগা কিছু একটা করন লাগবই। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বিদায় নেয় নিরঞ্জন। আন্দামানবাসী, স্বপ্নদ্রষ্টা, উদ্বাস্তু যুবকটি। বিনয়ের মনে গভীর ছাপ রেখে যায়।
.
৭২.
বঙ্গোপসাগরের অজানা দ্বীপপুঞ্জ থেকে চকিতের জন্য এসে নিরঞ্জন চক্রবর্তী নামে যুবকটি বিনয়কে। নাড়া দিয়ে গিয়েছিল। তারপর দেখতে দেখতে আট নটা মাস ঝড়ের গতিতে যেন উড়ে গেল। এই সময়টায় পৃথিবীর এই অংশে বা বিনয়ের জীবনের আহ্নিক গতিতে তেমন কোনও হেরফের ঘটেনি। একই নিয়মে তা কেটে যাচ্ছিল।
এই কটা মাস পাকিস্তান ছিল অনেকটাই শান্ত। এপার বাংলায় ভিটেমাটি খোয়ানো মানুষের ঢল অনেকটাই থেমে গেছে। তবে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ আগেই এসে পড়েছে তাদের পুনর্বাসন নিয়ে মিটিং মিছিল উত্তেজনা চলছিলই। ছিল প্রচণ্ড হইচই, অস্থিরতা। আগের মতোই বিনয়কে এ-সবের পেছনে সারাদিনের অনেকটা সময় ছুটে বেড়াতে হয়। তাছাড়া ঝুমা আছে, হেমনলিনী শিশির স্মৃতিরেখারা আছেন। ঝুমাকে সপ্তাহে দু-তিন দিন না দেখলে এখন ভাল লাগে না। মন উতলা হয়ে ওঠে। তার সঙ্গ যত নিবিড় হচ্ছে, স্মৃতির অ্যালবামে সাজানো ঝিনুকের ছবির ওপর ততই ধূসরতার পোঁচ আরও গাঢ় হয়ে পড়ছে। উদ্বাস্তুদের ঘিরে একদিকে কঠোর নির্মম বাস্তব, অন্যদিকে ঝুমাকে নিয়ে উতরোল স্বপ্নের ঘোর। দুইয়ের মাঝখানে দিনগুলো তার নিজস্ব নিয়মে কেটে যাচ্ছিল।
