জটলার কাছাকাছি যেতেই প্রসাদের চোখ এসে পড়ল বিনয়ের ওপর। যুবকটিকে দেখিয়ে গভীর আগ্রহের সুরে তিনি বললেন, ভালই হল, তুমি এসে গেছ। এর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। ও আন্দামানে থাকে। সরকারি কাজে মেনল্যাণ্ডে এসেছে।
পরিচয়-পর্ব শুরু হল। যুবকটির নাম নিরঞ্জন চক্রবর্তী। বিনয়ের মতো সেও একজন শরণার্থী। দেশভাগের ঠিক পরে পরেই সর্বস্ব হারিয়ে হাজার হাজার উদ্বাস্তুর সঙ্গে সীমান্তের এপারে চলে এসেছিল। পরিবারে সবসুদ্ধ পাঁচজন মানুষ। নিরঞ্জন, তার মা, বাবা এবং দুটো ছোট ঘোট ভাইবোন।
তারা ত্রাণশিবিরে ওঠেনি। শিয়ালদা স্টেশনেও ঘাড় গুঁজে পড়ে থাকতে হয়নি। ওদের প্রচুর আত্মীয়পরিজন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অনেক আগে থেকেই কলকাতায় পাকাপাকিভাবে চলে এসেছিল। তারা ভালমানুষ। খুবই সহৃদয়। চরম বিপদের দিনে নিরঞ্জনদের পাশে দাঁড়িয়েছে। পালা করে একমাস দুমাস করে এর বাড়ি ওর বাড়ি থেকেছে নিরঞ্জনরা। এইভাবে বছর খানেক কেটে গিয়েছিল।
কিন্তু অন্যের আশ্রয়ে দিনের পর দিন কাটানো খুব একটা সম্মানজনক ব্যাপার নয়। তাছাড়া আত্মীয়রা হৃদয়বান হলেও তারা কেউ অঢেল পয়সাওলা লোক নয়। সবাই মোটামুটি চাকরি বাকরি করে সংসার চালায়। কারও মাইনে একটু বেশি, কারও কম। এদের পক্ষে অনন্তকাল বাড়তি পাঁচটি মানুষের দায় নেওয়া সম্ভব নয়। সেটা যে নিরঞ্জনরা বুঝতে পারছিল না তা নয়। কিন্তু তখন তারা নেহাতই নিরুপায়।
দেশে থাকতে থাকতেই বি এসসিটা পাশই করেছিল নিরঞ্জন। কলকাতায় এসে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেনি সে। কাজকর্মের আশায় নানা জায়গায় ছোটাছুটি করেছে। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে কত লোককে যে ধরাধরি করেছে তার লেখাজোখা নেই। বিভিন্ন অফিসের বড়বাবু, মেজবাবু, সেজবাবু থেকে রাজনৈতিক নেতা–কেউ বাদ যায়নি।
এমনকি খবরের কাগজগুলোতেও ঘোরাঘুরি করেছে নিরঞ্জন, যদি কিছু জুটে যায়।
নতুন ভারত-এ আসার আগে অন্য একটা কাগজের চিফ রিপোর্টার ছিলেন প্রসাদ। দৈনিক যুগবার্তা। সেখানেও কাজের খোঁজে নিরঞ্জন গিয়েছিল, সেই সূত্রে প্রসাদের সঙ্গে আলাপ। যুগবার্তায় তার চাকরি হয়নি কিন্তু প্রসাদকে তার ভীষণ ভাল লেগেছিল। মাঝে মাঝেই তার কাছে যেত। ছেলেটার কিছু একটা রোজগারের ব্যবস্থা হোক, সেটা তো তিনি চাইতেনই, নানাভাবে তার জন্য চেষ্টাও করেছিলেন।
রিফিউজি কোটায় গভর্নমেন্ট তখন শরণার্থীদের জন্য চাকরি বাকরির ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে। হঠাৎ পি ডরু ডির একটা কাজ পেয়ে নিরঞ্জন আন্দামান চলে যায়। বাবা মা ভাই বোনেরা কলকাতায় এক আত্মীয়র বাড়িতে থেকে গিয়েছিল। পোর্ট ব্লেয়ারে সরকারি কোয়ার্টার পেয়ে এবার সে সবাইকে নিয়ে যাবার জন্য এসেছে।
আন্দামানে চলে গেলেও চিঠিপত্রে প্রসাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযযাগটা ছিল নিরঞ্জনের। প্রসাদ দৈনিক যুগবার্তা ছেড়ে নতুন ভারত-এ জয়েন করেছেন, এ খবরটা তার জানা। আন্দামানে ফিরে যাবার আগে আজ তাই এখানে দেখা করতে এসেছে।
অবাক বিস্ময়ে নিরঞ্জনের দিকে তাকিয়ে ছিল বিনয়। প্রায় পলকহীন। আন্দামান সম্পর্কে ছেলেবেলা থেকে চমকপ্রদ কত কাহিনিই না শুনে আসছ সে। বঙ্গোপসাগরের সুদুর এই দ্বীপমালায় আঠারো শ সাতান্নর পর সিপাহী বিদ্রোহের বীর সেনানীদের পাঠানো হল। তার পরে পরেই জাহাজ বোঝাই করে ফি বছর ভারতের মেনল্যাণ্ড এবং বর্মা থেকে দুর্ধর্ষ সব অপরাধীদের সারা জীবনের সাজা খাটার জন্য চালান দেওয়া হতে লাগল। আরও পরে বিশ শতকের গোড়ায় ঝাঁকে ঝাকে স্বাধীনতা-সংগ্রামীদেরও। একদিকে খুনী দস্যু এবং মুক্তিযোদ্ধার দল। আর এক দিকে এখানকার অগুনতি ছোট বড় দ্বীপ জুড়ে দুর্ভেদ্য অরণ্যে আদিম সব মানুষ–ওঙ্গে, জায়োয়া, গ্রেট আন্দামানিজ, সেন্টিনালিজ ইত্যাদি। কালো কালো, খর্বকায় নিগ্রো গোত্রের মানবগোষ্ঠী।
আন্দামান মানেই রোমাঞ্চ, রহস্য, এক ধরনের ত্রাসও। পূর্ব পাকিস্তানের এক উদ্বাস্তু যুবক বঙ্গোপসাগর–যার আর-এক নাম কালাপানি-পাড়ি দিয়ে শুধু বেঁচে থাকার জন্য সেখানে চলে গেছে, ভাবতে শিহরন বোধ করে বিনয়। নিরঞ্জন একাই নয়, তাদের পুরো পরিবারটাই আন্দামানে চলে যাবে। কোথায় পূর্ব বাংলার অখ্যাত এক গ্রাম, আর কোথায় বঙ্গোপসাগরের দ্বীপপুঞ্জ! দেশভাগ না হলে জন্মভূমি থেকে উৎখাত হয়ে কোনওদিন কি তাদের সেখানে যাওয়া হতো!
প্রসাদ সবার সঙ্গে নিরঞ্জনের আলাপ করিয়ে দিতে লাগলেন। একসময় বিনয়ের পালা এল। তার নামটাম জানিয়ে বললেন, বিনয়ের দেশও তোমাদের ঢাকা ডিস্ট্রিক্টে। মাত্র কমাস হল ইন্ডিয়ায় এসেছে।
নিরঞ্জন ভীষণ হাসিখুশি, ছটফটে, আমুদে। তার চোখমুখ আলো হয়ে ওঠে। হইচই বাধিয়ে বলে, আপনেও ঢাকাইয়া!
বিনয় ঘাড় কাত করে, হ্যাঁ
বিপুল উৎসাহে নিরঞ্জন বলে, আরে আমাগো দ্যাশের মানুষ। বাড়ি আছিল কুনখানে? ঢাকার শহরে, না গেরামের দিকে?
ছোট একটা টাউনে। নাম রাজদিয়া।
হে তো বিক্রমপুরে।
হা।
আমরাও বিক্রমপুইরা। আমাগো গেরাম আউশসইতে (আউটশাহী)। রাইজদা থিকা বেশি ফারাকে না। বড় জোর দশ বারো মাইল। হেইখানে গ্যাছেন কুনোদিন?
গেছি দু-তিন বার।
আমরা চক্রবর্তীরা আউশসইয়ের নাম-করা বংশ। ম্যালা প্রপাটি আছিল। দ্যাশভাগের লগে লগে রাজাকারেরা বাড়িতে আগুন ধরাইয়া দিল। জমিজমা দখল কইরা নিল। দ্যাশে থাকলে হোল ফ্যামিলি খুন হইয়া যাইতাম।
