দ্বারিক দত্ত বিমর্ষ মুখে বললেন, নিজের স্ত্রী, বোনের কথা ভাবে না। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা নেই। হেমদাদা যে কী ধরনের মানুষ, বুঝি না।
নিত্য দাস জোরে জোরে মাথা নাড়ে।–আর কুনো আশা ভরসা নাই। হগল শ্যাষ। বিনয়ের দিকে ফিরে বলে, আমারে অন্য একহানে যাইতে অইব। আইজ যাই। হ্যামকত্তারে পত্র দিবেন তো?
বিনয় বলল, হ্যাঁ।
লেইখা রাইখেন। দুই চাইর দিন পর আপনের ম্যাস থিকা লইয়া যামু
নিত্য দাস চলে গেল। হেমনাথের চিঠিটা পড়ার পর থেকে বিনয়ের কিছুই ভাল লাগল না। ভেতরে ভেতরে উতলা ভাবটা বেড়েই চলেছে। সে এখন নিশ্চিত, হেমনাথের সঙ্গে এ-জীবনে আর দেখা হবে না। পাকিস্তানে তার, শিবানীর এবং স্নেহলতার বাকি দিনগুলো কীভাবে কাটবে, কে জানে।
বিনয়ও উঠে পড়েছিল কিন্তু সুধারা কিছুতেই তাকে ছাড়ল না।
এতদিন পর এলি। এক্ষুনি চলে যাবি মানে? বিনয়ের দুই হাত আঁকড়ে ধরে জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাতে থাকে সুধা। তার দুচোখ জলে ভরে গেছে। চিরকালের জেদী, অভিমানী তার এই ছোটদিটি যখন ঠিক করেছে যেতে দেবে না তখন বিনয়ের সাধ্য কী চলে যায়।
তবু বিনয় ভারী গলায় বলে, দাদুর জন্যে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। আমি বরং আর-এক দিন আসব।
সুধা বলল, আর-একদিনের কথা আর-এক দিন। মন আমাদেরও ভাল নেই। কিন্তু দুপুরবেলা না খাইয়ে তোকে কিছুতেই ছাড়ব না। হিরণ এবং দ্বারিক দত্তও তার কথায় সায় দিলেন।
৭১-৭৫. হেমনলিনীদের বাড়ি
৭১.
সময় কেটে যাচ্ছে।
সেই যে বিনয় হেমনলিনীদের বাড়ি গিয়েছিল, তারপর থেকে মাঝে মাঝেই সেখানে যেতে লাগল। ছুটির দিনের সকালে ঘুম ভাঙলেই নিজের ভেতর থেকে কেউ যেন তাড়া দিয়ে দিয়ে তাকে বিছানা থেকে তুলে বাথরুমে পাঠায়। তারপর জামাকাপড় পালটে প্রসাদের ঘরে যাওয়া, রুটিতে মাখন লাগানো, চা-জলখাবার খাওয়া, ইত্যাদি সেরে একসময় বড় রাস্তায় গিয়ে ট্রাম বা বাসে উঠে পড়ে।
হেমনলিনীদের বাড়ি পৌঁছলে স্মৃতিরেখা বা শিশিরের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সে যে যাবে সেটা ওঁরা জানেন। কী কারণে শিশিররা হেমনলিনীদের বাড়িতে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন, বিনয়েরও তা। অজানা নেই। প্রথম দিকে একটা মাস রুমাও এখানে চলে আসত। মাসখানেক কলকাতায় কাটিয়ে সে পাটনায় চলে গেছে। তবে যার জন্য যাওয়া, অনিবার্যভাবেই সে থাকে-ঝুমা।
সেই যুদ্ধের আমলে রাজদিয়ায় থাকতে স্কুল পালিয়ে প্রায়ই ঝুমাদের বাড়ি চলে যেত বিনয়। অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে। সেই ঘোরটা নিজের ভেতর কোথায় যেন লুকানো ছিল। সেটাই তাকে টানতে টানতে এখন উত্তর কলকাতায় নিয়ে আসছে।
ফি রবিবারই বিনয় যে হেমনলিনীদের বাড়ি আসে তা কিন্তু নয়, কখনও কখনও টালিগঞ্জে সুধাদের কাছেও চলে যায়। কী কারণে উত্তর কলকাতায় তার ছোটাছুটি সে খবরটা ওরাও পেয়ে গেছে। সুধারা খুশি। সুনীতিরা খুশি। সব্বাই খুশি। নিরুদ্দেশ একটি মেয়ের জন্য বাকি জীবনটা বিনয় ছন্নছাড়া, উদ্ভ্রান্তের মতো মেসে কাটিয়ে দেবে তা হয় না। তার মন যে কুমার দিকে ফিরেছে, সেটা সুলক্ষণ। তাড়াহুড়োর দরকার নেই। এতটুকু দ্বিধাও যদি গোপনে বিনয়ের মনে থেকে থাকে সেটা সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য সময় দিতে হবে। ঝুমা বি এ পাস করুক। তারপর জাগতিক নিয়মে যা ঘটার ঘটবে।
এটা একটা দিক। অন্য দিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তুদের আসা বেশ কিছুটা কমে গেছে। সেখানে শান্তি ফিরে আসতে শুরু করেছে। আসাম থেকেও নতুন করে উৎখাত হয়ে পাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষরা পশ্চিম বাংলায় আসছে না। দম-আটকানো, টান টান পরিস্থিতি কিছুটা হলেও সহজ হয়ে আসছে। পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি মানে পশ্চিমবঙ্গের স্বস্তি।
আগে হেমনাথের চিঠি কবে আসবে, সেজন্য তীব্র উৎকণ্ঠায় থাকতে হতো। কিছুদিন হল, দু-তিন সপ্তাহ পর পর নিত্য দাস তার চিঠিপত্র নিয়মিত পৌঁছে দিচ্ছে। প্রতিটি চিঠির প্রায় একই বয়ান। রাজদিয়া অঞ্চলই নয়, সারা পূর্ব পাকিস্তানে আপাতত তেমন কোনও উত্তেজনা নেই। আগুন, ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, রাজাকারদের হুমকি-প্রায় বন্ধ হয়েছে। যে পশ্চিমা মুসলমানেরা ভারত থেকে ওখানে গিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল, হিন্দুদের সম্পত্তি গায়ের জোরে দখল করে নিচ্ছিল, তারাও এখন চুপচাপ। প্রাণ বাঁচাতে সর্বস্ব ফেলে স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের হাত ধরে সীমান্তের দিকে যারা পা বাড়াতে যাচ্ছিল তারা এই মুহূর্তে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছে। ওরা আর একটু দেখতে চায়।
হেমনাথ আরও জানিয়েছেন, তারা এখন দুশ্চিন্তামুক্ত। কিছুদিন আগেও ত্রাসে, আতঙ্কে, অসীম উদ্বেগে স্থির করেছিলেন, ভারতে চলে আসবেন। চিরকালের মতো। নিরাপত্তার দিক থেকে এই মুহূর্তে কোনওরকম সমস্যা নেই। বিনয়রা তাদের জন্য যেন চিন্তা না করে।
পূর্ব পাকিস্তান স্বাভাবিক হয়ে এলেও, নতুন করে উদ্বাস্তুদের ঢল না নামলেও, আগে থেকেই লক্ষ লক্ষ মানুষ উৎখাত হয়ে চলে এসেছে। তাদের হাজার সমস্যা। কাজেই ছুটির দিনটা বাদ দিলে পুরানো রুটিনটা একই রকম থেকে গেছে বিনয়ের। আজ ত্রাণশিবির তো কাল জবরদখল কলোনি। যেখানে উদ্বাস্তু সেখানেই বিনয়।
.
আজ সন্ধের একটু পরে পরে অফিসে এসে বেশ অবাকই হয়ে গেল বিনয়। রিপোটিং সেকশন রীতিমতো সরগরম। প্রসাদের সামনে বসে আছে একটি পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের অচেনা যুবক। রির্পোটাররা তো বটেই, সাব-এডিটরদেরও কেউ কেউ এসে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। বৃত্তাকারে। যুবকটি দুই হাত এবং মাথা ঝাঁকিয়ে উঁচু গলায় কিছু বলে চলেছে। তার চোখে মুখে কণ্ঠস্বরে প্রবল উত্তেজনা। যারা ভিড় করে ছিল তারা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে তাকে উসকে উসকে দিচ্ছে। ফলে তার গলা আরও চড়ছে।
