নিয়মিত পত্র লিখিবা। তোমরা আমাদের স্নেহ ও আশীর্বাদ লইও।
ইতি, দাদু
নিঃশব্দে চিঠিটা পড়ে ফেলে বিনয়। একরকম রুদ্ধশ্বাসে। তারপর মুখ তুলে তাকায়।
ঘরের বাকি সবাই উদগ্রীব বিনয়কে লক্ষ করছিল। চারপাশ থেকে একই প্রশ্ন শোনা যায়–কী লিখেছেন হেমনাথ?
উত্তর না দিয়ে হেমনাথের চিঠিটা দ্বারিক দত্তকে দেয় বিনয়। তার পড়া হলে সেটা যায় সুধার হাতে। এইভাবে চিঠির বয়ানটা সকলেরই জানা হয়ে যায়।
কিছুক্ষণের জন্য ঘরের মধ্যে স্তব্ধতা নেমে আসে।
তারপর গম্ভীর হতাশার সুরে নিত্য দাস বলে ওঠে, পেরথম যহন শাজাহান সাহেবের সোম্পত্তির খরব দিছিলাম, হ্যামকায় যদিন রাজি অইতেন পায়ের উপর পাও (পা) তুইলা ইণ্ডিয়ায় বাকি জনম। কাটাইয়া দিতে পারতেন। নাতি নাতিন নাতিন-জামাই-আত্মজনেরা কাছে থাকত। কত আনন্দ, কত শান্তি। কিন্তুক নিজেই ইণ্ডিয়ায় আহনের হগল পথ বন্ধ কইরা দিলেন।
একই আক্ষেপ দ্বারিক দত্তেরও। তিনি বললেন, হেমদাদা এত বড় পণ্ডিত মানুষ, কিন্তু দুরদৃষ্টি নেই। মানুষকে সহজেই বিশ্বাস করে বসে। যেই চারপাশের হিন্দুরা এসে ধরে পড়ল, তার ভরসায় ওরা দেশে থেকে গেছে, অমনি গলে গেল। আরে বাবা, এই হিন্দুরা যেই মুহূর্তে সুযোগ পাবে, ইন্ডিয়ায় পালিয়ে আসবে। হেমদাদাকে জানাবেও না।
নিত্য দাস বলল, মুসলমানগো কথাও কনি। অহন না হয় ভালা মাইষি (মানুষ) কইরা পরি (পাহারা) দিয়া রাখতে আছে। এইটা কি বছরের পর বছর সম্ভব? হেরা যে চিরটা কাল একই রকম থাকব, জোর কইরা কি হেই কথা কওন যায়? পাকিস্থানের যা হাল, মতিগতি বদলাইয়া যাইতে কতক্ষণ? অর্থাৎ এখন যারা আবেগের বশে হেমনাথের পাশে দাঁড়িয়েছে তারা আমৃত্যু তাকে আগলে আগলে রাখবে, এমন আস্থা নিত্যর নেই। পাকিস্তানের আবহাওয়া যেভাবে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে তাতে কোনও মানুষের ওপরেই অনন্তকাল ভরসা রাখা যায় না।
নিত্য দাস বলতে লাগল, দ্যাশহান দুই টুকরা হওনের আগে মজিদ মিঞা কত ভালা আছিল। এই কয় বছরে হ্যায় (সে) কি আর আগের মানুষ আছে? রাতারাতি বদলাইয়া গ্যাছে। পাকিস্থানে মজিদ মিঞার লাখান মানুষ অহন লাখে লাখে।
মুখ ফিরিয়ে নিত্যর দিকে তাকায় বিনয়। মজিদ মিঞার নামটা বহুকাল বাদে শুনল সে। সঙ্গে সঙ্গে গোপন এক কুঠুরি থেকে পুরানো কষ্ট বেরিয়ে এসে বুকের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই মহাযুদ্ধের গোড়ার দিকে, চল্লিশ সালে, যখন তারা রাজদিয়ায় যায়, এই লোকটা তাদের দেখার জন্য রাত্তিরে নৌকোয় দশ মাইল নদী খাল বিল পাড়ি দিয়ে সুদূর কেতুগঞ্জ থেকে চলে এসেছিল। সঙ্গে করে এনেছিল কয়েক হাঁড়ি মিষ্টি, মস্ত একটা রুই মাছ। কী আন্তরিকতা তার। বিনয়দের দেখে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গিয়েছিল। রাজদিয়ায় তাদের ধরে রাখার জন্য কত যে ব্যাকুলতা! নিজের। তেফসলা উৎকৃষ্ট জমি থেকে তিরিশ কানি অবনীমোহনকে লিখে দিতে চেয়েছিল। বিনা মূল্যে। অবনীমোহন অবশ্য রাজি হননি। এই নিয়ে মজিদ মিঞার কত অভিমান। কত ক্ষোভ। শেষ পর্যন্ত অনেক টানা হ্যাঁচড়ার পর ন্যায্য দামের অর্ধেকের বেশি তাকে নেওয়ানো যায়নি। দু-চারদিন পর পরই এটা সেটা নিয়ে হাজির হতো। কতবার যে তাদের কেতুগঞ্জের বাড়িতে বিনয়দের দাওয়াত খাইয়েছে তার লেখাজোখা নেই। হেমনাথের পরামর্শ ছাড়া একটা পাও ফেলত না। মেয়ের শাদির কথা পাকা হবে। নৌকো পাঠিয়ে হেমনাথকে নিয়ে গেল কেতুগঞ্জে। জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ঝগড়াঝাটি? কে মেটাবেন? হেমনাথ ছাড়া আবার কে। বিষয় আশয় নিয়ে মামলা বেধেছে। সেখানেও হেমনাথ। এই মানুষটি তার কাছে সব চেয়ে শ্রদ্ধেয়। সব চেয়ে আস্থাভাজন। নিজের আত্মীয় পরিজনের চাইতেও অনেক বেশি প্রিয়, অনেক বেশি বিশ্বাসের পাত্র। ছেচল্লিশে বড় রায়টের পর মজিদ মিঞা আর আগের মজিদ মিঞা রইল না। মুসলিম লিগে নাম লেখালো। দেশভাগের পর থেকে হেমনাথের ধারে কাছে ঘেঁষত না। ইন্ডিয়ায় চলে আসার আগে বিনয় শুনেছিল কেতুগঞ্জের এবং তার চারপাশের গ্রামগঞ্জগুলো থেকে যারা আতঙ্কে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে ইন্ডিয়ায় পালিয়ে গেছে তার পেছনে ছিল এই মজিদ মিঞা। তার মতো মানুষই যদি বদলে যেতে পারে, এখনও যারা ভাল আছে তাদের পালটে যেতে কি খুব বেশিদিন লাগবে?
হেমনাথের জন্য যে প্রবল উৎকণ্ঠা হচ্ছিল তার চাপ নিতে পারছে না বিনয়। মনে হচ্ছে তার স্নায়ুগুলো ছিঁড়ে পড়বে।
এদিকে হিরণ বলছিল, আমি একটা অন্য কথা ভাবছিলাম
দ্বারিক দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, কী কথা রে?
হেমদাদু আর দুই দিদার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে। যতদিন তিনি বেঁচে আছেন, দিদাদের দুশ্চিন্তা নেই। কিন্তু মানুষের আয়ুর কথা তো বলা যায় না। হঠাৎ যদি দাদুর মৃত্যু হয়, কী হবে দিদাদের? কে দেখবে তাদের? তার ওপর এত প্রপার্টি। দুই বৃদ্ধা কি সে-সব সামলাতে পারবেন?
এই বিষয়টা আগেও যে বিনয় ভাবে নি তা নয়। মৃত্যু এক অনিবার্য ঘটনা। অমোঘ এবং অবশ্যম্ভাবী। কেউ তা ঠেকাতে পারে না। কখন, কীভাবে মৃত্যু আসবে কারও পক্ষেই তার হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। হেমনাথ যদি আগে মারা যান, দেশের বাড়িতে স্বজনহীন দুই অসহায় বৃদ্ধা একেবারে অথৈ সমুদ্রে গিয়ে পড়বেন। শিবানী ও স্নেহলতার মুখ চোখের সামনে ফুটে ওঠে বিনয়ের। প্রচণ্ড ত্রাসে গলা শুকিয়ে আসতে থাকে তার। এতদূরে অন্য একটা রাষ্ট্রে থেকে সে কী-ই বা করতে পারে!
