তোমার জবাবী পত্র পাইয়া জানিতে পারিয়াছি, তুমি, দ্বারিক, হিরণ, সুধা, সুনীতি, আনন্দ-সকলে আমাদের জন্য কী গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাইতেছ।
তুমি লিখিয়াছ, নানা জায়গায় অনেক দৌড়াদৌড়ি করিয়াও সম্পত্তি বিনিময়ের বন্দোবস্ত করিয়া উঠিতে পার নাই। তবে যুগলদের জবরদখল কলোনিতে প্রচুর জমি পাওয়া যাইবে–এইরূপ ভরসা মিলিয়াছে।
বর্তমানে জানাই, পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তন ঘটিয়াছে। করিম বিশ্বাসী মানুষ। প্রাণ গেলেও সে নিমকহারামি করিবে না। সে ছাড়া মোতাহাররা তো আছেই। তাহাদের, বিশেষ করিয়া করিমের উপর বাড়িঘরের দায়িত্ব দিয়া গোপনে দেশ ত্যাগ করিব এই ছিল অভিপ্রায়, কিন্তু খবরটি কীভাবে কীভাবে যেন চতুর্দিকে রটিয়া গিয়াছে। তাহার ফল কী হইয়াছে, অনুমান করিতে পার?
রাজদিয়া তো বটেই, আশেপাশের দেলভোগ, গিরিগঞ্জ, আবদুলাপুর, কমলাপুর, সুজনগঞ্জ ইত্যাদি গ্রামের যে-সব হিন্দু পূর্বপুরুষের ভিটামাটি আঁকড়াইয়া পড়িয়া আছে, তাহারা দলে দলে আসিয়া হাজির হইতেছে। ইহারা আমায় দেশ ছাড়ার কথা ভাবিতেই পারে না। সকলেই বলিল, আমি ভারতে চলিয়া গেলে তাহারা কাহার মুখ চাহিয়া পাকিস্তানে থাকিবে?
আমার নামটি হিন্দু নাম বলিয়া আমি পরবাসী। এ-দেশে আমার কোনও মর্যাদা নাই, একটা আঙুল তুলিবার মতো সামান্য ক্ষমতাও হারাইয়াছি। ওই হিন্দুরা বিপদে পড়িলে কোনওভাবেই তাহাদের রক্ষা করিতে পারিব না। তবু আমার উপর ইহাদের বিরাট ভরসা। দেশভাগের পর কিছুই যে আগের মতো নাই, হাজার বুঝাইলেও তাহারা বুঝিতে চায় না। আমার সম্বন্ধে অনন্ত আস্থা তাহাদের মধ্যে অনড় হইয়া আছে।
এই তো গেল সন্ত্রস্ত হিন্দুদের কথা। রাজদিয়া এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের শতকরা সত্তর আশি ভাগ মুসলমানও চায় না, আমি চিরকালের মতো ইণ্ডিয়ায় চলিয়া যাই। নিজের সম্বন্ধে লিখিতে লজ্জা হয়, তবু যাহা ঘটনা তাহা না জানাইয়া পারিতেছি না। রাজদিয়া কলেজের প্রিন্সিপ্যাল আনোয়ার আলি বলিয়াছে, আমার মতো মানুষ যদি দেশ ছাড়ে তাহা এই অঞ্চলের পক্ষে অত্যন্ত লজ্জাকর দৃষ্টান্ত। মোতাহার হোসেন কিছুদিন আগে আমার নিরাপত্তার জন্য প্রায়ই আসিয়া আমাদের বাড়িতে রাত কাটাইত। এখন স্থায়ীভাবে বাহিরের ঘরে থাকিতেছে। করিম তত তাহার পরিবার লইয়া এখানেই। আছে। আমাদের জমিতে চাষ করে, এমন আরও চারটি অল্পবয়সী মুসলমান কৃষাণও স্বেচ্ছায় স্ত্রী-পুত্র লইয়া করিমের ঘরের পাশে পর পর ঘর তুলিয়া বাস করিতেছে। ইহার অর্থ কোনও প্রকার হামলা হইলে তাহারা আমাদের রক্ষা করিবে।
রাজদিয়ার নাম-করা উকিল খলিল সাহেব, কলেজের তরুণ অধ্যাপকেরা, সৈয়দ এবং মীর বাড়ির ছেলেরা রোজই কেহ না কেহ আমাদের খবর লইয়া যাইতেছে।
তোমরা শুনিলে অবাক হইবে, উকিল খলিল সাহেব মুসলমান যুবকদের জুটাইয়া দিনকয়েক আগে একটি মিছিল বাহির করিয়া ইণ্ডিয়া হইতে আগত পশ্চিমা মুসলমানদের তো বটেই, যে বাঙালি মুসলমানরা আমাদের উৎখাত করিয়া জমিজমা গ্রাস করিতে চায় তাহাদেরও সতর্ক করিয়া দিয়াছেন, আমাকে শাসাইলে বা কোনও রকম ক্ষতির চেষ্টা করিলে তাহার পরিণাম ভাল হইবে না। এই লইয়া প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং দুই পক্ষে মারপিটও হইয়াছে। তবে ইহার একটি সুফল পাওয়া গিয়াছে। বর্তমানে কেহ আমাকে হুমকি দিতেছে না।
তোমাকে পূর্বের একটি পত্রে জানাইয়াছিলাম, বহু সহৃদয় মুসলমান আমার পাশে আছে। কিন্তু তাহাদের সংখ্যা যে এমন বিশাল তাহা কল্পনা করিতে পারি নাই। পাকিস্তানের পরিবেশ যারপরনাই বিষাক্ত হইয়া উঠিয়াছে কিন্তু এই মানুষগুলিকে তাহা স্পর্শ করিতে পারে নাই।
আমার মনে একটাই দুঃখ বা ক্ষোভ জমিয়া আছে। তোমাকে জানাইয়াছি কি না মনে নাই। যদি জানাইয়াও থাকি তবু আর-একবার মনে করাইয়া দিতেছি। জিন্না সাহেব তাহার জীবিতকালে বারংবার বলিয়াছিলেন, জাতিধর্ম নির্বিশেষে পাকিস্তানের প্রতিটি নাগরিকের থাকিবে সমানাধিকার। ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক জীবনের কোনও ক্ষেত্রেই কাহারও সঙ্গে কাহারও বৈষম্য থাকিবে না।
বিনু, তুমি জানো, পাকিস্তানকে আমি স্বদেশ বলিয়া মানিয়া লইয়াছিলাম। আর দশজনের মতো আমিও এই রাষ্ট্রের একজন নাগরিক। এখানকার আইন কানুন মাথা পাতিয়া লইয়াছি। দেশের সুস্থিতি বিপন্ন হয়, এমন কিছু কল্পনাও করিতে পারি না। সংখ্যায় অল্প হইলেও আমাদের অঞ্চলের মানুষজনের একটি অংশের কাছে আমরা অবাঞ্ছিত। নিজের মাতৃভূমিতে অন্যের পাহারায় আমাদের বাঁচিয়া থাকিতে হইবে, স্বাধীনতার আগে ইহা কী কখনও ভাবিতে পারিয়াছি?
যাহা হউক, এখানকার পরিস্থিতি বিশদভাবে জানাইলাম। এই অবস্থায় দেশ ছাড়িয়া যাওয়া আর সম্ভব হইবে না। আয়ুর শেষ প্রান্তে পৌঁছাইয়া গিয়াছি। আর কতদিনই বা বাঁচিব? পাঁচ, দশ কি পনেরো বৎসর। দেশের মাটিতেই মৃত্যু ঘটুক। ইহাই আমাদের ভবিতব্য।
বিনু, তোমরা আমাদের জন্য চিন্তা করিও না। বিষয়আশয় এক্সচেঞ্জের জন্য ছুটাছুটি করারও দরকার নাই। যুগলকে জানাইয়া দিও, কলোনিতেও আমাদের জন্য যে জমি রাখিয়া দিয়াছে তাহা যেন অন্য উদ্বাস্তুদের ভাগ করিয়া দেয়।
যতদিন না দুই দেশের মধ্যে ডাক চলাচল স্বাভাবিক হইতেছে, নিত্য দাসের উপর নির্ভর করিয়া থাকিতে হইবে। তাহার লোকটি তোমাদের পত্রাদি আমাদের পৌঁছাইয়া দিবে। এবং আমার উত্তর সীমান্তের ওপারে দিয়া আসিবে। ইহা ছাড়া যোগাযোগের অন্য কোনও উপায় আপাতত নাই।
