এত যে প্রচণ্ড ব্যস্ততা তার ভেতরেও বিনয়ের মাথায় একটা ভাবনা চলছেই। অর্থাৎ হেমনাথ। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যত দুর্বিপাকই ঘটুক, দেশ ছাড়বেন না। কিন্তু তাঁর শেষ চিঠিটা পড়ে মনে হয়েছে সমস্ত আত্মবিশ্বাস ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। পাকিস্তানের হাল দিনকে দিন এতটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে, তাতে তার মতো মানুষের পক্ষেও পৃথিবীর ওই ভূখণ্ডটি আর নিরাপদ নয়। এক মুহূর্তও তিনি আর রাজদিয়ায় থাকতে চান না।
হেমনাথ লিখেছিলেন, বিনয়রা যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার এবং অবনীমোহনের দেশের বাড়িঘর জমিজমা এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থা করে রাখে। কিন্তু সেদিক থেকে সম্পূর্ণ হতাশ হতে হয়েছে বিনয়কে।
শাজাহান সাহেবের বিষয় আশয়ের সঙ্গে হেমনাথের জমিজমা বাড়িঘর এক্সচেঞ্জ করা সম্ভব হবে না। তবে অন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ-সব জানিয়ে হেমনাথকে চিঠি লিখেছিল বিনয়রা। কিন্তু তার জবাব এখনও আসেনি। হেমনাথ কবে ইন্ডিয়ায় আসবেন, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
নিত্য দাস কথা দিয়েছিল, সাদিনের ভেতর হেমনাথের উত্তর এনে দেবে। সাতদিনের পর আরও কদিন কেটে গেছে। কিন্তু না, হেমনাথের উত্তর তো আসেইনি, নিত্য দাসেরও পাত্তা নেই। লোকটা একেবারে উধাও হয়ে গেছে।
.
আজ সকালে ঘুম ভাঙার পর হেমনাথের জন্য মনটা ভীষণ উতলা হয়ে উঠেছে বিনয়ের। সে অন্যদিনের মতো চান টান করল না। মুখটুখ ধুয়ে প্রসাদের কাছ থেকে আজকের দিনটার জন্য ছুটি নিয়ে টালিগঞ্জের দিকে বেরিয়ে পড়ল। উদ্দেশ্য, হিরণকে সঙ্গে করে কসবায় নিত্য দাসের বাড়ি চলে যাবে। লোকটা কতদূর কী করল, জানা দরকার। এটা ঠিক, হেমনাথের কোনও খবর এলে নিত্য তক্ষুনি এসে হাজির হতো। কিন্তু মন এতই উৎকণ্ঠিত যে স্থির থাকতে পারছিল না বিনয়।
জাফর শা রোডে এসে ডাকাডাকি করতে উমা দরজা খুলে দিল। কয়েকদিন বাদে তাকে দেখে মেয়েটা খুব খুশি। একমুখ হেসে কী যেন বলে উঠল। কিন্তু কিছুই যেন শুনতে পেল না বিনয়। উমার পাশ দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে তর তর করে ওপরে উঠতে লাগল।
দোতলায় এসে বাইরের ঘরে চোখ পড়তেই বিস্ময়ে বিনয় হতবাক। যার কথা ভাবতে ভাবতে সে ছুটে এসেছে সেই নিত্য দাস কি না হিরণের সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে কথা বলছে।
বিনয়কে দেখে ওরাও কম অবাক হয়নি। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর হিরণ বলল, কী আশ্চর্য, তুমি এখন আসবে, ভাবতেই পারিনি। এসএস বিনয় ভেতরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসতে না বসতেই বলে, চা খেয়ে নিত্যবাবু আর আমি তোমার মেসেই যেতাম। ভালই হল, তুমি এসে গেছ-
বিনয় বলল, আমার ওখানে যাচ্ছিলেন?
হিরণ না, উত্তরটা দিল নিত্য দাস, হ ছুটোবাবু। পাকিস্থান থিকা হ্যামকার চিঠি আইছে।
নিত্য দাস বলতে লাগল, কথা দিয়াও রাখতে পারি নাই ছুটোবাবু। হেমনাথের চিঠি আনতে দেরি হওয়ার কৈফিয়ৎ দিতে লাগল সে। জয়নাল নামে তার লোকটি গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়েছিল। তার পড়শি মোতালেফ হাড়-বজ্জাত। জয়নালের মাত্র দুকানি জমি রয়েছে। তা থেকে কৌশলে কিছুটা আত্মসাৎ করার তালে ছিল। এই নিয়ে প্রচুর হাঙ্গামা হয়েছে। সে-সব সামলে রাজদিয়ায় যেতে তার দেরি হয়ে গেছে। সেই কারণে সাতদিনের ভেতর হেমনাথের চিঠি নিয়ে আসা সম্ভব হয় নি।
নিত্য দাস বলল, কাইল রাইতে চিঠিখান পাইছি। ভাবলাম, আইজ সকালে উইঠা টালিগুঞ্জে আইয়া ছুটো জামাইবাবুরে লগে কইরা আপনার ম্যাসে যামু। তা আপনে নিজেই আইয়া পড়লেন। মুখ কাচুমাচু করে বলে, ক্যান দেরি হইছে, হোনলেন। আমার কিন্তুক কুনো দুষ (দোষ) নাই
উমার কাছে খবর পেয়ে ছুটতে ছুটতে ভেতর দিক থেকে চলে এল সুধা। তাঁর সঙ্গে দ্বারিক দত্তও এসেছেন। বাইরের ঘরে পা দিয়ে হইচই বাধিয়ে দেয় সুধা। কী ছেলে রে তুই! সেই যে মেসে গেলি, তারপর দু-একবার মোটে মুখ দেখিয়ে গেছিস! কতদিন হল তোর কোনও পাত্তাই নেই। আমাদের কথা তোর বোধহয় মনেই পড়ে না আজকাল।
দ্বারিক দত্তও একই কথা বললেন।
কিছুই প্রায় কানে যাচ্ছিল না বিনয়ের। অফিসের কাজে মরার সময় নেই, তাই আসা সম্ভব হচ্ছিল না, ইত্যাদি জানিয়ে সে নিত্য দাসের দিকে তাকায়। –দাদুর চিঠিটা কোথায়?
হিরণ বলল, এই যে আমার কাছে ব্যস্তভাবে পকেট থেকে একটা মুখ-বন্ধ খাম বার করে বিনয়কে দেয় সে।
বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী লিখেছেন দাদু? পড়েছেন আপনারা?
না। তোমার নামে চিঠি। তাই
বিনয় এমনিতে খুবই শান্ত, নম্র। কিন্তু এই মুহূর্তে মেজাজটা তপ্ত হয়ে ওঠে। রুক্ষ গলায় বলে, আমার নামে লিখলেও এটা গোপন কোনও ব্যাপার নয়। আমরা সবাই মিলে পরামর্শ করে যে চিঠিটা লিখেছিলাম, তিনি তার জবাব দিয়েছেন। দাদু রাজদিয়ায় কী অবস্থায় আছেন, কলকাতায় কবে আসছেন, সে-সব জানবার ইচ্ছে হল না আপনাদের? আমি কখন চিঠি খুলব সে জন্যে বসে আছেন। আশ্চর্য!
হিরণের মুখটা নিমেষে পাংশু হয়ে যায়। সুধাও কিছু বলছে না। বাকি দুজনও চুপ। রাজদিয়ার একটি বৃদ্ধের জন্য বিনয় যে কতটা উৎকণ্ঠিত, সবাই তা টের পাচ্ছিল। খামের মুখ ছিঁড়ে এক নিঃশ্বাসে হেমনাথের চিঠিটা পড়ে যায় বিনয়।
কল্যাণীষেষু
বিনু, নিদারুণ সংকটে পড়িয়া এমনই বিচলিত হইয়া পড়িয়াছিলাম যে রাজদিয়ায় আর এক মুহূর্তও থাকিতে সাহস হইতেছিল না। প্রতিদিন ইরফান আলি এবং তাহার সাঙ্গোপাঙ্গদের শাসানি, দেশ ছাড়ার জন্য হুমকি, পদে পদে অসম্মান, এই অবস্থায় শ্বাস আটকাইয়া আসিতেছিল। তাই তোমাকে বিষয় সম্পত্তি এক্সচেঞ্জের কথা জানাইয়াছিলাম। সিদ্ধান্ত লইয়াছিলাম, চিরতরে জন্মভূমি ছাড়িয়া চলিয়া যাইব।
