যতই মেজাজ চড়িয়ে ছায়ার ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে চাক, নিশিবালা যে ডাহা মিথ্যে বলছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না বিনয়ের। কিন্তু মেয়েমানুষটা পুরোপুরি অস্বীকার করার পর তার কী করা উচিত, ভেবে পাচ্ছে না। কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়ে।
নিশিবালা কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই চারপাশের দঙ্গলটা থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে এসে বিনয়ের সামনে দাঁড়ায়। এই ধরনের মেয়েরা যেমনটা হয়-নোংরা ছলাকলায় বড়ই পটু-চোখ কুঁচকে, মুখে অশ্লীল হাসি ফুটিয়ে বলে, ছায়া লেই তো কী হয়েছে। পক্ষী আচে।
শিরদাঁড়ার ভেতরটা হিম হয়ে যায় বিনয়ের। হতভম্বের মতো সে বলে, পক্ষী!
হ্যাঁ গ। নিজের বুকে একটি আঙুল রেখে মেয়েটা বলে, এই যে আমি। আমার নাম ময়না। আরও কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে, আমারে দে চলবেনি?
কপালে গালে গলায় বিন বিন করে ঘাম ফুটে বেরুতে লাগল বিনয়ের। হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকে সে।
মেয়েটা চটুল গলায় এবার বলে, আমাকে দে না হলি আরও পক্ষী আচে গ বাবু কয়েকটা মেয়েকে দেখিয়ে বলতে লাগল, ও হল টিয়া, ও বুলবুলি, ও টুনটুনি। যারে মনে ধরে বেচে লিন (নিন)।
তার কথা শেষ হতে না-হতেই আর-একটা মেয়ে এগিয়ে এল। পক্ষী যদিন ভাল না লগে, ফুলও আচে। আমি টগর। ভিড়ের দিকে আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে বলতে লাগল, ওই মেয়েটা মালতী, ওই মেয়েটা চাপা
অন্য একটি মেয়ে বলল, আকাশের তারা আচে, বনের লতা আচে, জোনাকি আচে, ঝরনা আছে। আরও কতরকম আচে। যারে ইচ্ছে তুলে নে ঘরে দোর দিন।
ভিড়ের মধ্যে তিন-চারটি মেয়ে একসঙ্গে গলা মিলিয়ে চেঁচায়, এই দুকুর বেলায়!
আরও কটা মেয়ে কাঁচা রগরগে ভাষায় বলল, মিষেদের যকন চাগাড় দ্যায়–
নিশিবালা মিটি মিটি হাসতে হাসতে বিনয়কে লক্ষ করছিল। তার বিনয়ের আটকে আসছে। মাথার ভেতর যেন চাকা ঘুরে যাচ্ছে। ঘাড় ভেঙে সে বুঝি বা হুড়মুড় করে পড়ে যাবে।
নিশিবালা বেশ মজাই পাচ্ছিল। প্রশ্রয়ের সুরে মেয়েগুলোকে হালকা ধমক দিল, ছেনালি রাক দিকিন। বাবুটি দামড়া বাছুর। সবে চোক ফুটচে। আমাদের একেনে পা দিতে না-দিতেই তারে নে পড়লি! অমনটা করলে
বাকিটা আর শোনা হল না। লাফ দিয়ে উঠে পড়ল বিনয়। এক দৌড়ে চাতাল পেরিয়ে সোজা গলিতে চলে এল।
পেছন থেকে নিশিবালা চেঁচিয়ে ওঠে, অ বাবু, যাবেন নি–যাবেন নি– আমি পছন্দ করে একটা পরী আপনারে দিচ্চি
বিনয় যেভাবে পালিয়ে গেল, তাতে অন্য মেয়েগুলো ভীষণ মজা পায়। তুমুল হাসির কলরোল তুলে তারা হইহই করে ওঠে, কী ভীতু নোক রে বাবা! বুকের মদ্যি পুঁটি মাচের ধুকপুকুনি! সে কিনা মাগীপাড়ায় আসে!
ফিরেও তাকায় না বিনয়। গলি থেকে অন্ধের মতো ছুটতে ছুটতে চলে এল ট্রাম রাস্তায়। এতক্ষণ দম বন্ধ হয়ে ছিল তার। ফুটপাথের একধারে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে শ্বাস টেনে ধাতস্থ হতে বেশ খানিকটা সময় লাগে।
চোখের সামনে শহরের চেনা দৃশ্য। প্রচুর মানুষ। প্রচুর গাড়িঘোড়া। কেউ থেমে নেই। সবাই ব্যস্ত, সবাই ছুটছে।
বিনয় লক্ষ করল, বেলা হেলতে শুরু করেছে। হঠাৎ খেয়াল হল, ট্রেন লেট না করলে এতক্ষণে আসামের রিফিউজিদের চলে আসার কথা। সে আর দাঁড়াল না। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে শিয়ালদা রুটের একটা ট্রামে উঠে বসল।
চাকায় ধাতব আওয়াজ তুলে ট্রাম ছুটে চলেছে। জানালার বাইরে বিনয় তাকিয়ে আছে ঠিকই, তবে রাস্তার কোনও কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছে না। ছায়ার চিন্তাটা তার মাথায় হুল ফুটিয়ে চলেছে। মেয়েটাকে উদ্ধার করার জন্য আজ সে ছুটে এসেছিল কিন্তু নিশিবালা স্পষ্ট জানিয়ে দিল ওই নামে কেউ তাদের ওখানে থাকে না। অথচ কাল সন্ধেবেলায় বিনয় তাকে নিজের চোখে দেখে গেছে। এতটা ভুল তার হতেই পারে না। এই যুবা বয়সে তার দৃষ্টিশক্তি এত খারাপ হয়ে যায়নি। তবু একটা ধন্দ থেকেই যাচ্ছে। আজ সে এতটা সময় এখানে কাটিয়ে গেল, প্রতিটি মেয়ের মুখও লক্ষ করেছে কিন্তু ছায়াকে দেখা যায়নি। এমনও তো হতে পারে, মেয়েটা সেই মুহূর্তে ওখানে ছিল না, অন্য কোথাও গিয়ে থাকবে।
সে যাই হোক, ওই মেয়েপাড়ায় বিনয় আর যাচ্ছে না। একটা নিষ্পাপ তরুণীকে উদ্ধার করতে এসেছিল, নেহাতই কর্তব্যপালনের তাড়নায়। কিন্তু সেটা যে কত দুরূহ তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। ওখানকার নোংরা মেয়েমানুষগুলো তার পা থেকে মাথা অবধি পচা পাঁক মাখিয়ে দিয়েছে। সারা গা থেকে দুর্গন্ধ উঠে আসছে যেন।
বিনয় ঠিক করে ফেলল, হরিচরণকে ছায়ার কথা জানিয়ে দেবে। পারলে তিনিই মেয়েটাকে পাল থেকে বার করে নিয়ে আসতে পারবেন।
এসময় ট্রাম শিয়ালদায় পৌঁছে যায়।
.
৬৫.
আরও কদিন কেটে গেল।
সেই যে সুধাদের বাড়ি থেকে শান্তিনিবাস-এ বিনয় চলে এসেছিল তারপর মাত্র দু-একবার জাফর শা রোডে গেছে বিনয়। রিফিউজি কলোনি, ত্রাণশিবিরে–ছোটাছুটি তো ছিলই। আসাম থেকে কলকাতায় নতুন শরণার্থীদের ঢল নামায় নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাওয়া যাচ্ছিল না। ভোর থেকে মাঝরাত কীভাবে যে কেটে গেছে একমাত্র সে-ই জানে। তার ওপর হরিচরণদের রেণুবালা নারী মঙ্গল কেন্দ্র আর ছায়াকে নিয়ে দুটো দিন ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছে।
সুধাদের বাড়ি সে যেতে না পারলেও হিরণ কিন্তু দুদিন মেসে এসে দেখা করে গেছে। ঠিক ছিল খান মঞ্জিল সারিয়ে, রংটং করার পর পঞ্জিকায় শুভদিন দেখে খুব শিগগিরই গৃহপ্রবেশ করা হবে। কিন্তু হিরণ জানিয়ে গিয়েছিল, সরস্বতীকে পি. জি হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। বারোমাস সরস্বতী নানা অসুখ বিসুখে কষ্ট পান। হঠাৎ তার রোগটা বাড়াবাড়ি হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালে না দিয়ে উপায়। ছিল না। তাই নতুন বাড়িতে যাওয়া আপাতত স্থগিত রাখতে হয়েছে। তিনি যতদিন না সুস্থ হচ্ছেন, গৃহপ্রবেশের প্রশ্নই নেই। বিনয় সময় করে একদিন হাসপাতালে গিয়ে সরস্বতীকে দেখে এসেছে।
