চাতালের মাঝখানে মধ্যমণি হয়ে চটের আসনে থেবড়ে বসে পান চিবুচ্ছিল নিশিবালা। হঠাৎ সে বিনয়কে দেখতে পায়। কিছুক্ষণ মেয়েমানুষটার চোখের পাতা পড়ে না। একসময় হাতের ভর দিয়ে থলথলে বিপুল শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করায়। একমুখ হেসে হাত নেড়ে নেড়ে ডাকতে থাকে, অ মা, কালকের সেই কচি বাবুটি যে গ! তা উশীদের (উর্বশীদের) পাড়ায় এসে দোরগোড়ায় পেঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আসুন, ভেতরে আসুন–।
বুকটা ছাঁৎ করে ওঠে বিনয়ের। কাল দুটো ঢাল ছিল তার সামনে-হরিচরণ এবং পীতাম্বর। সে তাঁদের আড়ালে থাকতে পেরেছিল। কিন্তু আজ নিশিবালার চোখে পড়ে গেছে। পালিয়ে যে যাবে, এখন তার উপায় নেই। তাছাড়া যে কারণে তার অনুশোচনার সীমা-পরিসীমা নেই, যে কারণে তার মানিকতলায় ছুটে আসা তার শেষ না দেখে চলে যাওয়া যায় না। বিনয় নিশিবালার দিকে চোখ রেখে চাতালে চলে এল।
কালকের মতোই একটা মেয়েকে দিয়ে চেয়ার আনিয়ে বিনয়কে বসালো নিশিবালা। এদিকে মেয়েরা কঁক বেঁধে উঠে এসে কলর বলর শুরু করে দিল।
আমাদের রসের নাগর এয়েচে গ।
বাবু কাল রাত্তিরি ঘুমুতে পারেনি বুজি? পেরানে কুরুকুরুনি জেগেছিল?
ভিড়ের ভেতর থেকে অন্য একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করে, কী করে বুজলি?
আগের মেয়েটি বলে, লইলে দুক্কুর হতে না-হতে পাড়ায় এসে হাজির হতো! আমাদের ওপর কী টান গ।
বাবুটি কত কষ্ট করে এয়েচে। তোরা তার পেছুতে লাগলি কেন? চুপ কর দিকিনি নিশিবালা হাত তুলে ধমক দেয় ঠিকই, তবে তাতে খানিক আশকারা মেশানো
মাসির কথায় কখন চুপ করতে হবে, কখন হবে না, মেয়েগুলো সেটা খুব ভালই জানে। তারা সমানে হইচই করতেই থাকে।
নিশিবালা বিনয়ের দিকে মুখ ফেরায়।–তা বাবু, সেই বুড়ো বাবা দুজন কোতায়? তেনাদের তো দেখছি না।
মেয়েগুলোর টিপন্নীতে নাকমুখ ঝাঁ ঝাঁ করছিল বিনয়ের। মুখ নামিয়ে বলল, ওঁরা আসেননি।
মুখে মিচকে হাসি ফুটিয়ে, একটা চোখ আধবোজা করে কিছুক্ষণ চবর চবর পান চিবোয় নিশিবালা। তারপর গলার স্বরে ঢেউ খেলিয়ে বলে, আপনি তা হলি তেনাদের না জানিয়ে নুকে নুকে (লুকিয়ে লুকিয়ে) এয়েছেন?
বিনয় উত্তর দিল না।
নিশিবালা গলাটা খাদে নামিয়ে দেয়, তা বাবা, আমি জানতুম, আপনি আসবেন। কালই বুড়ো বাবাদের বলেছিলুম, উঁচুক্কে বয়েসের ছোঁড়াদের এখেনে আনলে মতি ভেরম (ভ্রম) হয়। তা তেনারা আপনার কত গুণকেত্তন করলে! সে-সব এক কান দে (দিয়ে) ঢুকিয়ে আর-এক কান দেবার করে দিলুম। আরে বাপু, পুরুষ মানুষের নাড়ি-নক্ষত্তর আমার জানা হয়ে গেছে। আমাদের এই মেয়েদের বাজারে এসে ডাবগা ডবগা (ডবকা ডবকা) ঘুড়ি দেখলে তারা নাট (লাট) খেয়ে পড়ে।
কে একজন বলে ওঠে, কিন্তুন মাসি, ওই বুড়ো দুটোও তো পুরুষ মানুষ। ওদের
তাকে থামিয়ে দিয়ে নিশিবালা হাতজোড় করে বলে, তেনাদের কতা আলাদা। তেনারা হলেন গে ভগমান। দেশের কাজ করে করে জেবন শেষ করে দিলে। তোদের মতোন এক শটা ছুঁড়ি তেনাদের জাপটে ধরলেও কেতরে পড়বেনি।
বোঝা যাচ্ছে, হরিচরণ আর পীতাম্বর যে স্বাধীনতা-সংগ্রামী-সেটা নিশিবালা জানে। ওদের পৃথিবীতে এক ধরনের লোকই বিষপোকার মতো থিক থিক করে–মাতাল, লুচ্চা, লম্পট, খুনে। সমাজের নোংরা সব গাদ। নর্দমার পচা পাক। কোথায় এরা, আর কোথায় হরিচরণরা! জিতেন্দ্রিয়, দেশব্রতী মানুষ দুটি সম্পর্কে নিশিবালার অপার ভক্তি।
আর-একটি মেয়ে বলল, কেতরে পড়ার বয়েস কি আর আছে! দুই বুড়োর শরীরের রস শুক্যে (শুকিয়ে) ঝামা হয়ে গেছে।
বিনয় বসে থাকতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, তার রক্তচাপ ঝপ ঝপ করে নেমে যাচ্ছে। নিশিবালা এবং মেয়েরা কী বলে যাচ্ছে, সে-সব যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল না। আবছা, দুর্বোধ্য, একটানা আওয়াজের মতো কানে বেজে যাচ্ছে। করুণ, ফ্যাকাসে মুখে হাতজোড় করে সে নিশিবালাকে বলে, আমি একটা বিশেষ দরকারে আপনার কাছে এসেছি।
ঘাড় ঝাঁকিয়ে, ভুরু নাচিয়ে নিশিবালা বলল, পুরুষ মানষে এট্টা দরকারেই তো একেনে আসে– তার চোখে নোংরা সংকেত ফুটে ওঠে।
মরিয়া হয়ে বিনয় বলল, আপনারা যা ভাবছেন তা নয়। আমার কথাটা আগে শুনুন–
হয়তো করুণাই হয় নিশিবালার। ভালমানুষের মতো মুখ করে সে বলে, ঠিক আচে-বলুন।
কাল এখানে একটি মেয়েকে দেখে গিয়েছিলাম। তার নাম ছায়া। দয়া করে ছায়াকে ডাকুন। তার সঙ্গে কথা বলব।
পান চিবুনো থেমে যায় নিশিবালার। চোখের তারা একেবারে স্থির। রুক্ষ, মেচেতা-ভরা মুখ কঠিন হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ সোজাসুজি বিনয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে বলে, ছায়া বলে তো একেনে কেউ নেই।
বিনয় থতমত খেয়ে যায়। মেয়েমানুষটা সরাসরি অস্বীকার করবে, ভাবতে পারেনি। বলল, কিন্তু কাল আমি নিজের চোখে তাকে দেখে গেছি।
নিশিবালা ফের আগের মতোই স্বাভাবিক। চোয়াল নড়তে শুরু করেছে, অর্থাৎ জাবর কাটা চলছে। চোখমুখের সেই কঠোরতা আর নেই। হেসে হেসে বলল, কাকে দেকতে কাকে দেকেচেন! এখেনে এলে মাতা গুইলে যায়। সব ডবকা ঘুড়িকে একরকম নাগে
বিনয় বেশ জোর দিয়েই বলল, আমার মাথা গুলিয়ে যায়নি। ছায়াকেই দেখেছি।
নিশিবালা লহমায় মেয়েপাড়ার মাসি হয়ে ওঠে। তেমনি দাপুটে, তেমনি রণচণ্ডীমার্কা। গলা চড়িয়ে, হাত নাচাতে নাচাতে বলে, বলচি লেই। তবু এক কতা! আমি কি ছায়াকে গড়িয়ে দেব?
