ছায়া হাত তুলে ডাকতে গিয়ে থেমে যায় বিনয়। একবার ভাবে, ভেতরে গিয়ে ছায়াকে জিজ্ঞেস করে, এখানে কী করে এসে সে পৌঁছল? তার মা এবং অন্য দুই বোন কোথায় রয়েছে? কিন্তু কিছুই করা গেল না। কেউ যেন পেরেক ঠকে তার পা দুটো রাস্তায় গেঁথে দিয়েছে।
এদিকে হরিচরণরা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ তাদের খেয়াল হয়, বিনয় সঙ্গে আসেনি। ঘুরে দাঁড়িয়ে হরিচরণ গলা উঁচুতে তুলে ডাকতে লাগলেন, বিনয়-বিনয়
প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে যেন সম্বিত ফিরে পায় বিনয়। ছুটতে ছুটতে হরিচরণদের কাছে চলে আসে সে।
হরিচরণ জিজ্ঞেস করেন, ওখানে কী করছিলে?
ছায়ার কথা জানাতে গিয়েও কী ভেবে জানায় না। বিনয় শুধু বলে, না, কিছু না
হরিচরণ স্থির দৃষ্টিতে বিনয়কে লক্ষ করেন। তবে আর কোনও প্রশ্ন করেন না।
বড় রাস্তায় এসে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। বালিগঞ্জের বাস এসে গেল। পীতাম্বর উঠে পড়লেন। বালিগঞ্জ স্টেশনে গিয়ে তিনি কসবায় রেণুবালা নারী মঙ্গল কেন্দ্র-এ চলে যাবেন।
হরিচরণদের ধর্মতলায় গিয়ে ভবানীপুরের বাস বা ট্রাম ধরতে হবে। স্টপেজে মিনিট দশেক দাঁড়াবার পর তাদের বাসও এসে গেল।
ফাঁকা বাসে হরিচরণের পাশে মুহ্যমানের মতো বসে ছিল বিনয়। রামরতন গাঙ্গুলি নামে একটি মানুষ নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, বিশাল কেরিয়ারের স্বপ্নকে হেলায় তুচ্ছ করে পূর্ব বাংলার অজ গ্রামগুলোতে শিক্ষার আলো জ্বালাবার ব্রত নিয়েছিলেন। আদর্শবাদী মানুষটি সারা জীবন জাতি গঠনের কাজে নিজের সর্বস্ব সঁপে দিয়েছিলেন। আর তার পরিবার? ছায়া কোথায় এসে ঠেকেছে তা তো নিজের চোখেই দেখে এল বিনয়। অন্য দুই মেয়ে-মায়া এবং বাসন্তী, তাঁর স্ত্রী-তারা কোথায় আছে, কীভাবে তাদের দিন কাটছে, কিছুই জানা হয়নি। তবে ওরা যে কেউ ভাল নেই সেজন্য খুব জোরালো অনুমানশক্তির দরকার নেই। রামরতন গাঙ্গুলির পরিবারের কি এমন পরিণতি প্রাপ্য ছিল?
অপরাধবোধ, পাপবোধ আর অসহ্য গ্লানিতে কুঁকড়ে যাচ্ছে বিনয়। এই সেদিন টাকা নিয়ে মদন বড়াল লেনে বিমলের বাসায় গিয়েছিল সে। গিয়ে কী শুনল? রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েরা কারওকে কিছু না জানিয়ে চলে গেছে। মাত্র দুটো দিন দেরি হওয়ার কারণে ছায়াদের চরম ক্ষতিটা হয়ে গেল। তীব্র অনুশোচনায় তার বুকের ভেতরটা পুড়তে থাকে। তার মধ্যেই সে মনস্থির করে ফেলে ছায়াকে মানিকতলার ওই নরককুণ্ড থৈকে উদ্ধার করে আনবে। সুস্থ, স্বাভাবিক নিরাপদ জীবনে মেয়েটা যাতে ফিরতে পারে সেজন্য যা যা করা দরকার তাই করবে বিনয়।
.
সারারাত ভাল করে ঘুমোতে পারেনি বিনয়। বার বার ছায়ার মুখটা তার চোখের সামনে ফুটে উঠছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমটা ভেঙে যাচ্ছিল। আবেগের বশে, প্রবল অনুতাপে সে ভেবে রেখেছে মানিকতলার ওই আস্তাকুঁড় থেকে ছায়াকে বার করে আনবে। কিন্তু সমস্যা হল সেটা কীভাবে সম্ভব? পদ্ধতিটা কী? বিকেলে পলকের জন্য দেখা হলেও ছায়া কথা বলেনি। দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। পরেও যদি দেখা হয়, সে এড়িয়ে যাবে। এদিকে নিশিবালা ছায়াকে কোনওভাবেই হাতের মুঠো থেকে বেরুতে দেবে না। তার পোষা গুণ্ডাবাহিনী রয়েছে। ছায়াকে বার করে আনতে গেলে সে তাদের লেলিয়ে দেবে।
হঠাৎ অদম্য জেদ বিনয়ের ওপর ভর করে। হরিচরণ বলেছিলেন, দুচারদিন পর আবার মানিকতলার ওই মেয়েপাড়ায় যাবেন। কিন্তু এত দেরি করা চলবে না। যা করার ঝড়ের গতিতে করতে হবে। কালই আবার মানিকতলায় যাবে সে। এবার একা। যে পাপ করেছে তার স্খলন না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি নেই।
পরদিন সকালে উঠে গরম জলে চান সেরে প্রসাদের ঘরে এসে তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে রুটি কেটে মাখন লাগাতে লাগল বিনয়। দিনের কর্মসূচি এভাবেই শুরু হল তার।
বিফিউজিদের রোগা রোগা বাচ্চাগুলো তাদের বরাদ্দ রুটি-টুটি নিয়ে যাবার পর সকালের জলখাবার খেয়ে, প্রসাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিনয়। আজ আর দূরের কোনও কলোনি বা ক্যাম্পে যাবে না সে। তাহলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
তার মাথায় মানিকতলার মেয়েপাড়াটা অবিরল পাক খেয়ে চলেছে। অন্য কোনও দিকে তার লক্ষ্য নেই। ঢাকুরিয়া লেকের কাছাকাছি একটা ক্যাম্পে গিয়ে কোনও রকমে কাজ সেরে খালসা হোটেলে রুটি মাংস খেয়ে সে ছুটল মানিকতলায়। বারোটা নাগাদ সেখানে পৌঁছে গেল।
.
সদর দরজায় বাইরে থেকে ভেতরের চৌকো, মস্ত চাতালে কালকের সেই দৃশ্যটাই দেখতে পেল বিনয়। এই ভরদুপুরে এখানকার মেয়েরা থোকায় থোকায় বসে আছে। চলছে কলকলানি। মাঝে মাঝে কোনও রগড়ের কথায় উঠছে হাসির লহর। এ ওর গায়ে ঢলে ঢলে পড়ছে।
একটু লক্ষ করতে অবশ্য খানিকটা তফাত চোখে পড়ল। কাল বিনয়রা এসেছিল পড়ন্ত বেলায়। তখন মেয়েগুলো পরিপাটি করে সাজতে বসেছে। সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকাটা নরক গুলজার হয়ে উঠবে, চলছিল তারই আয়োজন।
কিন্তু এই দুপুরবেলায় সবাই রয়েছে হালকা রং-তামাশার মেজাজে। সন্ধের এখনও ঢের দেরি। বেলা হেললে তবেই না সাজগোজের জিনিস নিয়ে বসবে।
বিনয় লক্ষ করল, সবারই চান হয়ে গেছে। তাদের ভোলা চুল পিঠময় ছড়ানো। গুলতানি করতে করতে রোদে ভেজা চুল শুকিয়ে নিচ্ছে তারা।
সদর দরজার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়েই আছে বিনয়। মাথায় প্রবল জেদ ঠেসে নিয়ে মানিকতলায় ছুটে এসেছিল কিন্তু এখন কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। ভেতরকার জমাট সাহস, মনের জোর আর আগের মতো অটুট নেই, ধসে ধসে পড়ছে। তবু তারই মধ্যে মেয়েদের দঙ্গলে ছায়াকে খুঁজতে লাগল।
