নিশিবালা এই প্রথম অসহিষ্ণু হয়ে উঠল, না না, ডাকা যাবে না। বাবারা, বুজতে পারছেন না–এটা আমাদের ব্যবসা। কেন সেটি মাটি করতে চাইছেন?
বিনয় হরিচণদের পাশে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু তার নজর বার বার দূরের কুঠুরিগুলোর দিকে চলে যাচ্ছিল। মেয়েগুলোরও কৌতূহলের সীমা-পরিসীমা নেই। নিশিবালার তাড়ায় চাতাল থেকে ওদের চলে যেতে হয়েছিল; কিন্তু দরজা জানালার ফাঁক দিয়ে জোড়া জোড়া চোখ এদিকেই স্থির হয়ে আছে। কান খাড়া করে হরিচরণদের কথাগুলো তারা গোগ্রাসে গিলছিল।
এখানে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে বিনয় টের পেয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তানের ধর্ষিতারা অনেকেই রসাতলের এই শেষ প্রান্তে এসে ঠেকেছে। এমনও হতে পারে, নিখোঁজ হয়ে যাবার পর ঝিনুকও নানা জায়গায় ধাক্কা খেতে খেতে এই নরকে ঠাঁই নিয়েছে; চিন্তাটা মাথায় আসতেই দম আটকে যায়। উদ্ভ্রান্তের মতো তার চোখ কুঠুরির পর কুঠুরি পেরিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়েগুলোর মুখ দেখতে থাকে। না, ঝিনুক নেই।
শ্বাস-প্রশ্বাস ফের যখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, আচমকা খেয়াল হয়, মানিকতলার এই ভোলার চালের বস্তিটাই তো একমাত্র নয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে এরকম আরও কত যে নরকের খাসতালুক রয়েছে। তার লেখাজোখা নেই। তেমন কোথাও তো ঝিনুক থাকতে পারে। হরিচরণরা একের পর এক এই সব এলাকায় হানা দিয়ে মেয়েদের উদ্ধার করে আনার চেষ্টা করছেন। বিনয় সব সময় পারবে না, তার মাথায় অফিসের হাজারটা অ্যাসাইনমেন্ট চাপানো রয়েছে। সে ঠিক করে ফেলল, কাজের ফাঁকে ফাঁকে হরিচরণদের সঙ্গে মেয়েপাড়াগুলোতে যাবে।
ঈশ্বর সম্বন্ধে বিনয়ের ধারণা ধোঁয়াটে। পুরোপুরি বিশ্বাস করে না, আবার অবিশ্বাসটাও তত জোরালো নয়। তবে এই মুহূর্তে মনে মনে ব্যাকুলভাবে প্রার্থনা করল, হে ঈশ্বর, নিষিদ্ধ পল্লিগুলোতে যাব ঠিকই, কিন্তু ঝিনুকের সঙ্গে যেন ওইসব এলাকায় দেখা না হয়।
ওদিকে নিশিবালা বলছিল, বাবারা, বেলা পড়ে গেছে। এবেরে আপনারা আসুন। মেয়েরা একনও তৈরি হয়নি। ইদিকে দোকান খোলার সময় হয়ে এল।
সূর্যটাকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিম দিকের উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর আড়ালে সেটা নেমে গেছে। যে নিবু নিবু মলিন আলোটুকু এখনও আবছা ভাবে রাস্তাঘাট, দালান কোঠা এবং গাছপালার গায়ে লেগে আছে তার আয়ু আর কতক্ষণ? চারদিক ঝাপসা ঝাপসা। সারা শহর যেন গায়ে উলঙ্গ বাহার শাড়ি জড়িয়ে নিচ্ছে। দেখতে দেখতে সন্ধে নেমে যাবে।
নিশিবালা আকাশের দিকে তাকিয়ে রীতিমতো তাড়া লাগায়, যান বাবারা, যান। সোনার চাঁদেরা একুনি এসে পড়বে
সোনার চাঁদ?
হেই যে গো-মাতাল দাঁতালের পাল। আমাদের রাত্তিরির খদ্দের। এক-একটা গু-খেকোর ব্যাটা। তাদের যা মুখ-কী কইব! যেন কঁচা নদ্দমা। আপনাদের মতো মান্যিগণ্যি নোকেরা সে-সব খিস্তি খেউড় সহ্যি করতে পারবেন না। বাবারা, আর দেরি করবেন না।
এরপর আর বসে থাকা যায় না। উঠে পড়তে পড়তে হরিচরণ বললেন, আজও আমরা খালি হাতে চলে যাচ্ছি। তবে ফের আসব–
নিশিবালা ঝাঝালো গলায় বলে, না। হাতজোড় করে কইচি, আসবেন না।
হরিচরণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
নিশিবালা গলার স্বর আরও অনেকটা ওপরে তোলে। আমাদের মেয়েগুলোনকে ফুসলে ফুসলে নে যাবেন। আর আমরা কারবার গুটিয়ে কপালে তেলক কেটে কেত্তন গাইব–সিটি হবে না। ঢের সোম্মান আপনেদের দিইচি। এর পর এলে ঝামেলি হয়ে যাবে। মাথা গরম হলে আমার মুখি নাগাম (লাগাম) থাকে না। বাপ মা, চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করে ছাড়ি। চলে যান–চলে যান
নিশিবালার আসল স্বরূপটি উগ্র মূর্তিতে বেরিয়ে আসতে থাকে। নরকের এই অন্দর মহলে সে যে জবরদস্ত পাহারাদারনী, সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে। এখানকার একটি মেয়েকেও সে যে সহজে, ছেড়ে দেবে না, সেটা পরিষ্কার।
হরিচরণের ধৈর্যের, সহনশীলতার সীমা-পরিসীমা নেই। তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। হাসি মুখে, খুব স্নিগ্ধ স্বরে বললেন, আমাদের অপমান করবে তো?
নিশিবালা উত্তর দিল না। তার চোখের তারা দুটো ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে।
হরিচরণ থামেননি, ঠিক আছে, তাই কোরো। যত পার গালাগাল দিও। কিন্তু আমাদের গায়ের চামড়া ভীষণ পুরু। ও-সব বিধবে না। একটা কথা শুনে রাখ, যতক্ষণ না মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে দিচ্ছ, আমরা আসবই। ওরা এখানে থাকবে, না আমাদের সঙ্গে যাবে, সেটা ওদের মুখেই শুনতে চাই।
হরিচরণ বিনয়দের দিকে ফিরে বললেন, চল হে–
ওরা যখন সদর দরজায় চলে এসেছে, ঠিক সেই সময় একটি যুবতী মেয়েকে দেখা গেল। গলির দিক থেকে সে এখানেই আসছে। বয়স তেইশ চব্বিশ।
ঘনিয়ে আসা সন্ধের অস্পষ্ট অন্ধকারেও তরুণীটিকে চেনা গেল– ছায়া। জামতলি হাইস্কুলের মৃত হেডমাস্টার রামরতন গাঙ্গুলির মেয়ে।
মুহূর্তে বিনয়ের হৃৎপিণ্ডের উত্থানপতন বন্ধ হয়ে গেল।
চারপাশের বাড়িগুলোতে এর মধ্যে দু-চারটি আলো জ্বলে উঠেছে। কর্পোরেশনের লোকেরা এসে কখন যে রাস্তায় গ্যাস বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে দিয়েছিল টের পাওয়া যায়নি।
ছায়া থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কয়েক পলক বিহুলের মতো তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। নরকের সিংদরজায় আচমকা বিনয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, হয়তো সে ভাবতে পারেনি। বিস্ময়ের ঘোরটা কাটিয়ে উঠতে বেশিক্ষণ সময় লাগে না। তার মুখে কত রকমের অনুভূতি যে ফুটে উঠতে থাকে! ভয়। আতঙ্ক। গহিত কোনও অপরাধ ধরা পড়ে যাবার জন্য তীব্র গ্লানিবোধ। চকিতে মুখ ফিরিয়ে এক দৌড়ে মেয়েপাড়ায় ঢুকে পড়ে সে।
