নিশিবালা আচমকা বিনয়ের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলে ওঠে, আপনারা আসেন আসেন, তা এই উঁচুকা বয়েসের (যুবক) ছেলেটাকে লিয়ে এয়েচেন কেন গো বাবারা? এনার মতি ভেরম (এম) হতে কতক্ষণ?
ইঙ্গিতটার মধ্যে এতটুকু ধোঁয়াটে ব্যাপার নেই। জলের মতো তা স্বচ্ছ। পীতাম্বর বা হরিচরণ চিরকুমার। দেশের জন্য আজন্ম ব্রহ্মচর্য পালন করে এসেছেন। পরকালের দোরগোড়ায় পৌঁছে তাদের আর পা পিছলে পড়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু উঠতি বয়সের একটা ছেলের পক্ষে নিজেকে সামলে রাখা মুশকিল। সোজাসাপটা যাকে বলে বেশ্যাপট্টি এটা হল তাই। এখানে শরীরের পসরা সাজিয়ে গণ্ডা গণ্ডা মেয়ে শিকার ধরার জন্য ওত পেতে আছে। যে-কোনও মুহূর্তে যে-কোনও যুবক ঘাড় গুঁজে লাট খেয়ে পড়বে।
নিশিবালা বলতে লাগল, আপনাদের মতো বড় মানুষদের সঙ্গে এয়েছে বলে এত কথা বললাম। নইলে আমাদেরই তো ভাল-খদ্দের যত বাড়ে।
হরিচরণ গম্ভীর স্বরে বললেন, ওর স্বভাব অত ঠুনকো নয়। ওকে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আগের তিন তিন বার এসে তোমাকে কী বলে গিয়েছিলাম, মনে আছে?
নিঃশব্দে মাথা হেলিয়ে দেয় নিশিবালা–আছে।
এখানকার মেয়েদের আমার কথাগুলো জানিয়েছ?
নিশিবালা উত্তর দিল না। হরিচরণ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। মনে হচ্ছে বলনি।
না, বলিনি- আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে নিশিবালা।
ঠিক আছে, তুমি যখন বলবেই না, আমাকেই তাহলে বলতে হবে—
না না– আচমকা যেন ঝাঁকুনি খেয়ে চকিত হয়ে ওঠে নিশিবালা। এতক্ষণ পা থেকে মাথা অবধি বিনয় এবং নম্রতার যে খোলসটা আঁটা ছিল, ঝাড়া দিয়ে সেটা খসিয়ে ফেলে তার ভেতর থেকে উগ্র একটা মেয়েমানুষ বেরিয়ে আসে। খানিক দূরে অল্পবয়সী মেয়েদের জটলাটার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে কর্কশ গলায় ধমকে ওঠে, অ্যাই, তোরা এখেনে পেঁড়িয়ে সং দেকচিস। যা, ভাগ। যে যার ঘরে গে সাজগোজ কর ।
সিনেমায় আর গল্প-উপন্যাসে যে মাসি বা বাড়িউলিরা বিপুল দাপটে বেশ্যাপাড়া চালায়, তাদের একটি জীবন্ত নমুনা এই প্রথম স্বচক্ষে দেখতে পেল বিনয়। লক্ষ করল, মেয়েগুলো নিশিবালার মুখের ওপর একটি কথাও বলল না। তড়বড় করে দৌড়তে দৌড়তে ইঁদুরের গর্তের মতো সারিবদ্ধ খুপরিগুলোতে গিয়ে ঢুকে পড়ল।
নিশিবালা ফের বিনয়দের দিকে তাকায়। হরিচরণ বলেন, দেখ মা, পাকিস্তানের অনেক মেয়ে নিরুপায় হয়ে, নেহাত পেটের দায়ে তোমাদের এখানে এসে উঠেছে। বড় দুঃখী এরা। তিনি বিশদভাবে বলতে লাগলেন, দেশভাগ না হলে এমন দুর্ভাগ্য তাদের হতো না। স্বাভাবিক জীবন থেকে ওরা বঞ্চিত হতো না। বিয়ে হতো, সন্তান হতো। স্বামী-সংসার আত্মীয়-পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারত, যেমন আবহমান কাল হাজার হাজার তরুণী কাটিয়ে এসেছে।
হরিচরণ থামেননি, নিশিবালা তুমি ওদের মায়ের মতো। মেয়েগুলোকে ছেড়ে দাও। তোমাকে আগেও এসে বলে গেছি, এখনও বলছি, আমরা একটা হোম খুলেছি। দেশভাগ হওয়ার জন্যে যে মেয়েদের সর্বনাশ হয়ে গেছে, তাদের সেখানে নিয়ে যাচ্ছি। ওরা যাতে পুরনো দুঃস্বপ্ন ভুলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে সেই চেষ্টা করছি। তুমি ওদের আটকে রেখো না।
বিনয়ের খোলসটা আবার সারা শরীরে জড়িয়ে নিয়েছিল নিশিবালা। তবু তার চোখমুখ দেখে মনে হল, হরিচরণের আর্জি তাকে লেশমাত্র নাড়া দিতে পারেনি। সে চুপ করে থাকে।
আভা বলেছিল, রেণুবালা নারী মঙ্গল কেন্দ্র-এ যাবার আগে সে ছিল যমের পুরীতে। হরিচরণের মতো একজন অতি শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধা কোন নরক ঘেঁটে ঘেঁটে লাঞ্ছিত মেয়েদের তুলে নিয়ে তাদের হোমে আশ্রয় দিয়েছেন, এবং এ-জাতীয় আরও অনেককে উদ্ধার করতে অনবরত ছোটাছুটি করছেন, এতক্ষণে জানতে পারল বিনয়।
খানিকক্ষণ নীরব থাকার পর নিশিবালা বলল, বাবা, আপনি যা কইচেন, সেটি আর সোম্ভব লয়–
কণ্ঠস্বর সামান্য উঁচুতে তুলে হরিচরণ জিজ্ঞেস করেন, কেন নয়? তুমি কি চাও না, মেয়েগুলোর ভাল হোক?
দুটো প্রশ্নকেই তেমন আমল দিল না নিশিবালা।–আমার চাওয়া-চাওয়ির ওপর একন আর কিছু নের্ভর করে না।
তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।
আপনাদের মতো পণ্ডিত নোক এই সোজা কতাটা বুঝতে পারলেন না? রীতিমতো অবাকই হল নিশিবালা, অদ্দেষ্ট বাবা, অদ্দেষ্ট
ব্যাপারটা এখনও বোধগম্য হল না। হরিচরণ জিজ্ঞেস করলেন, কীসের অদৃষ্ট?
একবার আমাদের একেনে নাম নেখালে আর ফেরার উপায় লেই। নেয়তি–সবই নেয়তি।
হরিচরণ কী উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, মেয়েমানুষটা ফের বলে ওঠে, বাবারা, ওরা য্যাকন নদ্দমার পাঁক গায়ে মেকেছে, বাকি জেবনটা ওই পাঁক মেকেই যেতে হবে। এটাই ওদের কপালের নেখন (লেখন)।
মেয়েগুলোর এই নোংরা, গ্লানিকর জীবন যে নিয়তি-নির্দিষ্ট সে-সম্বন্ধে লেশমাত্র সংশয় নেই নিশিবালার। তার কথাগুলো হরিচরণের এক কান দিয়ে ঢুকে আর-এক কান দিয়ে বেরিয়ে গেল। বললেন, তবু আমরা একবার চেষ্টা করে দেখি না
য্যাতই চেষ্টা করুন, মেইয়েছেলে একবার এ-পাড়ায় এসে ঢুকলে তাদের সতী সাবিত্তিরি করা যায় না। ওরা একেনে য্যাকন ঢুকেছে, একেনেই থেকে যাবে।
এতক্ষণ চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলেন পীতাম্বর। এবার বললেন, ঠিক আছে, ওদের ডাকো। আমরা একটু কথা বলি। যদি সব শুনে মনে করে আমাদের সঙ্গে গেলে ভাল হবে–যাবে। নইলে তুমি যা বললে তাই হবে। এখানেই থাকবে।
