এখনও ওরা পুরোপুরি সহজ হতে পারেনি। আমাদের সামনে তবু খানিকটা নর্মাল থাকে। কথা বলে, গল্প করে, মজার কথায় হাসে। কিন্তু নতুন কারওকে দেখলে গুটিয়ে যায়। এই যে তুমি এসেছ, ওরা একদম চুপ হয়ে গেছে। হয়তো ভাবছে, মনে মনে ওদের তুমি ঘেন্না করছ। এই ধরনের দুঃখী মেয়েদের মারাত্মক কমপ্লেক্স থাকে।
আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, খাওয়া দাওয়া চুকে গেলে এক মুহূর্তও দেরি করা হবে না। সেই মতো পীতাম্বর মল্লিক এবং বিনয়কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন হরিচরণ। মিনিট চল্লিশের ভেতর বালিগঞ্জ স্টেশন পেরিয়ে রাসবিহারীতে এসে বাসে উঠলেন ওঁরা।
.
৬৪.
মানিকতলায় নেমে যে রাস্তাটা সোজা ডান দিকে গেছে সেটা ধরে অনেকটা এগুবার পর বাঁ ধারের একটা গলিতে ঢুকলেন হরিচরণ। কয়েক পা যেতেই বিরাট এলাকা জুড়ে একটা চাপ-বাঁধা। বস্তি। মাথায় টালির চাল। গলির দিকে মস্ত সদর দরজাটা হাট করে খোলা। তাই ভেতরের অনেকটা অংশ চোখে পড়ছে। প্রকাণ্ড একটা বাঁধানো চাতাল ঘিরে সারি সারি কত যে ছোট ছোট কুঠুরি তার লেখাজোখা নেই।
চাতালে আসন বা কাঠের জলচৌকিতে বসে অগুনতি যুবতী–ষোল থেকে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ অবধি। বয়স–এখন, এই পড়ন্ত বেলায় সাজগোজ শুরু করেছে। কেউ চুল আঁচড়ে পরিপাটি করে খোঁপা বাঁধছে, কেউ চোখে সরু করে কাজল টানছে, কেউ বা মুখের সামনে হাত-আয়না ধরে গালে আর ঠোঁটে গোলাপি রং মাখছে। নিজেদের কতভাবে মোহিনী করে তোলা যায়, চলছে তারই ব্যাপক প্রস্তুতি।
যমের পুরীটা যে কী, এতক্ষণে তা বুঝতে পারে বিনয়। সিনেমায় পতিতাপল্লির ছবি দেখেছে সে। গল্প-উপন্যাসে তার অনুপুঙ্খ বর্ণনাও পড়েছে। কিন্তু এমন একটা নিষিদ্ধ এলাকায় কখনও আসতে হবে, কোনওদিন কি তা সে ভাবতে পেরেছে।
বিনয়ের বুকের ভেতরটা চিরতে চিরতে ধারালো করাত যেন ওঠানামা করছে। হৃৎপিণ্ডে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। পরক্ষণে মনে হল, সেটা এত জোরে লাফাচ্ছে যেন হাড়-মাংস ভেদ করে বেরিয়ে আসবে। মাথা ঝিম ঝিম।
যখন সে খানিকটা সামলে নিয়েছে, হরিচরণের গলা কানে এল, কই গো মা জননীরা, নিশিবালা কোথায়? বস্তির ভেতরে ঢোকেননি, সদর দরজার বাইরে থেকেই তিনি কথাগুলো বলেছেন।
মেয়েরা প্রসাধনে এমনই মজে ছিল, হরিচরণদের লক্ষ করেনি। সাজসজ্জা স্থগিত রেখে কজন চকিতে উঠে দাঁড়ায়। তারপর শুরু হয়ে যায় তুমুল হইচই।
মাসি-মাসি
তরাতরি আসো। দেখ মাসি, হেরা আবার আইছে–
মেয়েদের মধ্যে অনেকেই যে পূর্ব পাকিস্তানের, এবং খুব বেশিদিন যে তারা এখানে আসেনি, কথা শুনে টের পেল বিনয়। এটাও বোঝা গেল, এখানে হরিচরণরা অপরিচিত নন। আগেও তারা এই পাড়ায় এসেছেন।
মেয়েদের ডাকাডাকি শেষ হতে না-হতেই ডানধারের শেষ কুঠুরি থেকে যে মাঝবয়সী মেয়েমানুষটি ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এল তার রং চকচকে কালো, যেন সারা গায়ে ঘাম তেল মাখানো। মুখ গোলাকার। ঘাড়ে-গর্দানে ঠাসা। বড় বড় লালচে চোখ। পা থেকে গলা পর্যন্ত থাক থাক চর্বি। সাজের বাহারও যথেষ্ট। হাতে, গোছ গোছ সোনার চুড়ি, বাউটি। নাকে ফাঁদি নথ। গলায় সাত নহর হার। পরনে ক্যাটকেটে সবুজ শাড়ি। এলো চুল উড়ছে।
সদরের কাছে এসে হরিচরণদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল মেয়েমানুষটি। বিনয় আন্দাজ করে নেয় সে-ই নিশিবালা। এই পাড়ার মাসি।
নিশিবালা যতই রণচণ্ডীমার্কা হোক, তার কথাবার্তা এবং আচরণ কিন্তু পুরোপুরি উলটো। চেহারার সঙ্গে সে-সরের আদৌ মিল নেই। বিপুল শরীর নিয়ে অতি কষ্টে, প্রচুর কসরত করে, চাতালে মাথা ঠেকিয়ে হরিচরণ আর পীতাম্বরের উদ্দেশে প্রণাম সেরে জোড়হাতে উঠে দাঁড়ায় সে গলায় অঢেল বিনয় মিশিয়ে বলে, বাবারা, এই নিয়ে তিনদিন একেনে এলেন। আপনাদের মতো মানী নোকেঁদের কি এই পচা আঁস্তাকুড়ে আসাটা মানায়?
বিনয় হরিচরণদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। বস্তির অন্য মেয়েগুলোর কথায় জানা গেছে হরিচরণরা আগেও এ-পাড়ায় এসেছেন। নিশিবালা সেটা আরও স্পষ্ট করে দিল।
বিনয় লক্ষ করেছে, দুই স্বাধীনতা-সংগ্রামীকে নিশিবালা ছোঁয়া বাঁচিয়ে দূর থেকে প্রণাম করল। হয়তো তার ধারণা, তার স্পর্শে হরিচরণরা রুষ্ট হবেন, কিংবা তাদের পবিত্র শরীর অশুদ্ধ হয়ে যাবে।
হরিচরণ বললেন, রাস্তায় দাঁড়িয়েই কি কথা বলব?
কী ভেবে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিশিবালা বলল, আচ্ছা আসুন। কিন্তুন
ভেতরে যেতে যেতে হরিচরণ জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু কী?
নিশিবালা হরিচরণদের কোনও ঘরে নিয়ে গেল না। তিনখানা কাঠের চেয়ার আনিয়ে চাতালেই ওঁদের বসালো। কাঠে হয়তো স্পর্শদোষ নেই, তাই চেয়ারের ব্যবস্থা। নইলে বিনয়দের দাঁড়িয়ে থাকতে হতো।
নিশিবালা এবার হরিচরণের প্রশ্নটার উত্তর দিল, বাবারা বার বার এই নদ্দমায় এলে আপনাদের দুন্নাম হয়ে যাবে।
পীতাম্বর বললেন, তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছি। দুর্নামের ভয় করি না। দেশের মানুষ আমাদের চেনে। এই বয়েসে আমরা গোল্লায় গেছি, একজনও তা বিশ্বাস করবে না। তাদের চরিত্রের ভিতটি যে কোনও কারণেই ধসে পড়ার নয়, মুখে চুনকালি লাগারও যে একটুকু সম্ভাবনা নেই, সেটা দৃঢ়ভাবে বুঝিয়ে দিলেন তিনি।
বিনয় ওঁদের কথা শুনছিল ঠিকই, কিন্তু নিজের অজান্তেই বুঝিবা অবিরল তার চোখ অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল। খানিক দূরে চাতালের একধারে যুবতী মেয়েগুলো গা ঘেঁষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে আছে। চাপা গলায় ফিস ফিস করে কথা বলছে। সেখান থেকে অস্পষ্ট গুঞ্জনের মতো আওয়াজ আসছে।
