হরিচরণরা অবিরল বুঝিয়েছেন, মেয়েগুলোর জীবনে যা ঘটে গেছে সে জন্য তারা নিজেরা এতটুকু দায়ী নয়। তাদের ফিরিয়ে নিলে দু-চারদিন লোকে হয়তো ফিসফাস করবে, ওদের দিকে আঙুল তুলে দেখাবে। তারপর চুপ হয়ে যাবে।
কিন্তু মেয়েগুলোর মা-বাপেরা কোনও কথাই কানে তোলেনি। সমানে কেঁদেছে আর না না করে গেছে। যুবতী মেয়ের শরীর যদি একবার নষ্ট হয়ে যায়–তার ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়-তাকে আর। সংসারে ফেরানো যায় না। দুঃখে বুক ফেটে গেলেও তাকে বিসর্জন দিতেই হয়। দেশভাগের পর। এত যে ওলটপালট ঘটে গেছে জীবনে, যথাসর্বস্ব হারিয়েছে তারা, কিন্তু রক্তের মধ্যে পুরানো। সংস্কারগুলোকে ঠিক ধরে নিয়ে এসেছে। তাদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, ধর্ষিত মেয়েকে ঘরে ঢোকালে সংসারের পবিত্রতা ধ্বংস হয়ে যাবে। অগত্যা হরিচরণরা মেয়েগুলোকে হোমে আশ্রয় দিয়েছেন।
অবিকল নীলমের কাহিনি। শুধু এদের পাশে কোনও সুরেশ নেই।
শুনতে শুনতে শিউরে উঠছিল বিনয়। চোখের সামনে বার বার ঝিনুকের মুখ ফুটে উঠছে। হোমের এই মেয়েগুলো অনেক কিছু হারালেও ভেসে যাবে না। তাদের পাশে আছেন হরিচরণরা। এই হৃদয়বান, আদর্শবাদী মানুষগুলো রসাতলের প্রান্ত থেকে ওদের তুলে এনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু ঝিনুক? সে কোথায় আছে, একেবারে শেষ হয়ে গেছে কি না, কে জানে।
হরিচরণ এবার বললেন, মা-বাপেরা নেয়নি, দরজা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে, সেজন্যে মেয়েগুলোর ভীষণ ক্ষোভ, ভীষণ দুঃখ। তাই বলে, ওদের কেউ নেই। পুরো অতীতটাকেই ওরা খারিজ করে দিয়েছে।
ঝিনুকের চিন্তাটা প্রবলভাবে বিনয়কে ঝাঁকি দিয়ে যাচ্ছিল। সেটা সামনে গিয়ে বলল, হ্যাঁ, ক্ষোভ হবার তো কথাই।
অফিস-ঘরে এসে রেণুবালা নারী মঙ্গকেন্দ্র সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য জেনে লিখে নিল বিনয়। বিশেষ করে যাঁদের ডোনেশনে হোমটা চলে সেই সহৃদয় দাতাদের নাম এবং ঠিকানা। হোম
নিয়ে যে প্রতিবেদনটা তৈরি করবে তাতে এই মানুষগুলোর কথা বড় করে লিখবে। একটা মহান কাজে যাঁরা আড়ালে থেকে নিঃস্বার্থ সাহায্য করছেন তাদের সম্বন্ধে মানুষের জানা দরকার।
.
দুপুরবেলায়, সূর্য যখন সোজাসুজি মাথার ওপর উঠে এসেছে সেই সময় দুর্গা এসে হাজির। রান্না হয়ে গেছে। খেতে চলুন– বলেই চলে গেল।
চল হে হরিচরণ বিনয় এবং অন্য স্বাধীনতা-সংগ্রামীদের নিয়ে হোমের পেছন দিকে চলে এলেন। এখানে পর পর যে তিনটে বিরাট লম্বা শেড রয়েছে তার মাঝখানেরটার বেশির ভাগ অংশই খালি পড়ে আছে। খানিক আগে শেডগুলোতে ঘুরে গেছে বিনয়। এখন দেখা গেল, মধ্যের শেডটার ফাঁকা জায়গায় মুখোমুখি দুলাইনে সারি সারি চটের আসন পাতা। প্রায় শখানেকের মতো। প্রতিটি আসনের সামনে কাঁসার থালা এবং জল ভর্তি গেলাস। থালার কোনায় নুন, কাঁচালঙ্কা এবং এক টুকরো করে লেবু।
বিনয় লক্ষ করল, দুধারের অন্য শেড দুটোয় কেউ নেই। বোঝা যাচ্ছে, দুপুরের খাওয়ার জন্য এই সময়টা কাজকর্ম বন্ধ থাকে।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। পেতলের বালতি বোঝাই করে দুর্গা এবং আরও চার-পাঁচটি মাঝবয়সী মেয়েমানুষ ভাত ডাল তরকারি নিয়ে এসে পাতে পাতে দিতে লাগল।
দুর্গা প্রায় দশভুজা। দুহাতে নয়, যেন দশ হাতে পরিবেশন করে চলেছে। যন্ত্রের মত। সেই সঙ্গে মুখও চলছে বিরামহীন। তার সঙ্গিনীদের সমানে বলে চলেছে–কার পাতে ডাল পড়েনি, কাকে ভাত দিতে হবে, ইত্যাদি। দুর্গা যে একজন তুখোড় দলনেত্রী, সেটা তার তৎপরতা দেখে টের পাওয়া যায়।
হরিচরণের ঠিক বাঁ পাশে বসে খাচ্ছিল বিনয়। আয়োজন খুবই সাদামাঠা। মোটা চালের ভাত, মুসুর ডাল, আলু ভাজা আর নানারকম আনাজ দিয়ে একটা তরকারি।
হরিচরণ বললেন, তোমার খুব কষ্ট হল বিনয়
বিনয় খেতে খেতে হোমের মেয়েগুলোকে দেখছিল। সারি দিয়ে বসে তারাও খাচ্ছে। নীরবে, নতমুখে। কেমন যেন আড়ষ্ট। ওদের দিকে চোখ রেখেই সে জিজ্ঞেস করে, কীসের কষ্ট?
মাছ নেই, মাংস নেই, গাবের দানার মতো রেশনের চালের ভাত, ট্যালটেলে ডাল
হরিণচরণের কথার মধ্যেই মেয়েদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বিনয় বলে, আমার একটুও অসুবিধে হচ্ছে না। আপনারা খেতে পারছেন, আর আমি পারব না?
হোমে বিনয়ের আপ্যায়নটা যে ঠিকমতো হচ্ছে না, সেজন্য হরিচরণ হয়তো সংকোচ বোধ করছেন। খানিকটা কৈফিয়ৎ দেবার সুরে বললেন, আসলে ডোনেশন বাবদ যা পাওয়া যায় তা দিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব না। কোনওরকমে মেয়েগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা আর কি।
বিনয় বলল, আমি কি তা বুঝি না? এ নিয়ে আর কিছু বললে কিন্তু খুব লজ্জা পাব।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি খাও।
বিনয়ের চোখ আবার মেয়েদের দিকে ফিরে যায়। ফের কী বলতে গিয়ে সেটা লক্ষ করেন হরিচরণ। নিচু গলায় বলেন, বুঝলে বিনয়, এই মেয়েরা গোড়ার দিকে আমাদের সঙ্গে খেতে বসতে চাইত না। আমরাই জোর করে বসাই। ওদের সঙ্গে এমনভাবে মিশি, গল্প করি, একসঙ্গে বসে খাই, যাতে মেয়েগুলো সমস্ত গ্লানি ভুলে গিয়ে আগের মতো স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু—
প্রথম আলাপের দিন থেকেই এই স্বাধীনতা-সংগ্রামীটির প্রতি বিনয়ের অনন্ত শ্রদ্ধা। হোমে এসে সেটা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। শুধু তিনিই নন, তার পুরানো সহযোদ্ধারা–পশুপতি চট্টরাজ, মেঘনাদ সিংহ, পীতাম্বর মল্লিক, লোকনাথ সাহাদের যত দেখছে ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অফুরান বিস্ময়ে পূর্ণ হচ্ছে মন। হেমনাথ আর ফাদার লারমার ছাড়া এমন উদারতা, এত মহানুভবতা কি। আগে আর কারও মধ্যে দেখেছে বিনয়? মনে তো পড়ে না। হরিচরণের কথার খেই ধরে সে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু কী?
