হরিচরণ নিচু গলায় বললেন, মেয়েগুলোর আতঙ্কের স্মৃতি ভুলিয়ে দিয়ে আমরা ওদের স্বাভাবিক করে তুলতে চেষ্টা করছি। এমন কিছু জিজ্ঞেস কোরো না যাতে পুরনো কথা মনে পড়ে যায়।
আস্তে মাথা নেড়ে বিনয় জানায়, জিজ্ঞেস করবে না।
মেয়েদের ট্রেনিং দিয়ে জামাটামা তৈরির কাজ, চামড়ার কাজ শেখানো হয়েছে। ওদের বানানো জিনিস দোকানে দোকানে দিয়ে আসা হয়। মোটামুটি বিক্রিও হচ্ছে।
বিনয়কে নিয়ে প্রথমে ডানপাশের শেডে এলেন হরিচরণ। দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়নি, এবার দেখা গেল, মেয়েদের কেউ টুলে বসে মেশিনে ফ্রক সেলাই করছে, কেউ সায়া, কেউ ব্লাউজ। মেঝেতে যারা বসে আছে তারা পেন্সিলের দাগ দিয়ে জামাটামার জন্য নানা রঙের ছিট কাপড় কেটে চলেছে। পরে সেগুলো সেলাই করা হবে।
হরিচরণ বিনয়ের সঙ্গে মেয়েদের অলাপ করিয়ে দিলেন। এ তোদের একজন দাদা। নাম বিনয়। খুব ভাল ছেলে। তোদের কাজকর্ম দেখতে এসেছে।
বিনয়কে দেখে সেলাই কলগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মেঝেতে বসা মেয়েদের কচিও থেমে গেছে। সবার চোখেমুখে প্রবল অস্বস্তি। নিমেষে তারা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে।
বিনয় মেয়েগুলোর মনোভাব আন্দাজ করে নিয়েছিল। ওরা ধরেই নিয়েছে ওদের লাঞ্ছনার খবর পৃথিবীর কারও জানতে বাকি নেই। বিনয়ও কি জানে না? নিশ্চয়ই জানে। হয়তো সেই কারণেই এমন কুঁকড়ে যাওয়া।
ঝিনুকের কথা মনে পড়ে বিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর ফের তুমুল তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। দ্রুত চারপাশের মেয়েদের দেখে নেয় সে। না, এই শেডে ঝিনুক নেই। কিন্তু প্রতিটি মেয়ের মুখই যেন ঝিনুকের মুখ।
প্রাণপণে নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে মুখে ক্ষীণ হাসি টেনে বিনয় সামনের একটি মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, আপনার কী নাম?
মুখ নামিয়ে কাঁপা গলায় মেয়েটি বলে, মালা—
মা, বাবা, ভাই, বোন?
উত্তর নেই।
দেশ ছিল কোথায়?
উত্তর নেই।
পরপর বাকি সবাইকে একই প্রশ্ন করে নামগুলোই শুধু জানা গেল। লতা, বাণী, জবা, লক্ষ্মী ইত্যাদি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের কোথায় ছিল তাদের জন্মস্থান, তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি, সে-সম্বন্ধে কেউ টু শব্দটিও করল না।
বাঁ ধারের শেডটায় চামড়ার ব্যাগ তৈরি হচ্ছিল। কয়েকজন মেশিন চালাচ্ছিল, বাকি সবাই চামড়া কেটে কেটে একধারে সাজিয়ে রাখছে।
এখানেও বিনয়কে দেখামাত্র কাজ বন্ধ হয়ে গেল। মেয়েগুলোর প্রতিক্রিয়া একই রকম। অচেনা একটা মানুষ আচমকা এসে পড়ায় অস্বস্তি, উদ্বেগ। কিছুটা বা ভয়। হরিচরণ অনেক করে বোঝালেও নাম ছাড়া মেয়েগুলোর মুখ থেকে আর কিছুই বার করা গেল না।
বিনয় লক্ষ করেছে এখানেও ঝিনুক নেই। ওরা যখন শেডটা থেকে বেরিয়ে আসছে, হঠাৎ শেডের অন্য প্রান্ত থেকে একটি মেয়ে দৌড়তে দৌড়তে চলে এল। খানিক আগেই তার সঙ্গে বিনয়ের কথা হয়েছে। নামটাও মনে আছে। আভা।
আভা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, দাদা, আপনে আমাগো দ্যাশের কথা, মা-বাপের কথা জিগাইতে আছিলেন না? পিরথিমীতে আমাগো কেও নাই, কিছু নাই। এই আশ্রমই আমাগো দ্যাশ। হরিচরণকে দেখিয়ে বলে, এনারাই আমাগো মা-বাপ
এই মেয়েরা নিজেদের পিতৃ পরিচয়, বংশ পরিচয়, জন্মস্থান, অর্থাৎ সমস্ত অতীতকে ভুলে যেতে চাইছে। হতচকিত বিনয় জিজ্ঞেস করে, কিন্তু এখানে আসার আগে কোথাও তো ছিলেন?
আছিলাম। যমের পুরীতে। যমের পুরী? হ। ফের হরিচরণকে দেখিয়ে দেয় আভা, এনারা আমাগো হেইহান থিকা উদ্ধার কইরা নিয়া আইছেন। বলেই যেভাবে এসেছিল তেমনি ছুটতে ছুটতে ফিরে গেল।
বিভ্রান্তের মতো তাকিয়ে থাকে বিনয়। তার কাঁধে একখানা হাত রেখে হরিচরণ বললেন, যমপুরীটা কী, তোমাকে পরে বুঝিয়ে দেব। আজও পীতাম্বর আর আমি সেখানে যাচ্ছি। দুপুরের খাওয়া চুকিয়েই বেরিয়ে পড়ব। তোমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। এখন চল, অফিসে ফেরা যাক
গাঢ় বিষাদে মন ভরে গিয়েছিল বিনয়ের। নীরবে কয়েক পা হাঁটার পর সে বলে, এত করে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু মেয়েগুলো স্রেফ জানিয়ে দিল তাদের মা-বাবা নেই। পাকিস্তানে কোথায় কোথায় তাদের বাড়ি ছিল তাও জানালো না। কেন বলুন তো?
বিমর্ষ মুখে হরিচরণ বললেন, ওদের বড় কষ্ট, বড় রাগ আর অভিমান
এই মেয়েদের দুঃখের যে সীমা-পরিসীমা নেই, তার কারণ আগেই জানা হয়ে গেছে। কিন্তু মা-বাবার ওপর ক্রোধ এবং অভিমানের হেতুটা কী? সাতপুরুষের ভিটেমাটি পাকিস্তানের কোন জেলায় বা গ্রামে ছিল তার নাম মুখে আনতেই বা অসুবিধাটা কোথায়?
হরিচরণ হয়তো বিনয়ের ধন্দটা আঁচ করতে পারলেন। একটু ভেবে বিশদভাবে এবার জানালেন, হোমের মেয়েদের উদ্ধার করে আনার পর বিস্তর খোঁজাখুঁজি করে রিফিউজি কলোনি কি ত্রাণশিবিরে ওদের মা-বাবার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। নিজেদের ধর্ষিতসন্তানদের দেখে আকুল কান্নায় তারা ভেঙে পড়েছে। বুক চাপড়ে কত যে বিলাপ! কত যে হাহাকার! ওই পর্যন্তই। কিন্তু একজনও তাদের মেয়েকে ফিরিয়ে নেয়নি। কারণ-লোকলজ্জা। কারণকে কী বলবে সেই ভয়। ওদের যুক্তিগুলো এইরকম। এমন মেয়েকে ঘরে তুললে আত্মীয় পরিজনেরা সম্পর্ক রাখবে না। পরিচিত লোকজন গায়ে থুতু দেবে। কেউ তো নিজের সংসারটুকু নিয়ে দ্বীপের মতো আলাদাভাবে টিকে থাকতে পারে না। সমাজে হাজারও মানুষের সঙ্গে বাস করতে হয়। তাছাড়া ওই একটা মাত্র মেয়েই তো নয়, হয়তো তাদের আরও দু-চারটে সন্তান আছে। অমন মেয়েকে ফেরত নিলে অন্যগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে? ঘেন্নায় কেউ তাদের ছোঁয়া খাবে না, তাদের ছায়া মাড়াবে না। আবর্জনার মতো ছুঁড়ে ফেলে দেবে।
