মুক্তিসংগ্রামের সময় তাদের যে অসংখ্য সহযোদ্ধারা ছিলেন, সাতচল্লিশের পনেরোই আগস্টের পর তাঁরা অনেকেই রাতারাতি বদলে গেছেন। পুরোনো লক্ষ্য, পুরোনো আদর্শ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে তারা ছুটছেন অন্যদিকে। তাদের ক্ষমতা চাই, অর্থ চাই, আরাম চাই। হাতে সময় আর নেই। আয়ুর শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন। যে কদিন বেঁচে থাকা, যতটা পার ভোগ করে নাও। দেশের জন্য অনেক কষ্ট সয়েছ। তার সামান্য দাম নেবে না?
কিন্তু হরিচরণ এবং অফিস ঘরে যে মুক্তিযোদ্ধারা রয়েছেন তারা কিন্তু অবিচলিত। কোনও প্রলোভনই তাদের বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি। পরাধীন ভারতে তাঁদের যুদ্ধটা ছিল একরকম। স্বাধীন ভারতেও তাদের লড়াই শেষ হয়নি। হাজার হাজার ধর্ষিত মেয়েকে নিজেদের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেবার জন্য তারা জীবন পণ করেছেন।
হরিচরণ একটা চেয়ারে বসে পড়েছিলেন। বলতে লাগলেন, তুমি জানো, আমি হিমাংশুদের কাছে থাকি। সকালে হোমে এসে রাত্তিরে ফিরে যাই। কিন্তু আমার এই বন্ধুরা আত্মীয়স্বজন ছেড়ে এই হোমেই মেয়েদের আগলে সারাক্ষণ পড়ে আছে।
বিনয় একদৃষ্টে স্বাধীনতা-সংগ্রামীদের দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার এগিয়ে গেল। ঝুঁকে প্রণাম করতে যাবে, লোকনাথ সাহা হাত ধরে তাকে বসিয়ে দিতে দিতে বললেন, থাক থাক। এতজনকে নিচু হয়ে প্রণাম করতে হলে কোমর ব্যথা হয়ে যাবে। বোসো
বিনয় কুণ্ঠিতভাবে হাসল।
হরিচরণ গলার স্বর উঁচুতে তুলে ডাকতে লাগলেন, দুর্গা–দুর্গা
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা পুরুষালী চেহারার শক্তসমর্থ মেয়েমানুষ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। হরিচরণ তাকে বললেন, আমাদের জন্যে চা করে আন। বিনয়কে দেখিয়ে বলেন, দুপুরে ও এখানে খাবে। ওর জন্যে চাল নিস
দুর্গা মাথা হেলিয়ে দেয়, আচ্ছা—
মেয়েরা কাজ শুরু করেছে?
হ্যাঁ—
ওদের বলিস আমরা একটু পরেই যাচ্ছি।
বলব।
দুর্গা চলে গেল।
বিনয় মোটামুটি আঁচ করে নিল, এই মেয়েমানুষটিকে হোমের রান্নাবান্না থেকে শুরু করে নানা কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
হরিচরণ এবার বিনয়কে বললেন, তুমি তো এই হোম নিয়ে লিখবে। রেণুবালা নারী মঙ্গল কেন্দ্র কীভাবে চলছে, সেটা তোমার জানা দরকার। মেঘনাদের কাছে শুনে নাও। বল হে মেঘনাদ
পকেটে নোট বই আর পেন ছিল। সেগুলো বার করে প্রস্তুত হয়ে নিল বিনয়।
বোতলের নিচের দিকের কাঁচের মতো পুরু যার চশমা, খুবই কৃশ চেহারা, সেই মেঘনাদ সিংহ বলতে শুরু করলেন। একটা বোর্ড বা পরিচালন কমিটি রয়েছে হোমের। বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হরিচরণ বসু। সেক্রেটারি লোকনাথ, সাহা। এঁদের সাহায্য করার জন্য আছেন তিনজন মেম্বার। পীতাম্বর মল্লিক, পশুপতি চট্টরাজ এবং মেঘনাদ। স্বাধীনতা-সংগ্রামীরা ছাড়াও রয়েছেন বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী। তারা হোমে থাকেন না। দরকার মতো ডাকলে নানা ধরনের কাজ করে দিয়ে যান। বহু গণ্যমান্য মানুষ বোর্ডের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্ত। যেমন কোনও কলেজের প্রিন্সিপ্যাল, নামকরা ডাক্তার, লইয়ার, বিজনেসম্যান, ইত্যাদি। কিন্তু হোম চালানো তো মুখের কথা নয়। তার জন্য প্রচুর টাকা দরকার। মূল সমস্যাটা সেখানেই। অনেক আবেদন নিবেদন করার পরও সরকারি অনুদান এখনও পাওয়া যায়নি। সবটাই চলছে করুণার ওপর। কলকাতার কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং পয়সাওলা বড়লোক অনুগ্রহ করে টাকা পাঠান। আপাতত সেটাই ভরসা। তবে এই সাহায্য যে সময়মতো নিয়মিত আসে তা কিন্তু নয়। যারা টাকা পাঠাতে ভুলে যান, দৌড়ঝাঁপ করে তাঁদের কাছে গিয়ে মনে করিয়ে দিতে হয়। মোট কথা, হোমের প্রায় এক শটি মেয়ের জীবন সরু সুতোর ওপর ঝুলছে।
টাকার কথায় হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যায় হরিচরণের। এবার বলে ওঠেন, কাল সন্ধেবেলা আমি যখন এখান থেকে যাই তখনও অ্যাডভোকেট সত্যজিৎ মিত্র আর রামকৃষ্ণ ট্রেডিং কোম্পানির ডোনেশেনের টাকাটা আসে নি। পরে কি এসেছে?
মেঘনাদ বললেন, হ্যাঁ। কাল তুমি যাবার অনেক পরে সেই রাত দশটায় লোক দিয়ে ওঁরা পাঠিয়েছেন।
কত পাওয়া গেল?
সাড়ে আট হাজার।
হরিচরণ বললেন, যাক, এখন মাসখানেকের জন্যে নিশ্চিন্ত। বিনয়কে নিয়ে আসার সময় কী দুর্ভাবনা যে হচ্ছিল। টাকাটা না এলে খুব মুশকিলে পড়ে যেতাম।
সারাটা পথ কেন হরিচরণকে অন্যমনস্ক আর চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল, এতক্ষণে বুঝতে পারল বিনয়।
পীতাম্বর মল্লিক বললেন, টাকা আসবে কি আসবে না, এলে কখন আসবে, এই নিয়ে দিনের পর দিন দুশ্চিন্তায় কাটাতে হয়। বিধান রায়ের সঙ্গে দেখা করে ইমিডিয়েটলি গ্রান্টের ব্যবস্থা না করলেই নয়।
হরিচরণ পীতাম্বরকে বললেন, হ্যাঁ। খুব তাড়াতাড়িই রাইটার্সে গিয়ে বিধানবাবুর পি এর কাছ থেকে আপয়েন্টমেন্টের ডেট নিয়ে নেব। দেখা করতেই হবে।
দুর্গা চা দিয়ে গিয়েছিল। কয়েক চুমুকে শেষ করে উঠে পড়লেন হরিচরণ।–চল বিনয়– অন্যদের বললেন, তোমরাও এস
পীতাম্বর জানালেন, হোমের হিসেবপত্তর নিয়ে তাদের বসতে হবে। নতুন নতুন অনেককে ডোনেশনের জন্য চিঠি লিখতে হবে। হরিচরণই বরং বিনয়কে নিয়ে যাক।
অফিস-ঘরের পাশ দিয়ে যে প্যাসেজটা সোজা ভেতর দিকে চলে গেছে সেটা ধরে বেশ খানিকটা যাবার পর একটা টানা বারান্দা। তারপর বাউণ্ডারিওয়াল অবধি অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। সেখানে পর পর তিনটে লম্বা ব্যারাকের মতো শেড তোলা হয়েছে। মেঝে পাকা, মাথায় অ্যাসেবেস্টসের ছাউনি। ডান ধারের শেডে অনেকগুলো মেয়ে উঁচু কিছুর ওপর বসে একটানা ঘটর ঘটর শব্দ করে কী সব করে চলেছে। মেঝেতে বসে আছে কয়েকজন। তারাও কিছু করছে। বাঁ দিকের শেডেও অনেকগুলো মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। তারাও ঘাড় গুঁজে কিছু করছে। মাঝখানের শেডটায় কেউ নেই। সেটার একপাশে বড় বড় টিনের বাক্স ডাঁই-করা। বাকি অংশটা ফাঁকা।
