রেল লাইনের ওপার থেকে সরু পিচের রাস্তা এঁকেবেঁকে সামনের দিকে চলে গেছে। সেখানে এসে হরিচরণ বললেন, এই এরিয়ায় বাস টাস খুব কম চলে। বেশি দূরে তো নয়। চল হেঁটেই যাওয়া যাক। বলে জোরে জোরে পা চালিয়ে দিলেন।
কলকাতার এই দিকটায় শহর সেভাবে দানা বাঁধেনি। দুধারে প্রচুর ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে। রয়েছে ডোবা, পানাপুকুর, সুরু খাল, ঝোপঝাড়, অজস্র গাছগাছালি। এ-সবের ফাঁকে ফাঁকে ছাড়া ছাড়া বাড়িঘর। বেশির ভাগই টিন বা টালির চালের। শ্যাওলা-ধরা সেকেলে দালানকোঠাও কিছু আছে। নতুন নতুন বাড়িও চোখে পড়ছে।
নিত্য দাস বলেছিল, পাকিস্তান থেকে যারা লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু টাকাপয়সা আনতে পেরেছে তারা অনেকেই কসবায় সস্তায় জমিটমি কিনে বাড়ি করছে। বোঝা যায়, কলকাতা এই অঞ্চলে হাত-পা ছড়াতে শুরু করেছে। ঝোপজঙ্গল খালবিলে ভরা বা তার আদ্যিকালের গেঁয়ো চেহারা নিয়ে পড়ে থাকবে না, কলকাতার অন্য সব অঞ্চলের মতো দু-চার বছরের ভেতর জমজমাট হয়ে উঠবে।
রাস্তায় নোকজন কম। তবে সারা আকাশ জুড়ে পাখি উড়ছে ঝুঁকে ঝাকে। বেলা বেড়েছে বেশ খানিকটা।
মহেশ হালদার লেন থেকে বেরুবার পর তেমন কথা টথা বলেননি হরিচরণ। প্রায় চুপচাপ। কসবার রাস্তা ধরে খানিকটা চলার পর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে? বিনয় বলল, না না–বলেই তার সঙ্গে আর-একটু জুড়ে দিল, দেশে থাকতে রাস্তায় বেরুলেই তো আর ট্রাম বাস পাওয়া যেত না। বর্ষার দিনে নৌকো, নইলে বছরের বাকি সময়টা মাইলের পর মাইল হাঁটা ছাড়া উপায় ছিল না।
বিনয়ের কথাগুলো হরিচরণ মন দিয়ে শুনলেন বলে মনে হল না। নীরবে হাঁটতে লাগলেন। বিনয় লক্ষ করেছে, সারাটা পথ কী ভাবতে ভাবতে চলেছেন হরিচরণ। কোনও কারণে কি উদ্বিগ্ন?
হরিচরণ যদিও বলেছিলেন বেশি দূরে নয়, কিন্তু প্রায় মাইল দেড়েক হাঁটার পর যেখানে এসে তিনি থামলেন সেটা বেশ বড় একটা তেতলা বাড়ি। বয়স কম করে পঞ্চাশ ষাট বছর তো হবেই। বাড়িটা ঘিরে উঁচু দেওয়াল। দেওয়ালের মাথায় ঘন করে তারকাঁটা লাগানো। রাস্তার দিকে মজবুত লোহার গেটের মাথায় টিনের ফলকে লেখা; রেণুবালা নারী মঙ্গল কেন্দ্র।
কসবার এই অংশটা বড় বেশি নির্জন। অনেক দূরে দূরে দু-চারটে বাড়ি চোখে পড়ে।
তেতলাটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে হরিচরণ বললেন, এই আমাদের হোম
সেটা আন্দাজ করে নিয়েছিল বিনয়। হোমের মেয়েদের নিরাপত্তার কারণেই যে কমপাউণ্ড ওয়াল, তারকাটা ইত্যাদি দিয়ে বাড়িটাকে দুর্ভেদ্য করে তোলা হয়েছে তাও বোঝা যাচ্ছে।
হরিচরণ এবার বললেন, বেলেঘাটার এক বড় বিজনেসম্যান, তারানাথ বিশ্বাস, হোমের জন্যে এই বাড়িটা আমাদের দান করেছেন। তারানাথের ইচ্ছে তার মা রেণুবালার নামে হোমের নামকরণ করা হোক। তাই করা হয়েছে। একটু হেসে বলেন, এত বড় একটা বাড়ি কে আর আমাদের দিত? ওঁর মায়ের নামটা থাকলে অসুবিধার কী আছে বল? উদ্দেশ্যটা তো মহৎ।
গেটের একটা পাল্লা খোলা। সেখানে টুলে বসে ছিল মস্ত চেহারার পালোয়ানমার্কা অবাঙালি দারোয়ান। খুব সম্ভব ভোজপুরি। হরিচরণকে দেখে সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ায়। নমস্তে
হাত তুলে প্রতি-নমস্কার জানিয়ে বিনয়কে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন হরিচরণ।
গেটের পর খানিকটা ফাঁকা জায়গায় কিছু ফুলের গাছ। তারপর মূল বিল্ডিং।
একতলার ডানপাশে একখানা বিরাট ঘর। দরজার মাথায় লেখা অফিস। ঘরের মাঝখানে একটা ড্রয়ারওলা সাবেকি মস্ত টেবল ঘিরে অনেকগুলো চেয়ার। একপাশের দেওয়াল ঘেঁষে সারি সারি পেল্লায় আলমারি। অন্য তিন দেওয়ালে মনীষীদের ছবি। রামমোহন। রামকৃষ্ণদেব। বিদ্যাসাগর। রবীন্দ্রনাথ। মহাত্মা গান্ধি। নেতাজি সুভাষ।
টেবলের চারধারে কয়েকজন বসে আছেন।
ওঁরা হরিচরণের সমবয়সীই হবেন। হয়তো দু-এক বছরের ছোট বা বড়। পরনে প্রায় একই ধরনের পোশাক। খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবির ওপর চাদর।
হরিচরণ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সকলে একসঙ্গে বলে ওঠেন, এসএস- বিনয়কে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই ছেলেটি বুঝি তোমার সেই রিপোর্টার?
হ্যাঁ। ওর নাম বিনয় টেবলের কাছে এসে হরিচরণ বয়স্ক মানুষগুলোর সঙ্গে বিনয়ের পরিচয় করিয়ে দিলেন। গড়পড়তা বয়স্ক বাঙালিরা যেমন হয়, ঠিক তেমনটি। ওঁরা মোট চারজন। ওঁদের মাঝারি হাইট। শ্যামবর্ণ। আলাদা করে চোখে লাগার মতো কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। এরই মধ্যে একজনই শুধু একটু বেশি লম্বা। শীর্ণ, ফ্যাকাসে মুখ। নাম পশুপতি চট্টরাজ। চোখে যাঁর সবচেয়ে পুরু লেন্সের চশমা তিনি মেঘনাদ সিংহ। যাঁর চুল ধবধবে সাদা তার নাম লোকনাথ সাহা। অন্য দুজন পীতাম্বর মল্লিক এবং মহাদেব পালিত। এঁরা প্রত্যেকেই স্বাধীনতা-সংগ্রামী। বাইরে থেকে যতই নিরীহ, সাদামাঠা দেখতে হোক না, ভেতরে রয়েছে গনগনে আগুন। দেশপ্রেমের অনির্বাণ অগ্নিশিখা। হরিচরণ আরও জানালেন, তার মতোই এরাও চিরকুমার। সেই প্রথম যৌবনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যতদিন না দেশ স্বাধীন হচ্ছে সংসারিক বন্ধনে নিজেদের জড়াবেন না। ইংরেজদের জেলে জীবনের সেরা সময়টাই তাদের ক্ষয়ে শেষ হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর যখন জেল থেকে বেরুলেন শরীর ভেঙে চুরে গেলেও মনোবল কিন্তু অটুটই রয়েছে। ভেতরের আগুন নেভেনি।
