এই চার বোর্ডারেরই বিনয় সম্পর্কে প্রচুর কৌতূহল। যখন জানতে পারল, মাত্র কিছুদিন আগে সে পাকিস্তান থেকে এসেছে তখন প্রায় হামলে পড়ল। তাদের প্রশ্নের শেষ নেই। পাকিস্তানের অবস্থা কতটা ভীতিকর? সেখানে কী ধরনের অত্যাচার চলছে? ইত্যাদি। প্রশ্নোত্তরের ফাঁকে ফাঁকে নতুন ভারত-এ বিনয়ের লেখার তারিফও চলতে লাগল।
বেড়ে লিখেছেন ভাই
রিফিউজিদের প্রবলেমগুলো খুব ভাল ফুটে উঠছে।
আলাপ যখন জমে উঠেছে সেই সময় হিমাংশু এলেন। স্বাধীনতা-সংগ্রামী হরিচরণ বসুর ভাইপো। হিমাংশুকে দেখে ঘরের সবাই, বিশেষ করে প্রসাদ ব্যস্ত হয়ে পড়েন।–আসুন, আসুন–হিমাংশু ঘরে এসে বসলে জিজ্ঞেস করেন, এই সকালবেলায়? কোনও দরকার আছে?
হিমাংশু বিনয়কে দেখিয়ে বললেন, এঁর জন্য আসতে হল। কাকা এখনই ওঁকে নিয়ে যে বলেছেন।
একটু অবাক হলেন প্রসাদ। –কেন বলুন তো?
কাকা ওঁদের হোম-এ যাচ্ছেন। বিনয়বাবুকে সেখানে নিয়ে যেতে চান। কদিন আগে এই নি। ওঁর সঙ্গে কাকার কথাও হয়েছিল।
প্রসাদ হিমাংশুকে বললেন, বিনয় নিশ্চয়ই যাবে। কখন ও ফিরতে পারবে, জানেন?
হিমাংশু বললেন, হোম থেকে কাকা ওঁকে আরও কোথায় যেন নিয়ে যাবেন। সন্ধের আর ফেরা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
প্রসাদ বিনয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে হেসে লঘু সুরে বললেন তোমার জন্যে বলরাম ঠাকু মাছের মুড়ো-টুড়ো বেঁধে রাখবে। এ-বেলা আর খাওয়া হল না। বেচারার মন খারাপ হয়ে যাতে ঠাকুরকে বলব, সব যেন রেখে দেয়। রাত্তিরে খেও
হিমাংশু বিনয়কে বললেন, আমি বসছি। আপনি রেডি হয়ে নিন—
বিনয় বলল, চান হয়ে গেছে। আমি জামা কাপড়টা পালটে আসি। সে উঠে পড়ে।
মেসের চার বোর্ডার একটু হতাশই হল। মন্মথ বললেন, আজ আর আলাপটা তেমন জমল না–
প্রসাদ বললেন, একই মেসে তো থাকছেন। পরে আবার বিনয়কে নিয়ে বসবেন। আ হরিচরণবাবুর কাছে ওর না গেলেই নয়। বিনয়কে বললেন, হোমের কাজকর্ম ভাল করে ল করবে। ওখানকার মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে যতটা সম্ভব ওদের দুঃখের হিস্ট্রি জানতে চেষ্টা কোরে তোমার কাছে এই নিয়ে একটা বড় লেখা চাই। নেক্সট উইকে দিও। আগেও প্রসাদ এ-সব বলেছে আবার মনে করিয়ে দিলেন।
.
শান্তিনিবাস-এর পর কটা ছিরিছাঁদহীন সেকেলে তেতলা। তারপর বত্রিশ নম্বর মহেশ হালদা লেন। এটাই হিমাংশুদের বাড়ি। চিরকুমার হরিচরণ এখানেই ভাইপোর ফ্যামিলির সঙ্গে থাকেন
বাড়িটা দোতলা। যথেষ্ট পুরানো হলেও খুব সম্প্রতি সারিয়ে টারিয়ে রং করা হয়েছে। রাস্তা ওপরেই সদর দরজা। সেটা ভোলা ছিল। হিমাংশুর সঙ্গে ভেতরে ঢুকতেই মৃস্ত চাতাল। সেটা ঘি সারি সারি ঘর। ঘরগুলোর সামনে দিয়ে চওড়া বারান্দা চলে গেছে। বারান্দার একধারে দোতলা ওঠার সিঁড়ি। কলকাতার আদ্যিকালের বাড়িগুলোর মতো এটারও অবিকল একই ধরনের নকশ
একতলার ডানধারে বিশাল একখানা ঘরে বিনয়কে নিয়ে গেলেন হিমাংশু। ঘরটার তিন দিকে দেওয়ালে বেশ কটা কাঁচের পাল্লা দেওয়া আলমারি আর কাঠের র্যাক। অজস্র বই আর পুরাতে খবরের কাগজে সেগুলো ঠাসা।
মাঝখানে প্রকাণ্ড ভারী খাটে পুরু তোষকের ওপর ধবধবে বিছানায় বসে ছিলেন হরিচরণ দেখামাত্রই টের পাওয়া যায়, তার চান হয়ে গেছে। পরিষ্কার জামাকাপড় পরে তিনি বেরুবার জ প্রস্তুত। তাঁর শিয়রের দিকে একটা নিচু টেবলে টেবলক্লক, ওষুধপত্তরের কটা শিশি, একটা মো ডায়েরি, কাগজ, কলম, পেনসিল ইত্যাদি টুকিটাকি জিনিস ছাড়াও আজকের দুটো বাংলা আর একৗ ইংরেজি কাগজ। যারা দেখা করতে আসে তাদের বসার জন্য খানকতক চেয়ার।
হরিচরণ বললেন, বোসো বিনয়, বোসো– বিনয় বসলে হিমাংশুকে বললেন, বউমাকে বল বিনয়কে চা-জলখাবার দিয়ে যাক।
বউমা নিশ্চয়ই হিমাংশুর স্ত্রী। বিনয় ব্যস্তভাবে বলে ওঠে, আমি খেয়ে এসেছি। এখন কি দিতে হবে না।
সারাদিন আমার সঙ্গে কাটাতে হবে। সেই দুপুরের আগে খাওয়াদাওয়া নেই। লজ্জা করে না। খেলে নিজেই কষ্ট পাবে।
লজ্জা কেন করব? বিনয় একটু হাসল।
ঠিক আছে। তাহলে বেরিয়ে পড়া যাক। খাট থেকে নেমে লাল ক্যাম্বিসের ফিতে বাঁধা হতে পরে হরিচরণ বললেন, চল
বিনয় জিজ্ঞেস করল, আপনাদের হোমটা কোথায়?
কসবায়। বালিগঞ্জ স্টেশনের ওধারে। রসা রোডে গিয়ে বালিগঞ্জের ট্রাম ধরব। বালিগঞ্জ থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
রসা রোডে এসে ট্রামে হরিচরণের পাশাপাশি বসে যেতে যেতে ঝিনুকের কথা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। হরিচরণ সেদিন জানিয়েছিলেন, নানা জায়গা থেকে ধর্ষিত মেয়েদের উদ্ধার করে এনে তাদের হোমে আশ্রয় দিয়েছেন। এমনও হতে পারে, ঝিনুক নিখোঁজ হবার পর তিনি হয়তো কোথাও তাকে পেয়ে নিয়ে এসেছেন। জিজ্ঞেসও করেছিল বিনয় কিন্তু হোমের শখানেক মেয়ের ভেতর ঝিনুক নামে কেউ আছে কি না হরিচরণ বলতে পারেননি। অতজনের নাম মনে রাখা সম্ভব নয়।
হোমে ঝিনুকের সঙ্গে দেখা হবে কি হবে না, কে জানে। যদি হয়ে যায়? বুকের ভেতর ঝড় হয়ে গেল বিনয়ের।
বালিগঞ্জ রুটের ট্রামের দৌড় বালিগঞ্জ রেল স্টেশন অবধি। গড়িমসি চালে চলতে চলতে, এক সময় সেটা সেখানে পৌঁছে গেল।
ট্রাম থেকে নেমে কপা গেলেই রেল লাইন। লাইন পেরিয়ে হরিচরণের সঙ্গে ওধারে চলে গেল বিনয়। কসবার নাম আগেই শুনেছিল সে। এদিকেই কোথাও নিত্য দাস বাড়ি কিনেছে। অনেক বার যেতেও বলেছিল কিন্তু নানা ব্যস্ততার মধ্যে যাওয়া হয়ে ওঠে নি।
