আরও কিছুক্ষণ মুকুন্দপুরে কাটিয়ে আগরপাড়া স্টেশনে চলে এল বিনয়। যুগল সঙ্গে এসেছে সে তাকে ট্রেনে তুলে দিল।
.
কলকাতার দিকে ফিরতে ফিরতে যুগলের কথা বার বার মনে পড়ছে। সে হেমনাথের হাতে সমস্ত সৌরলোক তুলে দেবার জন্য প্রস্তুত। মুকুন্দপুরে তার কথাই শেষ কথা।
সুধা বা সুনীতিরা যতই আদরযত্নে রাখার কথা বলুক, তবু সেগুলো পরের বাড়ি। কিন্তু মুকুন্দপুরের জমি হবে হেমনাথের নিজস্ব। এখানে থাকলে তার সংকোচ বোধ করার কারণ নেই।
জমি তো ঠিক হল, কিন্তু হেমনাথ কবে আসবেন, কে জানে। চকিতে রামরতন গাঙ্গুলির স্ত্রী এবং তার মেয়েদের মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আগে একদিন এসে ওঁদের জন্যও জমির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল বিনয়। কিন্তু বৃদ্ধা তার তিন মেয়েকে নিয়ে নিরুদ্দেশ। তাদের এখানে আনা যাবে কি না, জানা নেই।
.
৬৩.
আজ রবিবার। এটা বিনয়ের ছবির দিন। রোদ উঠতে না উঠতেই বাইরে বেরুবার তাড়া নেই। সপ্তাহের প্রথম ছটা দিন সকাল থেকে রাত নটা-দশটা অবধি বিস্তর খাটাখাটুনির পর শরীরে অসীম ক্লান্তি জমে আছে। বিনয় ঠিকই করে রেখেছিল, আজ শুয়ে বসে আয়েশ করে কাটিয়ে দেবে। বিকেলের দিকে শরীর ঝরঝরে লাগলে একটু বেড়িয়ে আসবে।
নিত্য দাস সেদিন বলে গিয়েছিল, সাতদিনের ভেতর হেমনাথের চিঠি এনে দেবে। সাতদিন এখনও পূর্ণ হয়নি। দাদুর জন্য দুশ্চিন্তাটা সারাক্ষণ তার মাথায় চেপে থাকে। বিকেলে ঘুরে টুরে এলে অন্তত খানিকক্ষণ অন্যমনস্ক থাকা যাবে।
খবরের কাগজে ঢোকার পর সকালে উঠে চান করাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে বিনয়ের। ছুটির দিনেও তার ব্যতিক্রম হয় না।
আজও চান টান সেরে প্রসাদের ঘরে চলে এসেছিল বিনয়। এখানে বসেই একসঙ্গে তারা চা। এবং জলখাবার খায়। খাবারের দামটা প্রসাদই দেন। আপত্তি করলে ভীষণ রেগে যান। আজকাল তাই আর এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করে না বিনয়।
প্রসাদের পাওনাদাররা অর্থাৎ উদ্বাস্তুদের রোগা রোগা ছেলেমেয়েরা তাদের বরাদ্দ রুটি-মাখন নিয়ে আগেই চলে গিয়েছিল। এখন তারা দুজনে সকালের জলখাবার খাচ্ছে।
রবিবার প্রসাদেরও সাপ্তাহিক ছুটির দিন। অফিস যেতে হবে না। ঢিলেঢালা, লঘু মেজাজে গল্প করতে করতে তারা সময় কাটাচ্ছিলেন।
গল্প আর কী। সব কথাবার্তাই অফিসকে ঘিরে। নতুন ভারত আনকোরা কাগজ হলেও এর মধ্যে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছে। সার্কুলেশন হু হু করে বাড়ছে। কাগজের মালিক জগদীশ গুহঠাকুরতা খুব খুশি। ইত্যাদি ইত্যাদি
হঠাৎ ভেতর দিকের বারান্দা থেকে একটা গলা ভেসে এল, জোহর (হাতজোড় করে নমস্কার) আইজ্ঞা—
বিনয়রা মুখ ফিরিয়ে রাঁধুনী বামুন বলরামকে দেখতে পায়। প্রসাদ বলেন, আরে ঠাকুর যে। এস এস বলরাম ভেতরে এলে জিজ্ঞেস করেন, হঠাৎ কী মনে করে? কিছু দরকার আছে?
হ্যাঁ। সেই থিপাই (জন্য) তো আসিচি
বল
বলরাম জানায়, বিনয়ের জন্য তাকে আসতে হয়েছে। প্রসাদ একটু অবাক হলেন। –বিনয়ের জন্যে কেন?
বলরাম বলল, আপন কহিথিলে বিনয়বাবু যত্ন করিবা পাই
তা তো বলেছিলাম
প্রসাদকে শেষ করতে না দিয়ে বলরাম বলে, হেলে (কিন্তু) করিবি কেমিতি? সে তো সকারে বাহারি যাউছি। মাঝরাত্রিরে ফিরি আসুছন্তি। তার খাইবা পিবার কন ভাল ব্যবস্থা করিবি?
বলরামের স্বভাবে, কথাবার্তায় একটা আপন-করা ব্যাপার আছে। বিনয় অনুভব করে, তাকে আদরযত্ন করে খাওয়াতে পারছে না, সেজন্য তার মনে যথেষ্ট দুঃখ। স্নেহপ্রবণ মানুষটিকেই আগেই ভাল লেগেছিল। এখন আরও ভাল লাগল।
প্রসাদ বললেন, আজ ছুটির দিন। বাবু বেরুবে না।
বলরামের চোখমুখ খুশির ছটায় ভরে যায়। সে বলে, সে তত ভারি ভাল কথা—
আজ বাবুকে আশ মিটিয়ে খাওয়াও। কী রান্নাবান্না হচ্ছে?
আজি রবিবার। সবু হব। ডালি, তরকারি, মাছ, মাংস।
বিনয় জানে, অন্যদিন ভীষণ তাড়াহুড়ো থাকে। বোর্ডাররা কোনওরকমে নাকেমুখে ওঁজে নটা, সাড়ে-নটার ভেতর যে যার কাজে বেরিয়ে যায়। তখন চূড়ান্ত ব্যস্ততা, তরিবত করে সাতপদ দিয়ে খাওয়ার সময় কোথায়? রবিবার বেশির ভাগ বোর্ডার তাদের দেশের বাড়িতে চলে যায়। তবে এই রবিবার সবাই মেসে থাকবে। সকলের ইচ্ছা আজ রীতিমতো ভোজের বন্দোবস্ত করা হোক।
প্রসাদ বললেন, চমৎকার—
বিনয়কে দেখিয়ে বলরাম বলল, বাবু পাঁই গোটে বড় মাছমুণ্ড (মাছের মুড়ো) রখি দেবি
খুব ভাল।
রাত্তিরে কী হবে?
পুরী আউ মাংস।
ফার্স্ট ক্লাস।
এবে যাউচি। রসুই ব্যবস্থা করিবা পাই।
বলরাম চলে যাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চারটি লোক ঘরে ঢুকল। বয়স তিরিশ থেকে পঞ্চাশের ভেতর। সবাই শান্তিনিবাস-এর বোর্ডার। নাম না জানলেও মুখগুলো বিনয়ের চেনা।
সকলে মোড়াটোড়া টেনে বসে পড়ে। একজন প্রসাদকে বলল, মেসে নতুন বোর্ডার এসেছেন। অথচ পরিচয়ই হয়নি। সেই কোন সকালে বেরিয়ে যান। ফেরেন মাঝরাত্তিরে। আজ ওঁকে পাওয়া গেছে। আলাপ করতে এলাম।
বিনয় বুঝতে পারল, লোকটা তার সম্বন্ধেই বলছে।
প্রসাদ উৎসাহের সুরে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। এক জায়গায় থাকতে হবে, আলাপ-পরিচয় না হলে কি চলে? তিনি বিনয়ের সঙ্গে চারজনের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এঁদের মধ্যে তিনজন মাঝবয়সী, একজন যুবক। টাক-মাথা গোলগাল লোকটির নাম মন্মথ সামন্ত। বার্ড কোম্পানির বড়বাবু। দেশ বর্ধমানের এক গ্রামে। মন্মথর পাশের ঢ্যাঙা, রোগা প্রৌঢ়টি হলেন নরহরি দত্ত। তার বাড়ি হুগলি জেলায়। তিনি বার্মা শেল কোম্পানির অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। নরহরির পাশের লোকটিও আধ্যবয়সী। বেশ লম্বা চওড়া। চৌকো ধরনের মুখ। নাম দ্বিজদাস মিত্র। মেটাল বক্স কোম্পানির হেড অফিসের মেজোবাবু। বাড়ি বনগাঁয়ে। চতুর্থ জন অর্থাৎ সবচেয়ে কমবয়সী যে, তার নাম নিখিল হাজরা। সানলাইফ ইন্সিওরেন্সের চাকুরে। মাথায় বাবরি চুল, ডানদিকে সিঁথি। পরনে এই সকালবেলাতেই ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর দামি জহর কোট। যুবকটি বেশ শৌখিন। নিখিলদের বাড়ি ডায়মণ্ডহারবারে।
