বিনয় বলল, পাখিকে একদম উদ্বস্ত করবে না। আমি খেয়ে এসেছি।
তার বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যাতে থমকে যায় যুগল। কয়েক পলক বিনয়কে লক্ষ করে বলে, সইত্য (সত্য) নি কন ছুটোবাবু?
আগে আগে মিথ্যে বলতে গেলে দশবার ঢোক গিলতে হতো। কিন্তু ইদানীং ঝাট এড়াবার জন্য মিথ্যেটা মসৃণভাবেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। এখন পাখি রান্না চাপালে খাওয়া দাওয়া সারতে বিকেল হয়ে যাবে। আসাম থেকে নতুন রিফিউজি নিয়ে ট্রেন আসবে দুটো আড়াইটায়। তার আগেই বিনয়কে শিয়ালদায় পৌঁছতে হবে। সে বলল, মিথ্যে বলে আমার লাভ? পেটে খিদে থাকলে নিজেরই তো কষ্ট।
কী জবাব দেবে ভেবে পাচ্ছিল না যুগল।
বিনয় এবার বলে, আশু স্যারের সঙ্গে আগে দেখা করব। তারপর তোমার সঙ্গে দরকারি কাজট সেরে কলকাতায় ফিরব। এখন চল—
কথা বলতে বলতে স্কুলে চলে এল বিনয়রা। লম্বা ক্লাস ঘরের একধারে খেলো কাঠের চেয়ারে বসে ছিলেন আশু দত্ত। তাঁর সামনে টেবল। একপাশে ব্ল্যাকবোর্ড। নিচে চটের আসন পেতে বসেছে পড়ুয়ারা। সব মিলিয়ে পঞ্চাশ-ষাটটি ছেলেমেয়ে।
বিনয়কে দেখে উঠে দাঁড়ান আশু দত্ত। অসীম বিস্ময়ে বলে ওঠেন, তুই মুকুন্দপুরে! সূর্য আত। কোনদিকে উঠেছে রে!
কাচুমাচু মুখ করে কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল বিনয়! আশু দত্ত তার আগেই আবার বনে ওঠেন, সেই যে বলে গেলি শিগগিরই আসবি, তারপর তোর আর কোনও খবরই নেই।
এ জাতীয় অনুযোগ উঠলে সবাইকে যে কৈফিয়ৎ দেয়, সেটাই পেশ করে বিনয়। অর্থাৎ অফিসে কাজের চাপে ইচ্ছা থাকলেও সময় হয় না। ইত্যাদি ইত্যাদি।
খুব কাজের মানুষ হয়ে গেছিস। বলতে বলতে হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যায় আশু দত্তর। কদি আগে এসেছিলি। কই, আমার সঙ্গে তো দেখা করে যাস নি!
ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে বিনয় বলে, স্যার, অন্যায় হয়ে গেছে। এমন তাড়া ছিল যে আপনাঃ কাছে আসতে পারি নি। একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, এখানে কেমন আছেন স্যার?
চমৎকার। মুকুন্দপুরে এসে বেঁচে গেছি। ছাত্রদের দিকে আঙুল বাড়িয়ে আশু দত্ত বলতে লাগলেন এই বাচ্চাগুলো আর কলোনিতে রাজদিয়া অঞ্চলের লোকজনকে পেয়ে সব কষ্ট ঘুচে গেছে। ওর যে কী ভাল! বিশেষ করে এই যুগলটা আবেগে তার গলার স্বর কেঁপে যায়।
এখানে কোথায় থাকেন এখন?
নিশিকান্ত আচার্য আমাকে একখানা ঘর ছেড়ে দিয়েছে। সেখানেই আছি।
বিনয় বলে, ঠাকুমাকে কি নিয়ে এসেছেন? ঠাকুমা বলতে আশু দত্তের মা।
আশু দত্ত জানালেন, যুগলরা তাদের জন্য নতুন ঘর তোলার তোড়জোড় করছে। সেটা তৈরি হয়ে গেলেই ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে সন্তোষ নাগদের বাড়ি থেকে মাকে নিয়ে আসবেন। তারপর বললে তোকে একটা খবর দিচ্ছি।
কী খবর স্যার?
আমার যে ছাত্র এডুকেশন ডিপার্টমেন্টে বড় অফিসার তার সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে গিয়ে দে করেছিলাম–তোর মনে আছে?
এই তো সেদিনের কথা। মনে থাকবে না?
সেই ছাত্র মানে শিবনাথ সেনগুপ্ত কদিন আগে এখানে এসেছিল। কথা দিয়ে গেছে স্কুলে। জন্যে গ্রান্টের ব্যবস্থা করবে।
খুব সুখবর।
আমি যদি বেঁচে থাকি, এই ছোট্ট স্কুলটাকে হাই স্কুল করব।
আপনি এক শ বছর বাঁচবেন।
আশু দত্ত হেসে হেসে বললেন, শতায়ু হতে আপত্তি নেই, যদি শরীর সুস্থ থাকে।
বিনয় আশু দত্তর মুখের দিকে পলকহীন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। শিয়ালদা স্টেশন থেকে যেদিন রাত্তিরে এই মানুষটিকে কালীঘাটে পৌঁছে দিয়েছিল সেদিনটার কথা চকিতে মনে পড়ে যায়। তখন তিনি উদ্ভ্রান্ত, শঙ্কাতুর। কিন্তু এখন? এমন পরিতৃপ্ত, উজ্জ্বল, সুখী মানুষ পৃথিবীতে কজন আছে? উৎসাহে যেন টগবগ করে ফুটছেন।
বিনয় বলল, যে জন্যে আজ এসেছি, এবার সেটা বলি। আমিও একটা খবর এনেছি। সেটা ভাল কি খারাপ বুঝতে পারছি না।
উৎসুক সুরে আশু দত্ত জিজ্ঞেস করেন, কী খবর রে?
বিনয় বলে, দাদু পাকিস্তান থেকে চলে আসছেন। কী কারণে হেমনাথকে আসতে হচ্ছে তাও সবিস্তার জানিয়ে দিল।
স্কুল-ঘরে হঠাৎ স্তব্ধতা নেমে আসে। কলোনির মেয়েরা বিনয়দের পিছু পিছু চলে এসেছিল। ক্লাসের তারা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, নীরবে।
একসময় আশু দত্ত বললেন, হেমদাদাকে আমি অনেক আগেই বলেছিলাম, পাকিস্তানে থাকতে পারবেন না। কী যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তার ঘাড়ে চেপেছিল! যাক, শেষ পর্যন্ত যে সুবুদ্ধি হয়েছে, এটা সুসংবাদ–খুবই সুসংবাদ।
বিনয় এবার যুগলের দিকে তাকায়।-এখন সমস্ত নির্ভর করছে তোমার ওপর।
বিহ্বলের মতো যুগল নিজের বুকে হাত রেখে বলে, আমার উপুর?
হ্যাঁ। দাদু দেশের সম্পত্তির কোনও ব্যবস্থাই করতে পারেননি। একেবারে খালি হাতে আসছেন। আমার ইচ্ছা মুকুন্দপুর কলোনিতে তোমরা তাকে খানিকটা জমি দাও—
বিনয়ের কথাগুলো প্রথমটা মাথায় ঢোকে না যুগলের। যা শুনল তা কি ঠিক শুনেছে? পরক্ষণে গলার শির ছিঁড়ে পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকে, হ্যামকত্তায় আমাগো এইহানে আইয়া থাকব, হ্যামকায় আমাগো কাছে থাকব উত্তেজনা, আনন্দ, তীব্র উচ্ছ্বাস, সব একাকার হয়ে ঢলের মতো বেরিয়ে আসছে তার গলা দিয়ে।
চেঁচাতে চেঁচাতে স্কুল-ঘর থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে জনতাকে লক্ষ করে যুগল বলতে থাকে, হোনছ তুমরা, হোনছ ক্যাঠা আইতে আছে। আমাগো রাইজদার হ্যামকত্ত। তেনারে আমরা মাথায় কইরা রাখুম-বলতে বলতে ফের ভেতরে ঢুকে বিনয়ের হাত ধরে টানতে টানতে স্কুল-ঘরের পেছনে নিয়ে যায়। এ ধারে, এখনও বহুদূর অবধি ঘন বনভূমি। জঙ্গলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলে, এগুলান সাফ করলে দুই-আড়াই শকানি জমিন বারাইব (বেরুবে)। এই পুরা জমিনটা হ্যামকত্তার। এইহান থিকা এক আঙ্গুল মাটিও অন্য কেওরে (কাউকে) দিমু না
