কতদিন আগে এরা চলে গেছে?
ঠিক কইতে পারুম না। আমরা আইয়া তাগো দেখি নাই। শুনাশুন কানে আইছে মাস আষ্টেক আগে হেরা গ্যাছে গিয়া।
একটু ভেবে বিনয় বলে, অন্যের বাড়িঘর দখল করলেন। তারা যদি ফিরে আসে?
অশ্বিনী মালাকারের কপাল কুঁচকে যায়। আর আইছে! যারা ডরে পলাইছে হেরা কি ফিরে? এই যে আমরা ভিটামাটি ফালাইয়া চইলা আইছি, আর কি ফিরা যামু? কিছুক্ষণ থেমে ফের বলে, আর যদিন ফিরে তো ফিরব।
তখন তো এই বাড়িটাড়ি ছেড়ে দিতে হবে।
চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে অশ্বিনীর। চোখের দৃষ্টি তীব্র, জ্বলজ্বলে। যে বিনয়ী মানুষটা এতক্ষণ নরম গলায় কথা বলছিল তাকে যেন আর চেনাই যায় না। অশ্বিনী রুক্ষ গলায় বলে, এইহান থিকা যামু কই? যদি হেরা আহে তহন দেখা যাইব। সিধা কথা কই, দুইবার রিফুজ অইতে পারুম না।
বোঝা গেল, দখল ছাড়ার আদৌ ইচ্ছা নেই অশ্বিনীদের। সহজে এখান থেকে তারা নড়বে না। খানিক চিন্তা করে বিনয় জিজ্ঞেস করে, এই গ্রামটার আগের নাম কী ছিল?
সুনাডাঙ্গা (সোনাডাঙা)।
ইদানীং যে কলোনি বা ক্যাম্পেই যায়, ঝিনুকের খোঁজ করে বিনয়। এখানেও করল। অশ্বিনী মালাকার জানালো, ওই নামে নেতাজি পল্লিতে কেউ নেই।
আগে আগে ঝিনুক নেই শুনলে হতাশায় মুহ্যমান হয়ে পড়ত বিনয়। আজকাল ধরেই নিয়েছে ঝিনুককে আর পাওয়া যাবে না। আগের মতো ততটা সে ভেঙে খান খান হয়ে যায় না। কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়ে শুধু।
খোঁজখবর সে কম করেনি। ঝিনুকের সন্ধানে সৌরলোক তোলপাড় করে ফেলেছে কিন্তু তাকে না পাওয়া গেলে সে আর কী করতে পারে?
বিনয় আর দাঁড়ায় না। লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটতে শুরু করে। একটা প্রশ্ন আচমকা তার মাথায় ঢুকে যায়। পাকিস্তান তো হিন্দুশূন্য হতে চলেছে। সোনাডাঙ্গা এবং এরকম আরও কয়েকটি জায়গায় গিয়ে তার মনে হয়েছে শেষ অবধি ইন্ডিয়া থেকেও কি সব মুসলমান চলে যাবে?
শ্যামনগর স্টেশনে এসে বিনয় সবে টিকিট কেটেছে, হুড়মুড় করে কলকাতার ট্রেন এসে গেল। সামনের একটা কামরায় সে উঠে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সিটি বাজিয়ে কয়লার ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল।
অন্যমনস্কর মতো জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল বিনয়। যতদূর চোখ যায় ছবির মতো অসংখ্য দৃশ্য। ছোট ছোট কোনও গ্রাম, খাপছাড়া কোনও শহর। কোথাও ফসলহীন ফাঁকা মাঠ, মজা খাল, বাঁশের সাঁকো, ইত্যাদি ইত্যাদি। ট্রেন ঋই ঋই আওয়াজ তুলে, চরাচর কাঁপিয়ে যত সামনের দিকে এগুচ্ছে, দৃশ্যগুলো ততই পিছু ছুটতে ছুটতে সামনে থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে।
শ্যামনগর থেকে কটা স্টেশন পেরিয়ে এসেছিল খেয়াল নেই বিনয়ের। হঠাৎ তার চোখে পড়ল ট্রেন আগরপাড়ায় এসে থেমেছে।
সকালে এই লাইনেই শ্যামনগর গিয়েছিল সে, কিন্তু তখন আগরপাড়া তার মাথায় ছিল না। এই মুহূর্তে মনে হল, মুকুন্দপুর কলোনিতে যাওয়াটা ভীষণ জরুরি। এদিকে যখন এসেই পড়েছে, আজই কাজটা সেরে নেওয়া ভাল। নইলে দু-এক দিনের ভেতর আসতেই হবে।
দ্রুত উঠে পড়ে বিনয়। প্ল্যাটফর্মে নেমে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে।
মুকুন্দপুরে যখন সে পৌঁছয় সূর্য সোজা মাথার ওপর উঠে এসেছে। এই সময়টা কলোনির বেশির ভাগ পুরুষ মানুষই থাকে বাইরে।
যুগল বিলের মাছ ধরে বেচে। বিক্রিবাটা সেরে এতক্ষণে তার চলে আসার কথা। বিনয়ের আসল কাজটা তার সঙ্গেই। আশা করা যায়, যুগলকে এখন পাওয়া যাবে।
ভর দুপুরে কলোনির মাঝখানের চত্বরে একেবারে মেলা বসে যায়। রান্নাবান্না এবং গেরস্থালির নানা কাজকর্ম সেরে এখানকার বউ-ঝিরা থোকায় থোকায় বসে গল্প টল্প করে সেই বিকেল পর্যন্ত কাটিয়ে দেয়। সারাদিন ব্যস্ততার মধ্যে এটুকুই তাদের ফুরসত। আজও তাদের দেখা গেল। সেই সঙ্গে কচি-কাঁচা বাচ্চা এবং বুড়োবুড়িদেরও।
যে ছেলেমেয়েগুলোর বয়স পাঁচ থেকে দশ বারোর ভেতর তাদের দেখা যাচ্ছে না। দূরে বনজঙ্গল কেটে যে টিনের চালের স্কুল বসানো হয়েছে সেখান থেকে তাদের কলকলানি ভেসে আসছে। খুব সম্ভব: সুর করে কিছু পড়ছে। নামতা কিংবা পাঠ্য বইয়ের কোনও পদ্য। শব্দটা গুঞ্জনের মতো শোনাচ্ছে। আশু দত্তর ছাত্র ওরা।
খুব ভাল লাগল বিনয়ের। সৃষ্টিছাড়া এক জবরদখল কলোনিতে টিনের চালের অকিঞ্চিৎকর এক স্কুল নিয়ে মগ্ন হয়ে আছেন আশু দত্ত। জীবনের শেষ পর্বে নতুন করে মানুষ গড়ার কাজে তিনি হাত লাগিয়েছেন।
বিনয় চত্বরের মাঝামাঝি চলে এসেছিল। যুগলই তাকে প্রথম দেখতে পেল। খাওয়া দাওয়া চুকিয়ে একধারে একটা পুরানো তেলচিটে পাটিতে শরীর এলিয়ে দিয়ে সে শুয়ে ছিল। সেই ভোরে বিলের। মাছ ধরে দমদমের বাজারে সেই মাছ বেচে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। চান করার পর পেটে ভাত পড়তেই দুচোখ জুড়ে আসছিল তার।
বিনয়কে দেখে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে যুগল। দৌড়ে কাছে চলে আসে। সবিস্ময়ে বলে, আপনে, ছুটোবাবু! হেইদিনও আত (হঠাৎ) আইছিলেন, আইজও আইলেন। আগাম জানান নাই তো?
বিনয় বলল, হঠাৎ একটা বিশেষ দরকারে আসতে হয়েছে। আগে জানাবার মতো সময় পাই নি।
ততক্ষণে নানা বয়সের মেয়েরা, কিশোরী যুবতী থেকে আধবয়সী গিন্নিবান্নি-উঠে পড়েছে। বিনয় আসায় সবাই খুব খুশি। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে।ছুটোবাবু আইছে, ছুটোবাবু আইছে
মেয়েদের মধ্যে পাখিও রয়েছে। যুগল তাকে হইহই করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে হাত তুলে থামিয়ে দেয় বিনয়। সে জানে যুগল কী কী করবে। তার জন্য এখনই পাখিকে রান্না চড়াতে বলবে, নিজে জাল নিয়ে বিলে চলে যাবে। তার ছুটোবাবুকে সেরা তেলালো রুই কি কাতলা ছাড়া কি খাওয়ানো যায়?
