এখন আর নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত নেই। সকালে উঠে চটপট স্নান সেরে, চা খেয়ে যাদবপুর, বাঁশদ্রোণী কিংবা বেহালার কোনও কলোনি কি রিলিফ ক্যাম্প ঘুরে সে ছোটে শিয়ালদায়। কোনও দিন দুপুরে, কোনওদিন বা বিকেলের ট্রেনে আসাম থেকে তাড়া খাওয়া নতুন ইহুদিরা আসে। এর ওপর পূর্ব পাকিস্তান থেকে রিফিউজি স্পেশাল বোঝাই হয়ে উদ্বাস্তু আসা তো আছেই। সন্ধের পর পর তাদের ট্রেন আসে। নানা তথ্য জোগাড় করে অফিসে ফিরে চটপট তিনটে লেখা তৈরি করে প্রসাদের হাতে দিয়ে মেসে ফিরতে ফিরতে দশটা সাড়ে-দশটা হয়ে যায়। দুপুরে বেশির ভাগ দিনই পেটে ভাত পড়ে না। হোটেলে যে খাবে সময় কোথায়? মুড়ি কি পাউরুটি চিবিয়ে কোনও রকমে খিদে মেটাতে হয়।
এদিকে খবর পাওয়া গেছে, ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় আসাম গভর্নমেন্টকে অনুরোধ জানিয়েছেন, আসাম থেকে উদ্বাস্তুদের ঢল যেন পশ্চিমবঙ্গের দিকে আর না আসে। অবিলম্বে এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গ এমনিতেই উদ্বাস্তু সমস্যায় ডুবে আছে। প্রতিদিন পূর্ব পাকিস্তান থেকে হাজার হাজার শরণার্থী এই রাজ্যে ঢুকছে, তার ওপর ইদানীং আসাম থেকেও ক্রমাগত আসতে থাকায় সমস্যাটা এমন বিপুল আকার নিয়েছে যে নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। এখানকার সামাজিক আর অর্থনৈতিক পরিকাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। নতুন করে জনসংখ্যার চাপ নেবার ক্ষমতা আর নেই।
বিধান রায়ের অনুরোধে কতটা কাজ হবে, বোঝা যাচ্ছে না। আসামের উদ্বাস্তুদের আসা। যতদিন না বন্ধ হচ্ছে, বিনয়কে সেই দুপুর থেকে শিয়ালদায় হাজিরা দিয়ে যেতে হবে।
সকালে চোখ মেলার পর থেকে ব্যস্ততা, এত অজস্র কাজে জড়িয়ে থাকা, তবু তারই মধ্যে পাষাণভারের মতো একটি চিন্তা সারাক্ষণ মাথায় চেপে থাকে-হেমনাথ। সবাই জানে নিত্য দাস লোকটা সুবিধার নয়। চতুর, স্বার্থপর, ফিকিরবাজ। কিন্তু তার একটা বড় গুণ, কথা দিলে কথা রাখে। সে বলেছিল, সাত দিনের ভেতর পাকিস্তান থেকে হেমনাথের চিঠি এনে দেবে। সেই ভরসাতেই রয়েছে বিনয়।
প্রসাদ প্রথম দিকে বিনয়কে বলেছিলেন, সে যেন কলকাতায় দক্ষিণ শহরতলি বা ওদিকেই শহরতলি ছাড়িয়ে গ্রামের দিকে যে-সব জবরদখল কলোনি বসানো হয়েছে সেগুলো নিয়েই লেখে। পরে জানিয়েছেন বিনয় তার ইচ্ছামতো উত্তর এবং পুবদিকের কলোনিগুলো নিয়েও লিখতে পারে।
.
আজ সকালে শিয়ালদা থেকে শ্যামনগরে নেমে মাইল দেড়েক হেঁটে যে কলোনিটায় সে পৌঁছল তার নাম নেতাজি পল্লি। সারা ভারতে নেতাজি বলতে একজনই, সুভাষচন্দ্র বসু। তার নামেই কলোনির নাম।
নতুন ভারত-এ চাকরি নেবার পর বহু কলোনিতেই গেছে বিনয়। কিন্তু এটা আলাদা ধরনের। বোঝা যায় এখানে পরিত্যক্ত একটা গ্রাম ছিল। গ্রামটার আশি ভাগ দখল করে বাড়িঘর একটু সরিয়ে সুরিয়ে উদ্বাস্তুরা বসে পড়েছে। বাকি ঘরগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। সেগুলোতে তালা লাগানো।
এটা কাদের গ্রাম ছিল, বোঝা যাচ্ছে না। এমন কলোনি আগে কখনও দেখেনি বিনয়। উদ্বাস্তুরা এমনিতে ফাঁকা জায়গায় ঝোপঝাড় নির্মূল করে, জলাটলা বুজিয়ে বসতি বানায়। কিন্তু আগেকার কোনও গ্রামের লোকজন তাড়িয়ে চেপে বসেছে, এমনটা তার জানা নেই। এ নিয়ে তার রীতিমতো কৌতূহল হচ্ছিল।
নেতাজি পল্লির মাতব্বর বা নেতা গোছের লোকটির নাম অশ্বিনী মালাকার। বয়স পঞ্চাশ পঞ্চান্ন। রোগা, পাকানো চেহারা। বেশ বিনয়ী। বিনয় খবরের কাগজ থেকে আসছে শুনে খুব যত্ন করে কলোনিটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিল।
কীভাবে তারা এখানে বসতি গড়ে তুলেছে সেই ইতিহাসটাও জানিয়ে দিল। তারা আগে ছিল দমদমের এক ত্রাণশিবিরে। দুবেলা খেতে পাওয়া যেত ঠিকই। কিন্তু খাওয়াই তো শেষ কথা নয়। আশা নেই, ভবিষ্যৎ নেই–এভাবে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তারা খবর পাচ্ছিল, কলকাতার চারপাশে তো বটেই, পশ্চিম বাংলার জেলায় জেলায় উদ্বাস্তুরা সরকারের ভরসায় না থেকে নতুন নতুন কলোনি বসিয়ে নিজেদের মতো বাঁচার চেষ্টা করছে। তারাও ফাঁকা জায়গার সন্ধানে ছিল। এখানে একটা পোড়ো গ্রামের খোঁজ পেয়ে রাতারাতি এসে পড়েছে।
বিনয়ের সঙ্গে অশ্বিনীকে কথা বলতে দেখে নেতাজি পল্লির প্রচুর মেয়েপুরুষ, বাচ্চাকাচ্চা কিশোর-কিশোরী তাদের চারপাশে জড়ো হয়েছিল। যেমনটা অন্য কলোনিতে দেখা গেছে, এখানেও তার হেরফের হয়নি। নেতাজি পল্লির অন্য বাসিন্দারা গভীর আগ্রহে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
এখানে যারা বাস করছে অশ্বিনী মালাকার তাদের সম্বন্ধেও নানা তথ্য জানিয়ে দিল। সব মিলিয়ে প্রায় সাত শ জন।
কুমোর কামার তাঁতি বারুই-এমনি নানা জাতের মানুষ। দেশে থাকতে যে যার কৌলিক কাজকর্ম করত। জন্মভূমির থেকে উৎখাত হয়ে আসার পর এখানে কেউ দিনমজুর। কেউ হকার। কেউ মুটেগিরি করে পেট চালায়।
নতুন কিছু নয়। অন্য কলোনিগুলোর বাসিন্দারাও এইভাবেই টিকে আছে।
সেই কৌতূহলটা সমানে খোঁচা মারছিল। বিনয় একসময় বলেই ফেলে, বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় আপনারা আসার আগে এখানে একটা গ্রাম ছিল। সেটা
বিনয়ের কথার মাঝখানেই অশ্বিনী বলে ওঠে, হ, আছিল তো। মুসলমানগো গেরাম
তারা গেল কোথায়?
ঘরে তালা লাগাইয়া বেবাকটি পাকিস্থানে গ্যাছে গিয়া। জনমনিষ্যি নাই, গেরাম ফাঁকা পাইয়া আমরা ঢুইকা পড়লাম। নূতন কইরা ঘর বানানের খাটনিটা বাচছে।
