কাগজ কলম এলে মুখে মুখে দ্বারিক দত্ত বলতে লাগলেন। বিনু লেখা শুরু করলঃ
পরম পূজনীয়েষু,
দাদু, আপনার চিঠি পাইয়া আমরা ভীষণ চিন্তিত হইয়া পড়িয়াছি। রাজদিয়ার ওই আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে আপনাদের পক্ষে এক মুহূর্তও থাকা ঠিক হইবে না। মোতাহার সাহেব আর করিমদের উপর বাড়িঘরের ভার দিয়া দলিলপত্র লইয়া ঢাকা হইয়া প্লেনে কলিকাতায় চলিয়া আসুন। ইহা ছাড়া বাঁচিবার অন্য কোনও পথ নাই।
আমরা জানি, মোতাহার সাহেব, করিম এবং অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষী যাঁহারা আছেন, আপনারা চলিয়া আসিলে সকলেই ভীষণ কষ্ট পাইবেন। যাহাতে না আসেন, সেজন্য বাধাও দিবেন। কিন্তু তাহারা অবুঝ নন, ভাল করিয়া বুঝাইলে অবশ্যই বুঝিবেন।
শাজাহান সাহেবের সহিত কাজটি হয় নাই। সাক্ষাতে কারণ জানাইব। যাহা হউক, বড় মাপের সম্পত্তি একচেঞ্জ করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আপনি দলিলপত্র লইয়া আসিলে এখানে থাকিয়া, দেখিয়া শুনিয়া প্রপার্টি বিনিময় করিতে পারিবেন।
আমরা যেখানে আছি সেখানে আপনারা দয়া করিয়া থাকিলে ধন্য হইব। আপনাদের মর্যাদা কোনও ভাবেই ক্ষুণ্ণ হইবে না। আপনাদের শেষের দিনগুলি যাহাতে আনন্দে এবং মাধুর্যে পূর্ণ হয় সেদিকে সর্বদা আমাদের লক্ষ থাকিবে।
আপনি ঝিনুক সম্পর্কে জানিতে চাহিয়াছেন। সে ভাল আছে। পুরাতন দুঃখের…
বিনয় চমকে ওঠে। লেখা থামিয়ে দ্বারিক দত্তকে বলে, এ-সব লিখতে বলছেন কেন? ঝিনুকের কী হয়েছে, আপনি তো সবই জানেন। বুড়ো মানুষগুলোকে ডাহা মিথ্যে–
তার কথার মাঝখানেই দ্বারিক বলে ওঠেন, হেমদাদারা প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার ওপর ঝিনুকের আসল খবরটা পেলে তাদের মানসিক অবস্থাটা কী দাঁড়াবে, ভাবতে পার? এমন অনেক মিথ্যে আছে যা সত্যের থেকেও অনেক বেশি জরুরি। সত্যের সঙ্গে মিথ্যে মিশিয়েই সংসারে চলতে হয়।
বিনয়ের মন এতে পুরোপুরি সায় দিচ্ছে না। অদৃশ্য কাটার মতো অস্বস্তি তাকে খোঁচা দিয়ে চলেছে। সে বলে, কিন্তু দাদুরা কলকাতায় এসে যখন সব জানতে পারবেন?
আগে হেমদাদাদের বিপদটা তো কাটুক। কলকাতায় এলে ওঁদের সব বুঝিয়ে বলা যাবে।
ভীষণ শক পাবেন।
যাকে সেই ছেলেবেলা থেকে বুকে, করে বড় করে তুলেছেন সে নিখোঁজ হয়ে গেছে। শক পাবে না? কিন্তু যা ঘটেছে তাতে তোমার বা আমার কারও হাত নেই। সবই ভবিতব্য।
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়। বয়স তার তেমন কিছু বেশি হয়নি। কিন্তু এর মধ্যে কত কিছুই না। চোখের সামনে ঘটতে দেখল! দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, আগুন, ধর্ষণ, গণহত্যা, স্বাধীনতা, দেশভাগ, লক্ষ লক্ষ মানুষের সর্বস্ব খুইয়ে সীমান্তের এপারে চলে আসা। রাতারাতি কত মানুষ আগাগোড়া বদলে গেল। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পর পর এত সব ঘটে গেছে যার ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই।
দ্বারিক দত্ত বললেন, নাও, বাকিটা শেষ করে ফেল—
বিনয় নতুন করে লিখতে শুরু করে,
…..পুরাতত দুঃস্বপ্নের স্মৃতি ভুলিয়া অনেকটাই স্বাভাবিক হইয়া উঠিয়াছে।
নিত্য দাসের যে লোক এই পত্র লইয়া যাইতেছে, তাহাকে অপেক্ষা করিতে বলিয়া তৎক্ষণাৎ উত্তর দিবেন। কবে আসিতেছেন, বিস্তারিত জানাইবেন। আমরা দমদম এয়ারপোর্টে গিয়া অপেক্ষা করিব।
আপনারা আমাদের প্রণাম লইবেন। ইতি–
ইতির নিচে বিনয়রা একে একে পাঁচজন সই করল। তারপর চিঠিটা ভাজ করে খামের ভেতর পুরে আঠা দিয়ে মুখ আটকে দিল।
দ্বারিক দত্ত এবার নিত্য দাসের দিকে তাকান। –এই চিঠিটা কত তাড়াতাড়ি হেমদাদার কাছে পৌঁছে দিতে পারবি?
মনে মনে হিসেব করে নিত্য দাস বলল, আপনেগো একহান চিঠি তো না, আরও ম্যালা চিঠি জুটাইয়া পাকিস্থানে পাঠামু। তা ধরেন, রাইজদায় পৌঁছাইতে দিন আষ্টেক তো লাগব।
দ্বারিক দত্ত বললেন, চিঠি পৌঁছতে আট দিন, জবাব আসতে আট দিন। আটে আটে ষোল দিন। না না, অত দেরি করা যাবে না।
বিনয় বলল, অন্য চিঠি থাক। আমাদের চিঠিটা নিয়ে আপনার লোক সোজা দাদুর কাছে যেন চলে যায়। এক সপ্তাহের মধ্যে দাদুর উত্তর চাই। অন্য চিঠি না নেবার জন্যে আপনার যা ক্ষতি হবে, আমরা তা পুষিয়ে দেব।
নিত্য দাস বলল, ঠিক আছে, এক হপ্তার মইদ্যেই হ্যামকত্তার পত্র আইনা দিমু–
কত দিতে হবে বলুন
হেই হগল হিসাব-কিতাব পরে অইব। আগে তো পত্র আনি। ম্যালা রাইত অইছে। আপনেগো পত্রখান দ্যান
চিঠি নিয়ে নিত্য দাস চলে গেল।
রাজদিয়া থেকে কী উত্তর আসে তার জন্য বিনয়রা এখন দিন গুনতে থাকবে।
.
নিত্য দাস চলে যাবার পর বিনয় মেসে ফিরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সুধারা তাকে এবং সুনীতিদের রাতের খাওয়া না খাইয়ে ছাড়েনি। খাওয়া দাওয়া চুকলে বড় রাস্তায় এসে একটা ট্যাক্সিতে আনন্দরা তাদের সঙ্গে বিনয়কে তুলে নিয়ে ভবানীপুরে শান্তিনিবাস-এর সামনে নামিয়ে দিয়ে বিডন স্ট্রিটে চলে যায়।
পরদিন থেকে ফের তার দৈনন্দিন রুটিনে ফিরে গেল বিনয়।
ত্রাণশিবির আর জবরদখল কলোনিগুলো নিয়ে যে-সব লেখা অফিসে জমা দেওয়া ছিল, তার বেশির ভাগটাই ছাপা হয়ে গেছে। বিনয়ের এই দুটো কলাম দেশভাগ! নানা ঘটনা, নানা মানুষ আর শরণার্থীদের ত্রাণশিবিরে এবং জবরদখল কলোনিতে এমনই জনপ্রিয় যে একদিনের জন্যও বন্ধ করা যাবে না। হাজার হাজার পাঠক, বিশেষ করে উদ্বাস্তুরা, এর জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। তাছাড়া, সরকারেরও এই কলাম দুটো সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ। রিলিফ অ্যাণ্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্ট এগুলো থেকে প্রচুর তথ্য পায়। তাই প্রসাদ তাড়া দিয়েছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আরও কটা লেখা তৈরি করে বিনয় যেন তাকে দেয়।
