বিনয় বলল, দাদু কী লিখেছেন, আপনি তো জানেন। অত সময় কোনওভাবেই দেওয়া যাবে না।
আনন্দ এতক্ষণ চুপচাপ শুনে যাচ্ছি। এবার বলল, আমি একটা কথা বলছি। তোমরা ভেবে দেখ, সেটা সম্ভব কি না–
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সবাই আনন্দর দিকে তাকায়।
আনন্দ বলতে থাকে, কবে প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ হবে, সেই আশায় রাজদিয়ায় বসে না থেকে দাদু। দুই দিদাকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসুন
দ্বারিক দত্ত সায় দিয়ে বললেন, এটা তুমি ঠিক বলেছ। মাথার ওপর এত বড় বিপদ। ওদের আর দেশের বাড়িতে পড়ে থাকা উচিত নয়। সম্পত্তির চেয়ে প্রাণের দাম অনেক বেশি।
বিনয় বলল, কিন্তু
কী?
দাদু চলে না হয় এলেন। কিন্তু রাজদিয়ার বাড়ি আর জমিজমার কী ব্যবস্থা হবে?
হেমদাদা তো লিখেছে, করিম তাদের বাড়িতে থেকে পাহারা দিচ্ছে। মোতাহার আর সৈয়দ বাড়ি মৃধাবাড়ির ছেলেরা রোজ এসে দেখাশোনা করে যায়। ওদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে আসবে। দ্বারিক দত্ত বলতে লাগলেন, জগতে করিম কি মোতাহারদের মতো সৎ মানুষ হয় না। প্রাণ দিয়ে ওরা হেমদাদার প্রপার্টি রক্ষা করবে।
বিনয় জানিয়ে দিল, এই ব্যাপারে দ্বারিক দত্তর সঙ্গে সে সম্পূর্ণ একমত। করিমদের মোতাহারদের সেই কবে থেকে দেখে আসছে। বিশ্বাসভঙ্গ তারা কখনও করবে না।
দ্বারিক দত্ত বললেন, পরে পাকিস্তানের পরিস্থিতি বদলে গেলে রাজদিয়ায় ফিরে হোমদাদা বিষয় আশয়ের ব্যবস্থা করবে।
পাকিস্তানের পরিস্থিতির আদৌ পরিবর্তন হবে কি না, হলে কবে হবে, সে সম্পর্কে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে বিনয়ের। কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে, হিন্দুদের ছেড়ে আসা যাবতীয় জমিজমা বাড়িঘর পাকিস্তান সরকার শত্রু-সম্পত্তি বলে ঘোষণা করবে। তা হলে তো সবই গেল। এ নিয়ে কোনও মন্তব্য না করে সে বলে, ঠিক আছে, করিমদের হাতেই না হয় প্রপার্টি দেখেশুনে রাখার দায়িত্ব দিয়ে এলেন, কিন্তু কলকাতায় এসে উঠবেন কোথায়?
সুধা গলার স্বর চড়িয়ে চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, কোথায় উঠবে মানে? আমরা কি মরে গেছি? লোকের আত্মীয়স্বজন থাকে কী করতে? একদমে সে বলে যায়, এক্সচেঞ্জ করে আমরা অত বড় তিনতলা বাড়ি পেয়েছি। সেখানে কতগুলো ঘর। দাদুরা ওখানেই উঠবেন।
সুনীতি নরম ধাতের ঠাণ্ডা মানুষ। সবসময় নিচু গলায় কথা বলে। সেও হইচই বাধিয়ে দিল। তাদেরও বিরাট বাড়ি। অনেক ঘর ফাঁকা পড়ে আছে। হেমনাথরা স্বচ্ছন্দে তাদের কাছে গিয়েও থাকতে পারবেন।
দুই বোনের স্বামীরা অর্থাৎ হিরণ এবং আনন্দ তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে গলা মেলায়। দুজনেই বলে, হেমনাথরা তাদের বাড়িতে উঠলে পরম সমাদরে, সসম্মানে থাকবেন।
দ্বারিক দও হাত তুলে সুধাদের থামান। বলেন, জানি, হেমদাদারা এলে তোমরা মাথায় করে রাখবে। বলি কি, কোনও এক জায়গায় ওদের থাকার দরকার নেই। একজনের কাছে থাকলে আর-একজনের মন খারাপ হয়ে যাবে। তার চেয়ে ভাগাভাগি করে থাকাই ভাল। কিছুদিন সুধার কাছে, কিছুদিন সুনীতির কাছে।
দ্বারিক দত্ত যেভাবে সমস্যাটার সুরাহা করে দিলেন সেটা সবার মনঃপূত হল। সুধারা তক্ষুনি তা মেনে নেয়।
বিনয় কিন্তু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে, উঁহু
ঘরের সকলে তার দিক চোখ ফেরায়। সুধা একটু অসহিষ্ণু ভাবে জিজ্ঞেস করে, উঁহু মানে?
বিনয় বলে, দাদুকে তো আমি জানি। প্রচণ্ড আত্মসম্মান বোধ। উনি শেষ জীবনে কারও আশ্রয়ে এসে থাকতে রাজি হবেন বলে মনে হয় না। একটু ভেবে ফের বলল, প্রপার্টি এক্সচেঞ্জের জন্যে তিনি যে অস্থির হয়ে উঠেছেন তার কারণ একটাই। ইণ্ডিয়ায় এলে কারও গলগ্রহ হতে হবে না। নিজের নতুন বাড়িতেই থাকতে পারবেন।
সুধা ঝাঁঝালো স্বরে বলে, এটা কি একটা কাজের কথা হল! কবে জমিজমা এক্সচেঞ্জ করে ইণ্ডিয়ায় নিজের বাড়িঘর হবে সেই আশায় রাজদিয়ায় পড়ে থাকলে চলে?
বিনয়ের মাথায় বিদ্যুৎচমকের মতো নতুন একটা চিন্তা খেলে যায়। কী আশ্চর্য, কেন যে এই কথাটা আগে সে ভাবেনি! বলল, মুকুন্দপুর কলোনিতে, মানে যুগলদের ওখানে প্রচুর জমি আছে। দাদু সেখানে গেলে যুগলরা কী খুশিই যে হবে! যত জমি চান পেয়ে যাবেন। মুকুন্দপুর আর-একটা রাজদিয়া হয়ে উঠছে। সেখানকার বাসিন্দারা সবাই চেনাজানা, দেশের মানুষ। খুব ভাল লাগবে দাদুর। মনে হবে, অচেনা অন্য দেশে নয়, নতুন এক রাজদিয়াতেই চলে এসেছেন।
একটু চুপচাপ।
তারপর দ্বারিক দত্ত বললেন, কোথায় থাকলে হেমদাদার আত্মসম্মানে বাধবে না, সে-সব পরে চিন্তা করা যাবে। এখন যা সবচেয়ে জরুরি তা হল হেমদাদা, বউ ঠাকরুন আর শিবানীকে এখানে। নিয়ে আসা।
দ্বারিক যা বলেছেন তার ষোল আনা ঠিক। যাঁরা এখানে এসে পৌঁছায়নি তাদের থাকার জন্য সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ হেমনাথদের আসাটা যে সবার আগে প্রয়োজন, কথায় কথায় সেই প্রসঙ্গটা থেকে সবাই দূরে সরে গেছে। আবার তারা মূল জায়গায় ফিরে আসে।
হিরণ জিজ্ঞেস করল, এক্সচেঞ্জের ব্যাপারটা আপাতত ভেস্তে গেছে। এই অবস্থায় ওঁদের কীভাবে আনা যায়, আপনি কিছু বলতে পারেন?
পারি।
অপার আগ্রহে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকে বিনয়রা।
দ্বারিক দত্ত বললেন, তোমরা তিন নাতি-নাতনি আর দুই নাতিন জামাই, পাঁচজনে মিলে একখানা পত্র লেখ। চিঠির বয়ান কী হবে সেটা আমি বলে দিচ্ছি। সুধা কাগজ কলম খাম এনে বিনুকে দাও। ও লিখুক–
