বিনয় বলল, না না, আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।
হিরণ আপত্তিটা কানে তুলল না। একরকম জোর করে বিনয়কে টেনে নিয়ে খাইয়ে আনল।
.
বিকেলে টালিগঞ্জে এসে বিনয়রা দেখল, এর মধ্যে আনন্দ এবং সুনীতি পৌঁছে গেছে। দোতলার বসার ঘরে তাদের মুখোমুখি বসে আছে সুধা আর দ্বারিক দত্ত। বিনয়রাও সেখানেই বসে পড়ল।
বিনয় যে তাদের বাড়ি যায় না, সে জন্য ভীষণ দুঃখ সুনীতির, প্রচুর অভিমান। কিন্তু এ-সব নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করল না সে। মেসে কীভাবে বিনয়ের দিন কাটছে, সে ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছে কি না, শরীরের ওপর কতটা যত্ন নিচ্ছে এ-সব নিয়ে কিছুই জানতে চাইল না সুধা।
আজ আলোচনার বিষয় একজনই। সকলের দুশ্চিন্তা এবং উৎকণ্ঠার কেন্দ্রে একমাত্র হেমনাথ।
সন্ধে যখন নামতে শুরু করেছে, কুয়াশায় এবং আঁধারে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে মহানগর, সেইসময় বাইরে থেকে নিত্য দাসের ডাক শোনা গেল, ছুটোবাবু-ছুটোবাবু
এ-বাড়িতে এসে কেউ নিচে থেকে ডাকাডাকি করলে উমা গিয়ে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু আজ সে যাবার আগেই বসার ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল বিনয়। নিত্য দাসের জন্য তারা সেই বিকেল থেকে প্রায় রুদ্ধশাসে অপেক্ষা করছে। সবাই জানে লোকটা ভীষণ ধূর্ত, ধড়িবাজ। কিন্তু হেমনাথের ভবিষ্যৎ রয়েছে তার মুঠোয়। যতই তাকে অপছন্দ করুক, নিত্যই এই মুহূর্তে ত্রাণকর্তা।
একসঙ্গে দুটো করে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে একতলায় এসে দরজা খুলে দেয় বিনয়। তার মধ্যে এখন কত রকমের যে অনুভূতি চলছে! আশা, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা, কাঁপুনি। একটার সঙ্গে আর-একটা লেপটে আছে। ব্যগ্র গলায় সে জিজ্ঞেস করে, কাজ হল?
নিত্য দাস বলে, আগে ভিতরে চলেন। হগল কমু
বিনয় লজ্জা পায়। নিজের চিন্তাতেই সে ডুবে আছে। একটা লোক তাদের জন্য যে সেই সকাল থেকে ছোটাছুটি করছে তার কষ্টের কথা খেয়ালই নেই। সৌজন্য বোধটাই তার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। বিব্রতভাবে বলল, আসুন, আসুন–
নিত্য দাসকে নিয়ে দোতলায় উঠে আসে বিনয়। তাকে একটা লোক চেয়ারে বসতে বলে নিজেও বসে পড়ে। লক্ষ করে, ঘরের বাকি সবার চোখ নিত্যর ওপর স্থির হয়ে আছে। প্রত্যেকেই ভীষণ উদগ্রীব।
নিত্য আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে।–না, অইল না। অ্যাতখানি পথ যাওন-আহনই সার। তার, চোখমুখে, গলার স্বরে নৈরাশ্য ফুটে বেরোয়।
কেউ কোনও প্রশ্ন করে না। বজবজ থেকে নিত্য দাস যে খালি হাতে ফিরে এসেছে তা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে সে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর নিত্য সবিস্তার তার অভিযানের বিবরণ দিয়ে গেল। বেকবাগান থেকে শিয়ালদায় যেতেই বজবজের ট্রেন পেয়ে গিয়েছিল। মনসুর হোসেনের বাড়িতে সাড়ে এগারোটায় পৌঁছেও যায়, কিন্তু তিনি ছিলেন না। শোনা গেল, পারিবারিক কাজে সকালে বেরিয়ে গেছেন। অগত্যা তার জন্য বসে থাকা ছাড়া গতি ছিল না।
মনসুর হোসেন ফিরলেন দেড়টা নাগাদ। নিত্য দাসের আশঙ্কা ছিল, পুরো একটি মাস যোগাযোগ নেই। এর মধ্যে জমিজমা এচ্চেঞ্জ হয়ে গেছে কি না। কিন্তু মনসুর হোসেন একেবারে ভিন্ন সুর। ধরলেন। তিনি ইন্ডিয়াতেই থেকে যাবেন।
নিত্য দাস হতবাক। মাসখানেক আগে যখন মনসুর হোসেনের সঙ্গে তার কথা হয় তখন তিনি ভীষণ এস্ত। আতঙ্কে কাঁপছেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইন্ডিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে পাকিস্তানে চলে যেতে চান। নিত্য যেন রাতারাতি খদ্দের জোগাড় করে তার সম্পত্তির বিনিময় বা বিক্রির বন্দোবস্ত করে দেয়।
সেই বিপন্ন, ভয়ার্ত মানুষটি আজ আদ্যোপান্ত অন্যরকম। পরম নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছিল তাকে। চিন্তাভাবনা বা আতঙ্কের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই।
সিদ্ধান্ত বদল করে হঠাৎ কেন মনসুর হোসেন ইন্ডিয়াতেই থেকে যেতে চাইছেন, কথায় কথায় তাও জানালেন। পাকিস্তানে যে ধরনের মারাত্মক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, বিষবাষ্পে ছেয়ে গেছে আবহাওয়া, এখানে বিশেষ করে বজবজ অঞ্চলে তার শত ভাগের এক ভাগও তেমনটা হয়নি। চাপা উত্তেজনা কি নেই? নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সশস্ত্র হানগরেরা দল বেঁধে তাঁদের ওপর হামলা চালায়নি। ইন্ডিয়া ছেড়ে চলে যাবার জন্য কেউ হুমকিও দেয়নি।
তা ছাড়া বজবজ এবং আশেপাশের গ্রামগুলোতে রয়েছে অনেক মুসলমান। রয়েছে মনসুর হোসেনের প্রচুর আত্মীয় পরিজন। তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানে চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু বেশির ভাগই থেকে গেছে পিতৃভূমিতেই। তারা বদ্ধপরিকর নিজেদের দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে না। এরা তো বটেই, অনেক হিন্দু যারা পুরুষানুক্রমে পাশাপাশি বাস করে আসছে তারাও বুঝিয়েছে। মনসুর হোসেনরা যেন চলে না যান। পাকিস্তানে যখন যাওয়াই হচ্ছে না, সম্পত্তি বিনিময়ের প্রশ্নই নেই।
নিত্য দাস বলতে লাগল, জবর আশা লইয়া বজবজ লৌড়াইছিলাম (দৌড়েছিলাম)। কামের কাম কিছুই অইল না।
শাজাহান সাহেবের বিষয় আশয় হাতছাড়া হল। আর মনসুর হোসেন ইন্ডিয়াতেই থেকে যাবেন। পর পর দুদুটো ব্যর্থতা। কিন্তু হতাশায় ডুবে থাকলে তো চলবে না। হেমনাথকে কলকাতায় নিয়ে আসার একটা উপায় বার করতেই হবে। এবং সেটা আজই। বিনয় নিত্য দাসকে দেখিয়ে সুধাদের বলে, এর হাতে এই মুহূর্তে আর কোনও বড় খদ্দের নেই। তা হলে কী করা যায়?
নিত্য দাস বলে ওঠে, আমারে দিন পনরো সোময় দ্যান। ম্যালা সোম্পত্তি আছে, এমুন কেও পাকিস্থানে চইলা যাইতে চায় কি না, খোঁজখবর কইরা দেখি–
