এই যে বিনয় নিত্য দাসকে বজবজে পাঠাচ্ছে, সে কী খবর নিয়ে আসবে, জানা নেই। যদি শোনা যায়, মনসুর হোসেনের সম্পত্তি এক্সচেঞ্জ হয়ে গেছে তখন কী করবে সে?
বিনয় ভাবল, সুধাদের সঙ্গে কথা বলে হেমনাথ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার একা কিছু করা সঙ্গত নয়।
আজকের দিনটা ছুটি নিয়েছে বিনয়। অফিসে যেতে হবে না। সে স্থির করে ফেলল, এখন মেসে না গিয়ে সুধাদের বাড়ি চলে যাবে। পরমুহূর্তে খেয়াল হল, সেখানে গেলে হিরণের সঙ্গে দেখা হবে না। এতক্ষণে সে অফিসে চলে গেছে। তাছাড়া, শুধু সুধাদের সঙ্গে কথা বললেই চলবে না, আনন্দ এবং সুনীতিকেও চাই। অল্প সময়ের মধ্যে এতজনকে জড়ো করা মুশকিল।
কিছুক্ষণ চিন্তা করে বিনয় ঠিক করল, আপাতত সে হিরণের অফিসে যাবে। তাকে সব জানালে, নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা সে করে ফেলবে। হেমমলিনী যতদিন বেঁচে আছেন, বিনয় আনন্দদের বাড়ি যাবে না। তার ইচ্ছা, সুধাদের বাড়িতে কথাবার্তা হোক। কিন্তু অন্য একটা সমস্যা আছে। ধরা যাক, হিরণ আনন্দকে তার অফিসে ফোন করল। আনন্দ তাদের বাড়ি গিয়ে কখন সুনীতিকে নিয়ে জাফর শা রোডে আসতে পারবে, কে জানে। তাই খানিকটা সময় হাতে রেখে বিনয় নিত্য দাসকে বলল, আপনি বিকেলে চারটে-পাঁচটা নাগাদ টালিগঞ্জে ছোটদির বাড়ি চলে আসবেন। আমি ওখানে থাকব।
আইচ্ছা–
নিত্য দাস রাস্তা পেরিয়ে ওধারে চলে গেল। ওখানে পাঁচ-সাত মিনিট পর পরই শিয়ালদার বাস আসে। বিনয় এপাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। সে চৌরঙ্গির বাস ধরবে। চৌরঙ্গিতে নেমে ধর্মতলা রুটের ট্রাম বা বাসে লিণ্ডসে স্ট্রিটের মোড়। সেখান থেকে খানিকটা হাঁটলেই ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে হিরণের অফিস।
.
হিরণদের অফিসে আগে আর কখনও আসেনি বিনয়। তবে জায়গাটা যে হগ সাহেবের বাজারের পেছন দিকে সে-সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা ছিল।
ব্রিটিশ আমলে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ওই এলাকায় লম্বা লম্বা বিরাট আকারের শেড বানানো হয়েছিল। সেগুলো অবিকল তেমনই রয়েছে। তাছাড়া একতলা দোতলা কটা বাড়িও তৈরি হয়েছে। এখানেই ফুড ডিপার্টমেন্টের অফিস।
সোয়া এগারোটা নাগাদ সেখানে পৌঁছে যায় বিনয়। একে-ওকে জিজ্ঞেস করে হিরণকে পেয়েও গেল। একটা একতলা বিল্ডিংয়ের একখানা মাঝারি মাপের ঘরে বসে হিরণ। ঘরটা পুরানোনা ধাঁচের চেয়ার টেবল আর মস্ত মস্ত দুটো কাঠের আলমারি দিয়ে মোটামুটি সাজানো।
বিনয় এসময় তার অফিসে, আসবে ভাবতে পারেনি হিরণ। সেই যে সুধা আর সে শান্তিনিবাস-এ বিনয়কে পৌঁছে দিয়ে এসেছিল তারপর এই দেখা হল।
কয়েক পলক অবাক তাকিয়ে থাকে হিরণ। তারপর ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বোসো, বোসো। রোজই সুধা আর আমি ভাবি তোমার মেসে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসব। কিন্তু খান মঞ্জিল মেরামতির তদারক করা আর অফিসের কাজের প্রেসারে একদম সময় করে উঠতে পারিনি। ভেবেছিলাম আসছে রবিবার বলতে বলতে আচমকা থেমে যায় সে। টেবলের ওপর দিয়ে অনেকখানি ঝুঁকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিনয়কে লক্ষ করে। একসময় চিন্তিতভাবে জিজ্ঞেস করে, তোমাকে এরকম দেখাচ্ছে কেন? এনি প্রবলেম?
সামনে আয়না টাঙানো নেই যে নিজেকে দেখা যাবে। তবে হিরণের প্রশ্ন শুনে বিনয় আন্দাজ করে নিল, নিশ্চয়ই তার চোখেমুখে তীব্র উৎকণ্ঠা ফুটে বেরিয়েছে। হেমনাথের চিঠিটা সঙ্গেই রয়েছে। নিঃশব্দে পকেট থেকে সেটা বার করে হিরণকে দিল।
চিঠিটা পড়ার পর রুদ্ধশ্বাসে হিরণ বলে, সর্বনাশ। হেমদাদুর তো মহা বিপদ। তুমি কি শাজাহান সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে পেরেছ?
বিনয় বলল, নিত্য দাস সকালে আমাকে তার কাছে নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেই সোজা আপনার অফিসে আসছি।
শাজাহান সাহেব কী বললেন?
শাজাহানের সঙ্গে যা-যা কথা হয়েছে, সব বলে গেল বিনয়। এমনকি এক্সচেঞ্জের ব্যাপারে নিত্য দাসকে যে বজবজে পাঠিয়েছে এবং সে বিকেলে খবর টবর নিয়ে টালিগঞ্জে হিরণদের বাড়ি আসবে, তাও জানিয়ে দিল।
হিরণ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কী উত্তর দেবে, ভেবে পায় না।
কোন উদ্দেশ্যে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ছুটে এসেছে, এবার তা জানায় বিনয়। তারপর বলে, আপনি আনন্দদাকে একটা ফোন করে বলুন, বড়দিকে নিয়ে বিকেলে যেন আপনাদের বাড়ি চলে আসে। নিত্য দাস যদি ভাল খবর না আনে, সবাই মিলে কিছু একটা ঠিক করব। দাদুর মতো মানুষ যখন ভয় পেয়েছেন, তাঁকে আর রাজদিয়ায় ফেলে রাখা যাবে না।
হিরণ টেবল থেকে ফোন তুলে এক্সচেঞ্জকে আনন্দর অফিসে লাইন দিতে বলল। একটু পর তাকে পেয়েও গেল।
টেলিফোনটা বেশ জোরালো। টেবলের এধারে বসে দুজনের কথা শুনতে পাচ্ছে বিনয়।
আনন্দ বলল, কী হল, হঠাৎ ফোন করলে?
হিরণ বলল, রাজদিয়া থেকে হেমদাদুর চিঠি এসেছে। আগে সেটা শুনুন- হেমনাথের চিঠিটা পুরো পড়ে গেল সে।
সব শোনার পর আতঙ্কগ্রস্তের মতো আনন্দ বলে ওঠে, এ তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার।
হ্যাঁ। আপনি দিদিকে নিয়ে বিকেলে আমাদের বাড়ি চলে আসবেন। কী কারণে আসা দরকার তা বুঝিয়ে দিল হিরণ।
হা হা, নিশ্চয়ই যাব।
ফোন নামিয়ে রাখার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটে। তারপর হঠাৎ যেন খেয়াল হয়েছে, এমনভাবে হিরণ বলে, সকালবেলা বেরিয়েছ। নিশ্চয়ই খাওয়া টাওয়া হয়নি। চল, কাছেই একটা ভাল হোটেল আছে। তোমাকে খাইয়ে আনি
