বিনয় কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই নিত্য দাস বলে ওঠে, আমার একহান কথা রাখবেন?
বলুন-শাজাহান সাহেব উৎসুক চোখে নিত্যর দিকে তাকান।
সুযুগ যহন আছে তহন হুদাহুদি (শুধু শুধু) বিশ বিঘা জমিন কম নিবেন ক্যান? অতখানি জাগা (জায়গা) কি মুখের কথা। গোপাল মজুমদাররে না কইরা দ্যান। হামকত্তার লগেই এঞ্জেটা করেন।
এখন আর তা হয় না।
ক্যান?
আমি সব জেনেশুনেই কম জমিতে রাজি হয়েছি। কথাও দেওয়া হয়ে গেছে। ভদ্রলোক কত আশা নিয়ে অপেক্ষা করছেন। এখন তাঁকে নেওভাবেই না বলা যায় না। অসম্ভব।
বিনয় বুঝতে পারছিল, শাজাহান সাহেব এক কথার মানুষ। তার জবানের এদিক সেদিক হবে না। তিনি যে অনড় হয়ে আছেন, এতে তাঁদের ক্ষতি হল কিন্তু মানুষটির প্রতি তার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।
নিত্য দাস হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। বলল, আমি পরের হপ্তায় একবার আপনার লগে দ্যাখা করুম। যদিন মজুমদার মশয়ের লগে কামটা কুনো কারণে না হয়
তাকে থামিয়ে দিয়ে শাজাহান সাহেব বললেন, ঠিক আছে আসবেন। একান্তই যদি না হয়, তখন আপনাদের কথা ভেবে দেখা যাবে।
এরপর আর বসে থাকার মানে হয় না। শাজাহান সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বিনয়রা।
.
৬২.
রাস্তায় এসে নীরবে কিছুক্ষণ হাঁটতে থাকে দুজনে।
একসময় নিত্য দাস বলে, বড় আশা নিয়া আইছিলাম ছুটোবাবু। এক্কেরে নৈরাশ অইতে অইল-
মাথার ভেতরটা গুলিয়ে যাচ্ছিল বিনয়ের। হেমনাথের বিষয় সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থা করে কীভাবে তাদের কলকাতায় নিয়ে আসা যায়, সেই চিন্তাটাই তাকে প্রচণ্ড উতলা করে তুলেছে। সে বলল, এখন উপায়?
তক্ষুনি উত্তর দিল না নিত্য দাস। বি: প্রশ্নটা খুব সম্ভব তাকেও যথেষ্ট বিচলিত করে তুলেছে।
বিনয় এবার জিজ্ঞেস করে, আপনি তো বলেন, ইণ্ডিয়া থেকে অনেক মুসলিম পাকিস্তানে চলে যেতে চাইছে। বড় প্রপার্টি আছে, শাজাহান সাহেব ছাড়া আপনার হাতে এমন আর কোনও খদ্দের নেই?
এটাই ভাবছিল নিত্য দাস।না বলতে গিয়ে হঠাৎ সে যেন একটা আলোর রেখা দেখতে পায়। উত্তেজনায় কপালে চাপড় মেরে বলে ওঠে, মাথাটা আমার এক্কেরে গ্যাছে। বস (বয়স) হইছে তো, ছোত কইরা (দ্রুত) হগল মনে পড়ে না। গ্যাল (গত) মাসে মনসুর হোসেন বইলা একজন আমারে কইছিল এচ্চেঞ্জ কইরা পাকিস্থানে যাইতে চায়। বজবজে তেনাগো ম্যালা জমিন আর বড় দালান কোঠা আছে। তেনার কথা পুরা ভুইলাই গ্যাছিলাম।
বজবজ নামটা বিনয়ের জানা। জায়গাটা কোন অঞ্চলে সে সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণাও আছে। শাজাহান সাহেবের হুগলির প্রপার্টির চেয়ে এটা কলকাতার অনেক কাছাকাছি। সব আশা যখন ধসে পড়েছে সেই সময় মনসুর হোসেনের খবরটা বিনয়কে ফের চাঙ্গা করে তোলে। প্রবল উৎসাহের সুরে সে বলে, হোসেন সাহেবের সঙ্গে দেখা করা দরকার।
নিত্য দাস বলল, হে তো করতেই অইব। কাইল কি পরশু বিহানে (সকালে) উইঠা তেনার বাড়ি চইলা যামু।
বিনয়ের তর সইছিল না। সে বলতে লাগল, না না, কাল-পরশু নয়। এখনই চলুন। দেরি করলে তিনি আবার অন্য কারও সঙ্গে এক্সচেঞ্জ করে ফেলতে পারেন।
নিত্য দাস বেশ অবাক হল, আপনেও বজবজ যাইতে চান নিকি?
নিশ্চয়ই। শুনেছি শিয়ালদা থেকে ট্রেনে বজবজে যাওয়া যায়
হ।
চলুন, রাস্তার ওধারে গিয়ে শিয়ালদার বাস ধরি।
বিনয়ের কেন এত তাড়া, তা না বোঝার কারণ নেই। নিত্য দাস একটু চিন্তা করে বলে, ছুটোবাবু, মনসুর হুসেন যে এচ্চেঞ্জের কথা কইছিল হের পর মাসখানেক পার হইয়া গ্যাছে। এইর ভিতরে তেনার সোম্পত্তি আছে, না কারোর লগে এচ্চেঞ্জ কইরা ফেলাইছে, জানি না। এক কাম করা যাউক-
কী?
আমি একা বরম (বরং) বজবজ গিয়া খবর লইয়া আহি। যদিন দেখি বাড়ি-জমিন অহনও আছে, দুই-এক দিনের ভিতরে আপনেরে হেইহানে নিয়া যামু, কি মনসুর হুসেনরে কইলকাতায় আইনা আপনের লগে দেখা করাইয়া দিমু।
নিত্য দাসের কথাগুলো যুক্তিপূর্ণ মনে হল। খোঁজখবর নেবার পর মনসুর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভাল। পকেট থেকে কিছু টাকা বার করে নিত্যকে দিয়ে হাত-ঘড়িটা দেখে বলল, এখন দশটা বেজে সতেরো। বজবজ থেকে কখন ফিরতে পারবেন?
মনে মনে সময়ের হিসেব করে নিত্য দাস বলে, যাওনে-আহনে (যাওয়া-আসায়) ঘণ্টা দুই-আড়াই। বজবজ টাউনের গায়েই ইস্টিশান। টেরেন থিকা নাইমা মিনিট পাঁচেক হাটলেই গুলাম হুসেনের দালান। তেনার লগে কথা কইতে কতক্ষণ আর লাগব? খুব বেশি অইলে আধা ঘন্টা। দুফার দ্যাড়টা-দুইটার ভিতরে ফিরা আইতে পারুম। তয় (তবে) একহান কথা–
কী?
বজবজে গিয়া যদিন তেনার লগে দ্যাখা হয়, ঠিক আছে। নাইলে দেরি অইব।
বিনয় জোর দিয়ে বলল, যত দেরিই হোক, মনসুর হোসেনের সঙ্গে দেখা না করে ফিরবেন না।
নিত্য দাস ঘাড় কাত করে আইচ্ছা—
ফিরে এসেই আমার স দেখা করবেন।
কই দ্যাখ্যা করুম? আপনর ম্যাসে (মেসে)?
জবাব দিতে গিয়ে থমকে যায় বিনয়। কাল রাতে হেমনাথের চিঠিটা পড়ার পর থেকে তার সব কিছু গোলমাল হয়ে গিয়েছিল। তখন তার একমাত্র চিন্তা, শাজাহান সাহেবের সঙ্গে দেখা করে প্রপার্টি এক্সচেঞ্জের বন্দোবস্ত করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হেমনাথকে পাকিস্তান থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা। সেটাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য, অথচ এ নিয়ে সুধা সুনীতি আনন্দ এবং হিরণের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত ছিল। কিন্তু কাল রাতে এতটাই ক্লান্ত ছিল যে যাওয়া হয় নি। আজ তাকে যেতেই হবে।
