রাস্তার ঠিক ওপরেই লোহার নিচু গেট। দারোয়ানটি মাঝবয়সী মুসলমান। নিত্য দাসকে দেখে এক মুখ হেসে বলল, আদাব দাসবাবু, অনেক রোজ বাদে এলেন
হ্যাঁ। নমস্কার জানিয়ে নিত্য দাস বলে, নানা কামে আটকাইয়া গ্যাছিলাম। তা শাজাহান সাহেব কি এইহানে আছেন, না তেনার হাওড়ার বাড়িত?
এখানেই আছেন। পরশু বিকেলে এসেছেন—
যাউক, নিশ্চিন্ত হইলাম। নাইলে হেই আন্দুলে দৌড়াতেই হইত। তা সাহেবরে এটু খবর দ্যান, তেনার লগে দেখা করুম
বিনয় বুঝতে পারছিল, এ-বাড়িতে যাতায়াতের কারণে নিত্য দাসের সঙ্গে দারোয়ানটার ভালই আলাপ-পরিচয় আছে।
দারোয়ান বলল, আসুন
ভেতরে একটা মস্ত বাঁধানো চাতাল ঘিরে চারদিকে সারি সারি ঘর। একতলা, দোতলা এবং তেতলার নকশা একই রকম। ঘরের গায়ে ঘর। এখানে পর্দার ভীষণ কড়াকড়ি। লোকজন কারওকেই দেখা যাচ্ছে না। তবে পুরুষ এবং মেয়েদের গলার আওয়াজ ভেসে আসছে।
দারোয়ান একতলারই একটা মস্ত ঘরে নিয়ে এল বিনয়দের। ঘরটার দেওয়ালে এবং সিলিংয়ে কত রকমের যে নকশা। মেঝেতে কার্পেটের ওপর ভারী ভারী সোফা।
আপনারা বসুন। আমি সাহেবকে জানাচ্ছি– বলে দারোয়ান চলে গেল।
মিনিট দশেক পর যিনি ঘরে এসে ঢুকলেন তার বয়স ষাটের কাছাকাছি। লম্বা চওড়া, সম্ভ্রান্ত চেহারা। ফর্সা রং। মাথায় প্রচুর কাঁচাপাকা চুল। নিখুঁত কামানো মুখ! পরনে দামি লুঙ্গি এবং পাঞ্জাবির ওপর পাতলা শাল।
নমস্কার শাজাহান সাহেব বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় নিত্য দাস। দেখাদেখি বিনয়ও।
হাত তুলে আদাব জানান শাহান সাহেব। বলেন, বসুন বসুন সবাই বসলে নিত্য দাসকে বললেন, সেই বলে গেলেন, দিন সাতেকের ভেতর আসছেন। এলেন তিন সপ্তাহ পর।
সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে নিত্য দাস জানায়, যার বিষয় আশয় সেই হেমনাথ থাকেন পাকিস্তানে। বর্ডারের ওপারের চিঠি কবে আসবে তার কোনও ঠিক নেই। তিন দিনে যেটা আসার কথা সেটা এল হয়তো পনেরো দিন বাদে। আশায় আশায় থাকার পর কালই হেমনাথের জবাব এসেছে। সেটা পেয়েই আজ ছুটে এসেছে সে। হেমনাথ যে এতকাল দেশ ছেড়ে না আসার জন্য জেদ ধরে। বসেছিলেন, সেটা আর জানায় না।
নিত্য দাস প্রবল উৎসাহের সুরে বলতে লাগল, আমাগো ইচ্ছা, দিন দশ-পনরোর ভিতরে শুভ কামটা সাইরা ফালাই,
একটু চুপ করে থাকেন শাজাহান সাহেব। তারপর বলেন, এখন আর তা সম্ভব নয়। নিমেষে শ্বাসক্রিয়া যেন বন্ধ হয়ে যায় বিনয়ের। নিত্য দাসের পাশ থেকে সে রুদ্ধস্বরে জিজ্ঞেস করে, কেন বলুন তো?
এতক্ষণে যেন ভাল করে বিনয়কে লক্ষ করেন শাজাহান সাহেব। গোড়ার দিকে হয়তো ভেবেছিলেন, নিত্য দাসের সঙ্গী মাত্র। বললেন, এঁকে তো চিনতে পারলাম না।
উত্তরটা দিল নিত্য দাস, এনাগোই তো সোম্পত্তি। এনি হ্যামকত্তার নাতি। বিনয়ের নামটামও জানিয়ে দেয় সে।
শাজাহান সাহেব বিনয়কে বললেন, আপনারা বড্ড দেরি করে ফেলেছেন। দাসবাবুর অপেক্ষায় থেকে থেকে শেষ পর্যন্ত গেল শুক্রবার অন্য একজনের সঙ্গে এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থা করে ফেলেছি।
বিনয়ের মনে হয়, এই সাজানো গোছানো বসার ঘরটা দুলতে শুরু করেছে। আর চোখের সামনের সমস্ত কিছু দ্রুত ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
শাজাহান সাহেব বিশদভাবে জানালেন, সম্পত্তি বিনিময়ের ব্যাপারে তিনি ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। নিত্য দাসের ওপর পুরোপুরি ভরসা ছিল তাঁর। হেমনাথের যে বিষয় আশয়ের বিবরণ। তার কাছে শুনেছেন পূর্ব পাকিস্তানে ঠিক তেমনটিই তিনি চান। কিন্তু হঠাৎ নিত্য যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়ায় তার দুশ্চিন্তা ভীষণ বেড়ে যায়। ছোট সম্পত্তির বিনিময় চট করে হতে পারে কিন্তু বড় বড় প্রপার্টির খদ্দের পাওয়া মুশকিল। তার দেড় শ বিঘে তেফসলা জমি, হাওড়ায় দু-মহল পাকা দালান, মোটরগাড়ি, এ-সবের বদলে তো পাঁচ-দশ বিঘের জমি-টমি নেওয়া যায় না।
নিত্য হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন শাজাহান সাহেব। কী করতেন, কে জানে। হয়তো যেমন তেমন একটা প্রপার্টির সঙ্গে এক্সচেঞ্জ করে সীমান্তের ওপারে চলে যেতেন। কিন্তু আকস্মিকভাবেই সমস্যাটার সুরাহা হয়ে গেল।
নিত্য দাসের মতো কত যে টাউট এক্সচেঞ্জের কারবারে নেমে পড়েছে তার লেখাজোখা নেই। তাদেরই একজন হল অধীর শীল। সপ্তাহখানেক আগে একটা সুখবর নিয়ে শাজাহান সাহেবের কাছে সে এসে হাজির। জানালেন, গোপাল মজুমদার নামে এক ভদ্রলোক ইন্ডিয়ায় চলে আসার জন্য পা বাড়িয়ে আছেন। মুন্সিগঞ্জ টাউনে তাদের বাড়ি। টাউনের কাছাকাছি গ্রামের দিকে আশি বিঘের মতো জমি আছে। তবে মোটর নেই। অবশ্য নৌকো রয়েছে অজস্র-শখানেকের মতো। শাজাহান সাহেবের দেড় শ বিঘের বদলে গোপাল মজুমদারের আশি বিঘে জমিটা অবশ্য কম হয়ে গেল। মোটরের বদলে নৌকো। কিন্তু কী আর করা যায়? এটা হাতছাড়া হয়ে গেলে পস্তাতে হবে। এখন আশি বিঘে পাওয়া যাচ্ছে। আরও দেরি হলে বিশ পঞ্চাশও জুটবে কি না সন্দেহ। অগত্যা শাজাহান সাহেবকে দালাল অধীর শীলের প্রস্তাবে রাজি হতে হয়েছে।
নীরবে শুনে যাচ্ছিল বিনয়। আস্তে আস্তে শ্বাস টেনে বলল, আপনাদের এক্সচেঞ্জটা কি হয়ে গেছে?
শাজাহান সাহেব জানালেন, বিনিময় এখনও হয়নি। দলিলপত্র নিয়ে বর্ডার দিয়ে আসার প্রচণ্ড অসুবিধা। তাই তিনি নিজের একজন বিশ্বাসী লোককে মুন্সিগঞ্জে পাঠাবেন। গোপাল মজুমদার স্ট্যাম্প কাগজে তার নামে দানপত্র লিখে লোকটির হাতে দেবে। গোপালের বিশ্বাসী লোকও শাজাহান সাহেবের সঙ্গে কলকাতায় দেখা করে একই ভাবে দানপত্র লিখিয়ে নেবে। সমস্ত প্রক্রিয়াটি এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে।
