খিদেতেষ্টার বোধটাই এই মুহূর্তে নষ্ট হয়ে গেছে বিনয়ের। সে ঠিক করে ফেলল, আজ আর কিছু খাবে না। হাতমুখ ধুয়ে শুয়ে পড়বে।
চান-ঘর থেকে ঘুরে এসে সে যখন বিছানার চাদর টান টান করে পেতে নিচ্ছে সেই সময় ফের সুবল এসে হাজির। জিজ্ঞেস করল, আপনে কি নিচে গিয়া খাইবেন, না খাওনেরটা (খাবার) উপুরে নিয়া আসুম?
প্রসাদ মতিলাল চাকলাদারকে বিনয়ের সুখ সাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর রাখতে বলেছিলেন। মতিলাল সেই দায়িত্ব সুবলকে দিয়েছে। সেটা একেবারে বেদবাক্য হিসেবে ধরে নিয়েছে সুবল। যতক্ষণ বিনয় মেসে কাটায় ছেলেটার চোখ থাকে তার ওপর। বিনয়ের এতটুকু অসুবিধা হতে দেয় না সে।
বিনয় বলল, আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।
কিন্তু সুবল কোনও কথা শুনল না। শীতের লম্বা রাত উপোস দিয়ে থাকলে শরীর খারাপ হবে, সেটা জানিয়ে একলা থেকে ভাত মাছটাছ নিয়ে এল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দু-চার গ্রাস খেয়ে আঁচিয়ে এসে শুয়ে পড়ে বিনয়। এঁটো থালা গেলাস টেলাস তুলে নিয়ে, আলো নিভিয়ে, বাইরে থেকে দরজার পাল্লাটা টেনে দিয়ে চলে যায় সুবল।
৬১-৬৫. মেসের ম্যানেজার
৬১.
মেসের ম্যানেজারকে আগেই বলে রাখা হয়েছে, যতদিন ঠাণ্ডা থাকবে বিনয়ের স্নানের জন্য রোজ সকালে যেন গরম জল দেওয়া হয়। অন্য দিনের মতো আজও এক বালতি ফুটন্ত জল তেতলার বাথরুমে রেখে বিনয়ের ঘুম ভাঙিয়ে দিল সুবল।
বিনয় যখন স্নান করতে যায়, প্রসাদের ঘর ছিল বন্ধ। অনেক রাত করে ফেরেন বলে ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে যায় তার।
বাথরুম থেকে ফেরার সময় চোখে পড়ল, এর মধ্যে জেগে গেছেন প্রসাদ। তার ঘরের দরজা খোলা। দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী বস্তির বাচ্চাদের জন্য খুব যত্ন করে পাউরুটি কাটছেন। বিনয়ের। মনে পড়ে যায়, ত্রাণশিবির এবং জবরদখল কলোনিগুলোতে যাওয়া ছাড়াও আসামের উদ্বাস্তুদের দায়িত্বও তাকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে নিত্য দাস এসে পড়বে। তার সঙ্গে বেকবাগানে যাবার কথা আছে। সেখানে কতক্ষণ লাগবে, কে জানে। আজ হয়তো শিয়ালদায় ছোটা সম্ভব হবে না। সেটা প্রসাদকে জানানো দরকার।
নিজের ঘরে এসে জামাকাপড় পালটে, গায়ে চাদর জড়িয়ে তৈরি হয়ে নিল বিনয়। কাঠের আলমারিতে হেমনাথের চিঠিটা ছিল। সেটা পকেটে পুরে প্রসাদের ঘরে চলে আসে সে।
অন্য দিনের মতো আজও প্রসাদ বলেন, এসে গেছ? গুড। আমাকে একটু হেল্প কর। তারপর গলা উঁচুতে তুলে সুবলকে চা দিয়ে যেতে বললেন।
প্রসাদের সামনের নিচু টেবলটায় কটা আস্ত পাউরুটি পড়ে আছে। একটা টেনে নিয়ে কাটতে থাকে বিনয়। এটা তারও প্রতিদিনের রুটিনের মধ্যে পড়ে গেছে।
রুটি কাটার ফাঁকে বিনয় ভয়ে ভয়ে বলে, প্রসাদদা, আজকের দিনটা আমাকে ছুটি দিতে হবে।
প্রসাদের হাতের ছুরি থেমে যায়। মুখ তুলে বলেন, ছুটি? হঠাৎ?
বিনয় বলল, একটা দরকারি কাজ আছে। তাই
প্রসাদ রীতিমতো বিরক্ত। কপালে কুঞ্চন দেখা দিয়েছে। বেশ ঝাঝালো গলায় বললেন, কত কলোনি আর রিলিফ ক্যাম্প কভার করা হয়নি। তার ওপর আসামের উদ্বাস্তুরা আছে। এর মধ্যে তুমি কি না ছুটি চাইছ! স্ট্রেঞ্জ
প্রসাদের একটা চেহারাই এতদিন দেখে এসেছে বিনয়। শান্ত, উত্তেজনাশূন্য, স্নেহপ্রবণ। কিন্তু এই প্রথম টের পাওয়া গেল, কাজের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। সেখানে লেশমাত্র শিথিলতা প্রশ্রয় দেন না। মুখ চুন করে বসে থাকে বিনয়।
কী ভেবে এবার একটু নরম হলেন প্রসাদ। খেয়াল হল, বিনয় কঁকিবাজ নয়। অফিসে জয়েন করার পর থেকে একটা দিনও কামাই করেনি। খেটে চলেছে অবিশ্রাম। যে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে, নীরবে এবং নিপুণভাবে তা করে যাচ্ছে। তার প্রতিবেদনগুলোর জন্য নতুন ভারত-এর সুনাম হয়েছে যথেষ্ট। কাজের ব্যাপারে প্রচণ্ড উৎসাহ ছেলেটার। গলার স্বর নামিয়ে প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, কী কারণে ছুটি চাইছ?
পকেট থেকে হেমনাথের চিঠিটা বার করে প্রসাদকে দিতে দিতে বিনয় বলল, পড়ে দেখুন
একটু অবাক হলেন প্রসা। তারপর দ্রুত চিঠির ভাঁজ খুলে এক নিঃশ্বাসে পুরোটা পড়ে বিনয়ের দিকে তাকালেন। তার মুখচোখের চেহারা সম্পূর্ণ পালটে গেছে। খুবই চিন্তাগ্রস্ত, ভীষণ উদ্বিগ্ন। বললেন, এ তো সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার
বিনয় বলল, আমি এখন শাজাহান সাহেবের কাছে যেতে চাই। সেই জন্যেই
তার কথার মধ্যেই প্রসাদ বলে ওঠেন, নিশ্চয়ই যাবে। যেভাবে হোক, এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থা করে ফেল–
সুবল চা নিয়ে এল। সেটা শেষ হতে না-হতেই নিত্য দাস এসে যায়। তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল বিনয়।
.
রসা রোডে এসে বাস ধরে সার্কুলার রোডের মোড়। সেখান থেকে অন্য একটা বাসে বেকবাগান।
আগে কখনও কলকাতার এই দিকটায় আসেনি বিনয়। শান্ত, নিরিবিলি এলাকা। বিরাট বিরাট কমপাউন্ডের ভেতর সেকেলে ধাঁচের দোতলা, তেতলা বাড়ি। একটা বড় সবুজ রঙের তেতলা বাড়ির সামনে বিনয়কে নিয়ে এল নিত্য দাস। সেটার কার্নিসে, দেওয়ালে নানা ধরনের কারুকাজ।
বিনয় লক্ষ করে, বাড়িটার একতলা থেকে তেতলা পর্যন্ত সবগুলো ঘরের জানালা ছোট ছোট। প্রতিটিতে দুটো করে পাল্লা। একটা কাঠেব, অন্যটা রঙিন কাঁচের। বাইরের দিকের বগুলো দরজা জানালাতেই মোটা পর্দা ঝুলছে। লহমায় টের পাওয়া যায়, পুরনোপন্থী বনেদি মুসলমানদের বাড়ি। পড়ার অন্য বাড়িগুলোও এক ধাঁচের।
