ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকায় নিত্য দাস। না। আপনেরা কইয়া দিলেন, এচ্চেঞ্জ করবেন না। হের পর আর ওনার বাড়ি যাই নাই। অতদূর আগাইয়া কামটা হইল না। কোন মুখে যামু কন?
নিত্যকে ক্ষুব্ধ দেখায়। তার ক্ষোভের যথেষ্ট কারণও আছে। হেমনাথদের সম্পত্তি বিনিময়ের কাজ অনেকটাই পাকা করে ফেলেছিল সে, কিন্তু হেমনাথ বেঁকে বসায় সমস্ত ভেস্তে যায়। তারপর সংকোচে আর শাজাহান সাহেবের কাছে যায়নি।
বিনয় বলে, আবার না গেলেই যে নয়। দাদু কী ধরনের বিপদের মধ্যে আছেন, তা আপনি নিজেও জানেন।
হেমনাথের জন্য উৎকণ্ঠা নিশ্চয়ই হচ্ছে নিত্য দাসের। কিন্তু তার চেয়েও যেটা বড় ব্যাপার তা হল হেমনাথ এবং শাজাহান সাহেবের বিপুল বিষয় আশয় এক্সচেঞ্জ করিয়ে দিতে পারলে তার হাতে বিরাট অঙ্কের দালালি এসে যাবে। কানের কাছে অবিরল টাকার ঝনৎকার শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সুযোগটা যখন নতুন করে এসেই পড়েছে যেভাবেই হোক তা কাজে লাগাতেই হবে।
নিত্য দাস পরম শুভাকাঙ্ক্ষীর মতো বলে, হ্যামকত্তার এত বড় বিপদ। আমি কি হাত-পাও গুটাইয়া বইয়া থাকতে পারি? দুই-চাইর দিনের মইদ্যে নিয্যস শাজাহান সাহেবের লগে দেখা করুম।
ব্যগ্রভাবে বিনয় বলল, দু-চার দিন না, কালই ওঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে।
একটু ভেবে নিত্য দাস বলল, কাইল অইব না। অন্য একজনেরে কথা দেওন আছে। তেনার লগে দেখা করতে লাগব।
না। কালই যেতে হবে। একেবারেই দেরি করা যাবে না।
হেমনাথের জন্য বিনয় যে কতখানি উৎকণ্ঠিত তা বুঝতে পারে নিত্য দাস। একটু চুপ করে থেকে বলে, ঠিক আছে।
আর-একটা কথা
কী?
আমিও আপনার সঙ্গে যেতে চাই।
খানিকক্ষণ থতিয়ে থাকে নিত্য দাস। বেশ অবাক হয়েই তারপর বলে, আপনে যাইবেন ক্যান?
নিত্যর মনোভাব চকিতে আন্দাজ করে নেয় বিনয়। হয়তো লোকটার মনে খটকা দেখা দিয়েছে। বিনয় সরাসরি গিয়ে কথা বললে তার দালালির টাকাটা কমে যেতে পারে। বা এই জাতীয় কিছু।
বিনয় বলল, চিন্তা করবেন না। আপনার পাওনা ঠিকই পাবেন। আমি গেলে শাজাহান সাহেব বুঝতে পারবেন, এক্সচেঞ্জটা কতখানি জরুরি।
নিত্য দাস আরাম বোধ করে। বিব্রতভাবে বলে, না না, ট্যাকার কথা মনেও আনি নাই। হ্যামকত্তায় আমার বাপের লাখান। তেনার লেইগা কিছু করতে পারলে জনম সার্থক। হের ভিতরে ট্যাকা পহার হিসাব আহে ক্যান? আপনের কষ্ট অইব তাই কইছিলাম। ঠিক আছে, যখন ইচ্ছা অইছে,-যাইবেন।
বিনয় বলে, আপনি বলেছিলেন, শাজাহান সাহেব হাওড়া না হুগলি, কোথায় যেন থাকেন।
হাওড়ার আন্দুলে ওনাগো বাড়ি। তয় জমিনজুমিন, হগল হুগলি জিলায়।
কখন গেলে ওঁকে পাওয়া যাবে?
সকালের দিকে গেলেই ভালা হয়। বেইল (বেলা) চেতলে (চড়লে) বাইর অইয়া পড়তে পারেন।
ঠিক আছে, কাল কখন এখানে আসতে পারবেন, বলুন। আমি রেডি হয়ে থাকব।
হাওড়ার আব্দুল তো কাছাকাছির পথ না। যাইতে ম্যালা (অনেক) সোময় লাগব। ধরেন সকাল আটটার ভিতরে চইলা আহুম বলতে বলতে হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ায় থেমে যায় নিত্য দাস।খাড়ন, খাড়ন, আগে আমরা হাওড়া যামু না
তা হলে কোথায় যাবেন?
পার্ক ছার্কাছের (সার্কাসের) বেগবাগানে।
সেখানে কেন?
নিত্য দাস বুঝিয়ে দিল। বেকবাগানে শাজাহান সাহেবের এক ভগ্নীপতি থাকেন। নাম ফজলুর রহমান। মাঝে মাঝে শাজাহান সাহেব বোনের বাড়ি এসে থাকেন। আন্দুলে বসে সম্পত্তি বিনিময়ের জন্য গ্রাহক পাওয়া মুশকিল। বেকবাগানে থাকার সুবিধা, এখানে নিত্য দাসের মতো টাউটদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। পূর্ব পাকিস্তানের নানা অঞ্চলের জমিজমা বাড়িঘরের খবর নিয়ে দালালেরা আসে। নিত্য দাস সেখানে বেশ কয়েকবার গেছে। অবশ্য শাজাহান সাহেবের আঙ্গুলের বাড়িতে যে যায়নি তা নয়। তবে বেকবাগানে গিয়েই বেশি দেখা করেছে।
নিত্য দাস বলতে লাগল, আন্দুলে গিয়া যদিন হুনি, শাজাহান সাহেব পার্ক ছার্কাছে বইনের বাড়িত রইছেন, অতখানি যাওনই সার। হুদাহুদি (শুধুশুধু) হয়রানি। হের থিকা আগে বেকবাগানে যামু
নিত্যর কথাগুলি যুক্তিসঙ্গত। বিনয় বলল, সেটাই ভাল।
নিত্য দাস চলে যাবার পর অনেকক্ষণ নিঝুম বসে থাকে বিনয়। হেমনাথের জন্য উৎকণ্ঠাটা ডালপালা মেলে চার দিক থেকে তার ওপর প্রবল চাপ দিতে শুরু করেছে। কাল শাজাহান সাহেবের সঙ্গে যেখানেই যোক-বেকবাগান বা আন্দুল–দেখা করতেই হবে। এক্সচেঞ্জের যে শর্তই তিনি দিন না, তাতেই রাজি হয়ে যাবে বিনয়। বিনিময়ের পুরো প্রক্রিয়াটা শেষ করে পনেরো দিনের মধ্যে হেমনাথ, স্নেহলতা আর শিবানীকে কলকাতায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে ফেলবে। এটা তাকে করতেই হবে।
হেমনাথের চিন্তাটা বিনয়কে এমনই উতলা করে তুলেছে যে অন্য কিছুই ভাবতে পারছিল না। আচমকা সুধা সুনীতি হিরণদের মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নিত্য দাস যখন জাফর শা রোডে গিয়েছিল, সুধারা নিশ্চয়ই জেনে গেছে, হেমনাথ চিঠি লিখেছেন। কিন্তু খামের মুখ আটকানো ছিল। চিঠিতে কী আছে, ওদের পক্ষে জানা সম্ভব হয় নি। তবে এটা এমন ব্যাপার যে সুধাদের জানানো দরকার।
এখন অনেক রাত। তার ওপর বেশ শীত। আজ টালিগঞ্জে গেলে কখন ফিরবে সে? বিনয় ঠিক করে ফেলল, কাল সময় করে একবার সুধাদের কাছে যাবে।
সেই দুপুরবেলায় আসামের উদ্বাস্তুদের জন্য শিয়ালদা স্টেশনে ছোটা। সেখান থেকে নতুন ভারত-এর অফিসে গিয়ে লম্বা একখানা রিপোর্ট লিখে শান্তিনিবাস-এ ফিরে আসা। সমস্ত শরীর জুড়ে অপার ক্লান্তি তো ছিলই। হেমনাথের চিঠিখানা পড়ার পর তার সঙ্গে যোগ হল আকণ্ঠ উদ্বেগ।
