যতদূর বুঝিলাম, ওসি জমিটা ইরফান আলির নামে লিখিয়া দিবার আভাস দিয়াছেন। মোতাহারদেরও তেমনই ধারণা। তোমাকে আগেই জানাইয়াছি, বিহারিরা যখন প্রথম রাজদিয়ায় আসে, বাঙালিরা তাহা সুনজরে দেখে নাই। কিন্তু অতি সম্প্রতি অবস্থা আর তেমনটা নাই। ইরফান আলির মতো লোকেদের পাশেও এখানকার অনেকেই গিয়া ভিড়িতেছে। ইহা মহা বিপদের কারণ।
সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া তোমার দুই দিদা এমনই সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে যে পাকিস্তানে আর এক দণ্ডও থাকিতে চাহিতেছে না। আমার অন্তরাত্মাও আতঙ্কে শুকাইয়া গিয়াছে। তোমরা সকলেই জানো, হাজার হাজার মানুষ যখন দেশ ছাড়িয়া ইণ্ডিয়ায় চলিয়া যাইতেছে তখনও স্থির করিয়াছিলাম, জন্মভূমি ত্যাগ করিব না। যাহাই ঘটুক, রাজদিয়াতেই আমৃত্যু থাকিব। কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা আর অটুট নাই, ধসিয়া পড়িছে।
তুমি বেশ কিছুদিন পূর্বে শাজাহান সাহেব নামে এক ভদ্রলোকের কথা জানাইয়াছিলে। তিনি তাহার পশ্চিমবঙ্গের বিষয়সম্পত্তি আমাদের প্রপার্টির সহিত এক্সচেঞ্জ করিয়া পাকিস্তানে চলিয়া আসিতে চান। তখন আমি রাজি হই নাই। কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত পালটাইয়া গিয়াছে। এই চিঠি পাওয়া মাত্র শাজাহান সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থা পাকা করিয়া ফেলিবে। আদৌ বিলম্ব করিবে না। তোমার চিঠি পাইলে আমি জমি বাড়ির দলিলপত্র লইয়া ঢাকায় গিয়া প্লেনে কলিকাতায় চলিয়া যাইব। বাকি কাজ সেখানে সম্পন্ন হইবে।
তারপাশা এবং গোয়ালন্দ দিয়া স্টিমারে আর ট্রেনে গেলে বর্ডারে পাকিস্তানি পুলিশ দলিলগুলি কাড়িয়া লইতে পারে। তাই ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়।
কেন ঢাকায় যাইতেছি রাজদিয়ায় কেউ জিজ্ঞাসা করিলে বলিব–বিশেষ প্রয়োজন। কলিকাতার কথা ঘুণাক্ষরেও কাহাকেও জানাইব না। এক জানিবে শুধু তোমার দুই দিদা। মোতাহারদের জানাইলে ক্ষতি নাই, কিন্তু তাহারা টের পাইলে কিছুতেই দেশ ছাড়িতে দিবে না।
তোমার আগের দুটি পত্রে ঝিনুক সম্পর্কে কিছুই জানাও নাই। সকলের কথা লিখ, শুধু ঝিনুক বাদে। তাহার জন্য আমরা বিশেষভাবে চিন্তিত আছি।
যত সত্বর সম্ভব উত্তর দিবা। তোমার পত্রের আশায় অধীরভাবে অপেক্ষা করিয়া থাকিব।
তোমাদের কুশল কামনা করি। আশীর্বাদক, দাদু
পুনশ্চ : জন্মভূমির উপর হইতে আমাদের মন উঠিয়া গিয়াছে। আরও একবার মনে করাইয়া দিতেছি, সম্পত্তি এক্সচেঞ্জের কাজটি অবশ্যই করিবে। অন্যথা না হয়।
.
চিঠিটা পড়ার পর স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে বিনয়। এতক্ষণ কার চিঠি পড়ল বিনয়? একজন হেমনাথ মিত্রকেই সে চেনে যিনি রাজদিয়ার সবচেয়ে শ্রদ্ধেয়, সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ। এবং প্রচণ্ড দুঃসাহসীও।
কিন্তু চিঠিটার প্রতিটি লাইন থেকে এক আতঙ্কগ্রস্ত বৃদ্ধের মুখ ভেসে উঠছিল।
এই সেদিন অবধি অনমনীয় জেদে বার বার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবাইকে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, যাই ঘটুক, যত সংকটই আসুক, জন্মভূমি ছেড়ে কোথাও যাবেন না। তাঁর সেই অদম্য সংকল্প, সেই অটুট দৃঢ়তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। স্বপ্ন দেখতেন, পূর্ব পাকিস্তানেই সমস্ত ভেদ-বিভেদ এবং সাম্প্রদায়িক নষ্টামি ধ্বংস হয়ে নতুন বাঙালি জাতীয়তাবাদের আকাশছোঁয়া মিনার মাথা তুলে দাঁড়াবে, অপার মহিমায়। হেমনাথের সেই স্বপ্ন এবং উদ্দীপনার লেশমাত্র আর অবশিষ্ট নেই। তার কল্পনার আকাশকুসুমগুলি মরে ঝরে শেষ। কতখানি বিপন্ন বোধ করলে হেমনাথের মতো মানুষ এরকম চিঠি লিখতে পারেন, ভাবতেই সমস্ত বোধবুদ্ধি অসাড় হয়ে যাচ্ছিল বিনয়ের। পাকিস্তানের অবস্থা কতখনি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে সেটাও বোঝা যাচ্ছিল।
খানিক দূরে বসে নিত্য দাস বিনয়ের দিকে পলকহীন তাকিয়ে ছিল। বিনয়ের মুখচোখ লক্ষ করতে করতে কিছু একটা আঁচ করে নিয়ে চাপা গলায় ডাকল, ছুটোবাবু
ঘরে যে অন্য একটা লোক রয়েছে, খেয়াল ছিল না বিনয়ের। চমকে উঠে সে বলে, ও আপনি!
উদ্বেগের সুরে নিত্য দাস বলল, আমার যে লোক বডারে গিয়া জয়নালের কাছ থিকা এই চিঠি আনছে, জয়নাল হেরে কইছে রাইজদার গতিক ভালা না। আর হ্যামকত্তায় খুব বিপদের মইদ্যে আছেন। একটু থেমে জিজ্ঞেস করে, চিঠিতে হ্যামকায় কি হেই হগল লেখছেন?
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়, হা- সে আন্দ করে নেয়, চিঠির পুরো বয়ানটা নিত্যর জানা নেই। বিশদভাবে সেটা তাকে বলল বিনয়। খুঁটিনাটি কিছুই বাদ দিল না।
নিত্য দাস আঁতকে ওঠে, এইটাই আমি ডরাইহিলাম ছুটোবাবু। আপনেগো কত বার হুইশার কইরা দিছি, হ্যামকত্তায় দ্যাশে থাকতে পারবেন না। দুই দিন আগে হউক আর চাইর দিন পরেই হউক, রাইজদা ওনারে ছাড়তেই হইব। শ্যাষম্যাশ আমার কথাই ফলতে চলছে।
দুশ্চিন্তায় মুখ শুকিয়ে গেছে বিনয়ের। সে বলল, ছোটদি বড়দি হিরণদা আমি, সবাই প্রত্যেকটা চিঠিতে লিখেছি, চলে আসুন। কিন্তু কারও কথা উনি কানে তোলেননি। নিজের জেদ নিয়েই পড়ে থেকেছেন। তার কণ্ঠস্বর থেকে ক্ষোভ, হতাশা এবং ত্রাস ফুটে বেরুতে থাকে।
একটু চুপচাপ।
তারপর বিনয় ফের শুরু করে, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন যত তাড়াতাড়ি পারা যায় রাজদিয়ার জমিজমা এক্সচেঞ্জ করে দাদু আর দিদাদের ইণ্ডিয়ায় নিয়ে আসতে হবে। একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, এর ভেতর শাজাহান সাহেবের সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছে?
