করিম বলে, আমি এই বাড়ির পোলা। দুই পুরুষ ধইরা হ্যামকত্তার নুন খাই। তেনার মেহেরবানিতে বাইচা আছি। ইন্ডিয়া থিকা আইয়া তেনারে অসোম্মান কর! বাইর হ হালা, বাইর হ। অক্ষণই যাবি–নাইলে
প্রচণ্ড রাগে কাঁপিতে থাকে ইরফান। সে একটি মতলব আঁটিয়া আসিয়াছিল। ভাবিয়াছিল, আমার উপর চাপ সৃষ্টি করিয়া কাজ হাসিল করিবে। আমি ভয়ে ভয়ে জমি লিখিয়া দিব। কিন্তু একটি রোগা পটকা বাঙালি মুসলমান যে এইভাবে রুখিয়া দাঁড়াইবে এবং তাহার অভিসন্ধি বানচাল করিয়া দিবে, ভাবিতে পারে নাই। ইরফান আলি করিমকে কুৎসিত গালিগালাজ করিতে থাকে।
করিমও সমানে সমানে জবাব দিতে লাগিল। তাহার মাথায় তখন খুন চড়িয়াছে। পারিলে ইরফানকে ছিঁড়িয়া খায়। কী তাহার চোটপাট!
আগেই জানাইয়াছি, ইরফানের লম্বা-চওড়া প্রকাণ্ড শরীর। ইচ্ছা করিলে সে করিমকে পিষিয়া ফেলিতে পারে। কিন্তু করিমের রাগ দেখিয়া সম্ভবত কিঞ্চিৎ ঘাবড়াইয়া যায়। আরও কিছুক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচির পর সে আপাতত রণে ভঙ্গ দেয়। যাইবার সময় আমাকে শাসায়, যেভাবে হউক, আমার ওই জমি সে দখল করিবেই। করিম ক্ষিপ্ত হইয়া ওঠে, তর (তোর) তালুকদারি নিকি! ইচ্ছা হইল, আর কাইড়া নিলি! পঁচিশ কানি কি রে, এক মুঠা মাটিও তুই পাবি না। মাথা নিচা কইরা যা গিয়া। ম্যালা তেরিমেরি করলে পুইতা ফালামু।
ইরফান আলি আর দাঁড়ায় না। শাসাইতে শাসাইতে চলিয়া যায়।
আমি স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিলাম। যাহারা চলিয়া গিয়াছে তাহাদের পরিত্যক্ত বিষয়সম্পত্তি জবরদখল করে, সে এক কথা। কিন্তু আমি দেশত্যাগ করি নাই। পাকিস্তানের নাগরিকত্ব মানিয়া লইয়া জন্মভূমিতেই থাকিয়া গিয়াছি। এমত অবস্থায় একটি লোক জুলুম করিয়া জমি কাড়িয়া লইতে চায় জানিয়া ভীষণ বিচলিত হইয়া পড়িলাম। জিন্না প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন, পাকিস্তানে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবার সমানাধিকার থাকিবে। রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিবে। কাহারও ধনসম্পত্তি অন্য কেহ যাতে ছিনাইয়া লইতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রাখিবে। কিন্তু ইরফান যাহা বলিয়া গেল তাহাতে শঙ্কিত হইয়া পড়িয়াছি।
আমি করিমকে বকাবকি করিলাম, কেন তুই লোকটার সঙ্গে ঝগড়া করলি? আমি ইরফান আলিকে ভাল কথায় বুঝিয়ে দিতাম, সে যা চায় সেটা ঠিক নয়
করিম বলিয়াছে, আপনে কি মনে করেন, ভালা কথায় নরম কথায় কুনো কাম অইত! উই পশ্চিমাটা আস্ত শয়তানের হাড্ডি। ও যদিন ম্যাজাজ দেখায়, আমাগোও তার বিশ ডবল ম্যাজাজ দেখাইতে হইব। রুইখা না খাড়ইলে ও মাথার উপুর চইড়া বসব। আইজ পঁচিশ কানি চাইতে আছে, কাইল কইব আরও পঁচিশ দাও। হের পরের দিন কইব, পুরাটাই দিয়া দাও।
করিম নিরক্ষর। কিন্তু সার সত্যটি তাহার কাছে অতি স্পষ্ট। সে ঠিকই বলিয়াছে, ইরফানের খাই সহজে মিটিত না। তাহার জুলুমের কাছে মাথা নোয়াইলে সে নিশ্চয়ই পাইয়া বসিত।
সেই মুহূর্তে হঠাৎ একটি প্রশ্ন আমার মনে দেখা দিয়াছিল। চিরকাল যে হেমনাথ রাজদিয়া অঞ্চলের ছোট-বড় সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছে, সে কিনা ইরফান আলির মত উদ্ধত, লোভী। একটি দুবৃত্তকে বুঝাইয়া সুঝাইয়া নিরস্ত করিতে চাহিয়াছে! কোথায় ঘাড়ধাক্কা দিতে দিতে বাড়ির বাহির করিয়া দিবে তা নয়। সে যেন নিজের অজান্তে আপসকামী হইয়া উঠিয়াছে। পাকিস্তান কি আমার শক্তি হরণ করিয়া লইতেছে?
ইরফান চলিয়া গেলেও করিম তখনও যায় নাই। সে বলিল, বড়কত্তা, উই পশ্চিমাটা মানুষ ভালা না। জমিন পায় নাই। ও কিলাম (কিন্তু) আপনেগো সব্বনাশ করতে পারে। এত বড় বাড়িত আপনেরা খালি তিনজনে থাকেন। হালার পুতে রাইতে লোজন লইয়া আইয়া আকাম (কুকাজ) কইরা যাইতে পারে। আপনেগো বস (বয়স) অইছে। ঠেকাইতে পারবেন না। আমারে এইহানে থাকনের ব্যাবোস্থা কইরা দ্যান। আমি রাইত জাইগা আপনেগো পরি (পাহারা) দিমু।
করিমের ইঙ্গিতটা বুঝিয়াছি। ইরফান আলি রাত্তিরে হানা দিয়া আমাদের খুন করিতে পারে। সেই কারণে সে আমাদের আগলাইয়া রাখিতে চায়। তাহার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরিয়া গেল। যুগলের জন্য যে ঘরখানা তোলা হইয়াছিল সেটা ফাঁকা পড়িয়া আছে। সেখানে করিম, তাহার বউ এবং দুই ছেলেমেয়ের থাকার বন্দোবস্ত করিয়া দিলাম। সারারাত না ঘুমাইয়া সে আমাদের পাহারা দেয়।
কিন্তু করিম আমাদের রক্ষার দায়িত্ব নিলেও পুরাপুরি যে নিশ্চিন্ত হইব তাহার উপায় নাই। রাজদিয়া ঘোট শহর। রাস্তার বাহির হইলে প্রায়ই ইরফানের সঙ্গে দেখা হয়। সে হুমকি দেয়, ইয়ে পাকিস্তান হ্যায়। ও জমিন আপনি রাখতে পারবেন না। আমাকে দিতেই হবে।
গোড়ার দিকে করিম ছাড়া অন্য কেউ ইরফান আলির কথা জানিত না। কিন্তু পরে রাজদিয়ায় আমাদের যে-সব শুভাকাঙ্ক্ষী রহিয়াছে তাহাদের কাছে গেলাম। যেমন মোতাহার হোসেন, সৈয়দ বাড়ির আমিনুল, মৃধাবাড়ির জামাল ইত্যাদি। তাহারা ভরসা দিল, চিন্তা নাই। আমাকে থানায় লইয়া গিয়া ইরফান আলির নামে একটি নালিশও দায়ের করিল। কিছুদিন হইল রাজদিয়ায় একজন নূতন ওসি আসিয়াছে। তাহার বয়স পঞ্চাশ-বাহান্ন। বেশ মিষ্টভাষী। জানাইলেন, তিনি যতদিন রাজদিয়ায় আছেন, কেউ আমার ক্ষতি করিতে পারিবে না। তবে ইরফান আলিরা ইন্ডিয়ায় সর্বস্ব হারাইয়া পাকিস্তানে আসিয়াছে। ওসির অনুরোধ, আমি যেন তাহাকে সাহায্য করি।
