তোমাকে পূর্বের একটি পত্রে জানাইয়াছিলাম, ইন্ডিয়া হইতে বেশ কিছু বিহারি মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে চলিয়া আসিয়াছে। অধিকাংশই আছে ঢাকা শহরে, মীরপুর অঞ্চলে। অন্যান্যরা খুলনা, যশোহর, রাজশাহী, ময়মনসিং ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের একটি অংশ রাজদিয়াতেও আসিয়া হাজির হইয়াছে।
ছিচল্লিশ সালে বিহারে যে রায়ট হইয়াছিল, এই লোকগুলি তাহা ভুলে নাই। ইণ্ডিয়া হইতে আসা এই মুসলিম উদ্বাস্তুরা খুবই বিদ্বেষপরায়ণ। ইহাদের মতে পাকিস্তান কায়েম হইয়াছে শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য। সেখানে অন্যদের স্থান নাই।
তুমি রাজদিয়ায় থাকিতে থাকিতেই এই অঞ্চলে ভাঙন ধরিয়াছিল। বারুইপাড়া, কর্মকারপাড়া, তাতিপাড়া প্রভৃতি এলাকার অনেকেই ত্রাসে দেশ ছাড়িয়া ইণ্ডিয়ায় চলিয়া গিয়াছে। বিহারিরা তাহাদের ফাঁকা জমি বাড়ি গায়ের জোরে দখল করিয়া বসিয়া পড়িয়াছে।
যাহারা চলিয়া গিয়াছে তাহাদের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু যাহারা এখনও দেশের মাটি আঁকড়াইয়া পড়িয়া আছে, বিহারিরা এতদিন তাহাদের উপর হামলা চালায় নাই। শুধু কথাবার্তা এবং আচরণে বুঝাইয়া দিয়াছে, মুসলিম ছাড়া অন্য সবাই পাকিস্তানে অবাঞ্ছিত। ব্যস, ওই পর্যন্তই। কিন্তু ইদানীং পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হইয়াছে। যাহারা দেশত্যাগ করে নাই তাহাদের সম্পত্তির দিকেও বিহারিরা হাত বাড়াইতেছে। অবশ্য স্বীকার করিতেই হইবে, এখানকার বাঙালি মুসলমান, যাহারা পুরুষানুক্রমে আত্মীয়ের মতো বাঙালি হিন্দুদের পাশাপাশি বাস করিয়া আসিয়াছে, তাহাদের কেহ … কেহ বিহারিদের এ জাতীয় অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করিয়াছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাধাও দিয়াছে কিন্তু বিহারিরা কর্ণপাত করে নাই।
এই অবস্থায় মানসিক অস্বস্তিতে দিন কাটিয়া যাইতেছিল। তবে আমি বা আমার মতো বহু মানুষ মোটামুটি নিরুপদ্রবেই ছিলাম। এতাবৎ আমাদের উপর সরাসরি ঝঞ্জাট হয় নাই। কিন্তু চারদিকের বেড়া-আগুনের আঁচ শেষ অবধি আমার গায়ে আসিয়া লাগিয়াছে।
ইরফান আলি নামে এক বিহারি মুসলমান একদিন হঠাৎ আমাদের বাড়ি আসিয়া হাজির। লোকটি মধ্যবয়সী। আলিশান চেহারা। বুক পর্যন্ত দাড়ি। সে বাংলা, হিন্দি এবং উর্দু মিশাইয়া বলিল, আপনার সঙ্গে জরুরি কিছু বাতচিত আছে–
ইরফানকে আমাদের বাহির বাড়ির বড় ঘরখানিতে বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কী বাতচিত?
আমরা জানতে পেরেছি, আপনি বহুৎ জমিনের মালিক। লগভগ তিন শ কানি হোবে।
অত নেই। শখানেক কানির মতো হতে পারে। কিন্তু আমার জমির ব্যাপারে আপনার কী দরকার?
আপনারা তিন আদমি। আপনি, আপনার বিবি আউর এক বহিন। অত জমি দিয়ে কী করবেন?
লোকটা আমাদের সম্পর্কে খোঁজখবর লইয়াই আসিয়াছে। আমি যত অবাক হইয়াছি তাহা অপেক্ষা ভয় পাইয়াছি অনেক বেশি। তবু সাহসে ভর করিয়া বলিলাম, আমার সম্পত্তি নিয়ে কী করব সেটা আমি বুঝব। অন্যের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নাই।
ইরফান আলি ইতর প্রকৃতির লোক। চোখ পাকাইয়া, দাঁতে দাঁত ঘষিয়া, আমার মুখের সামনে আঙুল নাড়িয়া নাড়িয়া চিৎকার করিয়া উঠিল, জবান সামহালকে বাত করবেন। সবসময় ইয়াদ রাখবেন, ইয়ে পাকিস্তান হ্যায়।
বিনু, কতকাল ধরিয়া আমরা রাজদিয়ায় বাস করিয়া আসিতেছি। আট-দশ পুরুষ তো হইবেই। ইরফান আলির স্পর্ধায় হতভম্ব হইয়া গেলাম। আমার বাড়িতে আসিয়া আমার সহিত চোখ গরম করিয়া কথা বলে। এমন অপমানিত জীবনে আর কখনও হই নাই।
ইরফান এবার বলিল, আপনার এত জমিন আছে। তা থেকে আমাকে পঁচিশ কানি দিয়া দিন
তাহার কথা শুনিয়া আমার ধন্দ লাগিল। দিয়ে দিনবলিতে কী বুঝাইল, প্রথমটা ধরিতে পারিলাম না। জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি কি জমি কিনতে চান? সামান্য চিন্তা করিয়া তারপর বলিলাম, সাত পুরুষের বিষয় আশয় থেকে এক ছটাক মাটিও আমি বিক্রি করব না।
ইরফান আলি এমন কথা বোধহয় পূর্বে কখনও শোনে নাই। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে সে তাকাইয়া থাকে। তারপর বহুৎ তাজ্জবকি বাত বলিয়া হুঙ্কার ছাড়িল, পাকিস্তানে এসে আমি জমিন খরিদ করব! আপনার ওই জমিন আমার নামে লিখে দিন। মুফত–
এমন যে কেহ বলিতে পারে, কোনওদিন কল্পনাও করি নাই। আমি সম্পূর্ণ দিশাহারা হইয়া পড়িলাম।
বিনু, তোমার নিশ্চয়ই খেয়াল আছে, যুগল চলিয়া যাইবার পর করিমই আমাদের সর্বক্ষণের কামলা। তাহার দূর সম্পর্কের এক মাসতুতো ভাই হালিমকেও রাখা হইয়াছিল। দুইজনেই অত্যন্ত। বিশ্বাসী এবং দায়িত্বশীল। দেশভাগের পর রাজদিয়ার কত লোকই তো রাতারাতি পালটাইয়া গিয়াছে। কিন্তু করিমদের পরিবর্তন হয় নাই। তাহারা আগের মতোই আছে।
ইরফানের সহিত যে-ঘরে বসিয়া কথা বলিতেছিলাম, কিছু লইবার জন্য কখন করিম সেখানে আসিয়া দরজার কাছে দাঁড়াইয়াছে, লক্ষ করি নাই। তুমি জানো, করিম মানুষ ভাল হইলেও রগচটা ধরনের। সে আমার আর ইরফানের যাবতীয় কথাবার্তা শুনিয়াছিল। হঠাৎ উত্তেজিত হইয়া চিৎকার করিয়া উঠে, হালার পুত পশ্চিমা, হ্যামকুত্তার লাখান মানী লোকের লগে ম্যাজাজ চড়ইয়া কথা কও! তেনি এই রাইজদার হগল মাইনষের বাপের সোমান। মাগনায় তেনার জমিন ল্যাখাইয়া লইতে আইছ!
করিমের মারমুখী চেহারা দেখিয়া ইরফান প্রথমটা হতচকিত। একটি বাঙালি মুসলমান স্বজাতির পাশে না দাঁড়াইয়া আমার পক্ষে লড়াই করিতেছে, ইহাতে সে আশ্চর্য হইয়া যায়। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলাইয়া লয়। লাফ দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া গলা চড়ায়, কে তুই?
