হাত তুলে বিনয়কে থামিয়ে দিলেন অলোকপ্রসাদ।–অ্যারেঞ্জমেন্ট হয়ে গেছে। কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের ভেতর চিড়েগুড় এসে যাবে।
মানুষটি হৃদয়বান। ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর সবার আগে কী প্রয়োজন সেদিকে তার লক্ষ ছিল। সেই অনুযায়ী এর ভেতর ব্যবস্থাও করে ফেলেছেন। অলোকপ্রসাদ সম্পর্কে বিনয়ের যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। যত তাকে দেখছে, সেটা বেড়েই চলেছে।
বিনয় জিজ্ঞেস করে, স্টেশন তো বোঝাই। আসামের রিফউজিরা কোথায় থাকবে, ঠিক হয়েছে?
দমদম ক্যান্টনমেন্টের কাছে সেকেণ্ড গ্রেট ওয়ারের একটা ফাঁকা ব্যারাক আছে। কণ্ডিশন খুব ভাল নয়। রিলিফ কমিশনার অর্ডার দিয়েছেন, আপাতত লোকগুলোকে সেখানে শেলটার দিতে
কিন্তু
জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন অলোকপ্রসাদ।
হারান ঘোষদের দেখিয়ে বিনয় বলে, এরা বলছিল, আসাম থেকে আরও রিফিউজি আসছে। তাদের থাকার কী হবে?
অলোকপ্রসাদ বললেন, মিনিস্টার আর ডিপার্টমেন্টের কর্তারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাই হবে।
একটু চুপচাপ।
তারপর বিনয় বলে, স্যার, আজ চলি। আসামের রিফিউজিদের ওপর বড় করে একটা লেখা তৈরি করতে হবে।
সে তো করতেই হবে। অলোকপ্রসাদ হাসলেন, যার যা কাজ
হারান ঘোষের দিকে ফিরে বিনয় বলে, এখন আমাকে যেতে হবে। অলোকপ্রসাদের প্রসঙ্গ টেনে বলল, স্যার কী বলছেন, সব শুনলেন। কোনও চিন্তা নেই
মলিন মুখে হারান বলে, আপনের লগে আর দেখা অইব না ছুটোবাবু?
নিশ্চয়ই হবে। আপনারা যেখানে থাকবেন, আমি ঠিক সেখানে চলে যাব।
তবু আপনের ঠিকানাখান দ্যান
বিনয় হারানের মনোভাবটা আঁচ করে নিল। এই অচেনা শহরে খড়কুটোর মত যাকে আঁকড়ে ধরেছে তাকে হাতছাড়া করতে চায় না। ঠিকানা জানা থাকলে তাকে খুঁজে বার করা যাবে।
বিনয় একটুকরো কাগজে নতুন ভারত-এর ঠিকানা লিখে হারানকে দিল। এদিকে ছবি তোলার কাজ শেষ করে চলে এসেছে অমর। তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিনয়।
.
অফিসে গিয়ে খুব যত্ন করে আসামের উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোকে নিয়ে একটা বড় প্রতিবেদন লিখে প্রসাদকে দিয়ে যখন শান্তিনিবাস-এ ফিরে এল, বেশ রাত হয়েছে। সাড়ে নটা বাজে। তেতলায় উঠতেই চোখে পড়ল, তার ঘরে আলো জ্বলছে। রীতিমতো অবাকই হয় বিনয়। সে মেসে নেই, কে আলো জ্বালতে পারে? ত্বরিত পায়ে দরজার সামনে আসতেই দেখতে পায় একটা মোড়ায় বসে অপেক্ষা করছে নিত্য দাস। আর মেঝের এক ধারে পুরানো খবরের কাগজ পেতে তার ওপর বসে আছে সুবল।
মোড়াটা প্রসাদের। নিত্য দাসের বসার জন্য নিশ্চয়ই সুবল এনে দিয়েছে।
অসীম বিস্ময়ে বিনয় জিজ্ঞেস করে, আপনি!
নিত্য দাস উঠে দাঁড়ায়, টালিগঞ্জে সুধাদিদির বাড়ি গিয়া হেনলাম আপনে উনাগো কাছে আর থাকেন না। ঠিকানা লইয়া এইহানে আইয়া বইয়া আছি। হ, ঘণ্টা-দ্যাড়েক তো অইবই।
কোনও দরকার আছে?
জবর দরকার।
.
৬০.
এত রাতে নিত্য দাসকে দেখে বিনয় অবাক তো হয়েছিলই, ভেতরে ভেতরে চাপা একটা উৎকণ্ঠাও টের পাচ্ছিল। মনে হচ্ছে, লোকটা কোনও সুখবর নিয়ে আসেনি। নিত্যকে বসতে বলে নিজের বিছানার এক প্রান্তে বসে পড়ে সে। তারপর সুবলকে দুকাপ চা আনতে বলে সোজা নিত্যর মুখের দিকের তাকায়।-এবার বলুন।
নিত্য দাস বলল, আইজই আমার লোক বডার থিকা হ্যামকত্তার চিঠি লইয়া আইছে। খুব জরারি চিঠি।
হেমনাথের কথা এর মধ্যে সেভাবে ভাবার সময় পায়নি বিনয়। সকালে উঠেই জবরদখল কলোনি কি ত্রাণশিবিরগুলোতে ছোটা, সকাল কি সন্ধেয় অফিসে ফিরে সেগুলো নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা, সুধাদের বাড়ি থেকে মেসে উঠে আসা-এ-সবের সঙ্গে একটা নতুন উপসর্গ যোগ হয়েছে। আসাম থেকে তাড়া খাওয়া উদ্বাস্তুদের ঢল নামতে শুরু করেছে পশ্চিম বাংলায়। নানা ঘটনা, উৎখাত হওয়া, আতঙ্কগ্রস্ত, অগুনতি মানুষ, এইসব ব্যাপারে সে এমন জড়িয়ে পড়েছে যে অন্য কোনও দিকে তাকাবার কথা মনেও হয়নি। নিত্য দাস এত রাত্তিরে ফের হেমনাথ সম্পর্কে পুরানো উদ্বেগ ফিরিয়ে আনল।
নিত্য জামার পকেট থেকে একটা লম্বা খাম বার করে ফেলেছিল। সেটা বিনয়কে দিতে দিতে বলল, এই ন্যান (নিন)।
খামটার ওপর বিনয়ের নাম ছাড়াও একধারে ইংরেজিতে লেখা আছে ভেরি আর্জেন্ট। মুখ ছিঁড়ে ভেতর থেকে চিঠি বার করে পড়তে শুরু করে বিনয়। সুবল চা দিয়ে গেছে। কিন্তু সেদিকে তার লক্ষ্য নেই।
চিঠির বয়ানটা এইরকম :
স্নেহের বিনু,
অনেকদিন পূর্বেই তোমার পত্রের উত্তর দিব ভাবিয়া রাখিয়াছিলাম। কিন্তু জয়নাল নামে নিত্য দাসের যে লোকটি চিঠিপত্র লইয়া বর্ডারে যায়, সে না আসায় ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম। মনে হইতেছিল, তোমাদের সহিত যোগসূত্রটি বুঝি বা ছিন্ন হইয়া গেল। কিন্তু সৌভাগ্যই বলিতে হইবে, হঠাৎ সে আসিয়া হাজির। লোকটি ভাল এবং তাহার দায়িত্ববোধ আছে। জানাইল হঠাৎ মেয়ের শাদি ঠিক হওয়ায় ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিল, তাই রাজদিয়ায় আসিতে পারে নাই। ইহাতে আমার যে অসুবিধা হইয়াছে এবং কলিকাতায় তোমাদের যে পত্রাদি দিতে পারি নাই, সেইজন্য যথেষ্ট আক্ষেপও করিয়াছে।
যাহা হউক, তোমরা এখানকার খবর শুনিলে অত্যন্ত বিচলিত হইয়া পড়িবে, তবু না জানাইয়া উপায় নাই। তুমি জানো, আমি আশাবাদী এবং মানুষের শুভ বুদ্ধির উপর আমার গভীর আস্থা আছে। কিন্তু সেই আস্থাটি বজায় রাখা আর সম্ভব হইতেছে না।
